ঈদের ছুটিতে শহরের যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে ঘুরে আসুন প্রকৃতির অপরূপ সান্নিধ্যে

“আবার এলো যে সন্ধ্যা

শুধু দুজনে

চলোনা ঘুরে আসি অজানাতে

যেখানে নদী এসে থেমে গেছে ।”

নিজ সঙ্গীর প্রতি এমন রোমান্টিক আবেদন প্রায় অনেকেরই থাকে। তবে প্রত্যেকে সেটা করে উঠতে পারেনা। যাবো যাবো করেও অনেকে ব্যস্ততা ও সময়ের অভাবে কোথাও যেতে পারেন না। তাদের জন্য সবচাইতে আদর্শ সময় হচ্ছে এটা। ঈদের ছুটিতে কাছে কিংবা দূরে ঘুরে আসতে পারেন -শুধু দুজনে বা পরিবার পরিজন নিয়ে। আপনার মনটাকে ফুরফুরে করতে চাইলে ঈদের পর প্রিয়সঙ্গী বা পরিবার নিয়ে ঘুরে আসুন প্রকৃতির অপূর্ব  সৌন্দর্যে ঘেরা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে।

অন্তত একবারের জন্য হলেও ঘুরে আসুন মসলিন শিল্পের স্মৃতি জাগরিত রূপগঞ্জ থেকে। আর এর রূপ সত্যিই আপনাকে মুগ্ধ করবে। পিকনিক স্পট, মিনি চিড়িয়াখানা, শিল্পকর্ম, স্থাপত্য কি নেই এখানে। আছে শীতলক্ষা নদী ভ্রমণের সুযোগ সুজজ্জিতো বাহারি ইঞ্জিন চালিত নৌযানে, ৪টি আন্তর্জাতিকমানের পার্ক, স্বপ্নের উপশহরের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য। এখানে এলে যেকেউ মুগ্ধ হবেন নয়ন জুড়ানো কারুকাজখচিত জমিদার বাড়ির নিখুঁত শিল্পকর্ম দেখে। যারা এই ঈদে গ্রামে যাবেন না বা যারা রাজধানীর বাসিন্দা তারা ঈদের ছুটিতে একদিনের জন্য ঘুরে আসতে পারেন এই রূপের নগর থেকে। রূপগঞ্জ রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক পথে মাত্র আধঘন্টার পথ। এখানে ভ্রমণের জন্য উল্লেখযোগ্য স্থান হলো -জিন্দাপার্ক, ফানল্যান্ড পার্ক, পন্ড পার্ক ও রাসেল পার্ক ইত্যাদি।

জিন্দা পার্ক

ঢাকাতে সময় কাটানোর মতো অনেক পার্ক আছে তবে নোংরামি ও অশ্লীলতার জন্য পার্কগুলোতে অনেকেই যেতে চায়না। তাই ঢাকার যানজট ও কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে ঘুরে আসুন রূপগঞ্জের  জিন্দা পার্ক থেকে। রূপগঞ্জের উপশহর এলাকায় দেড়শো বিঘা জমির উপর নির্মাণ করা হয়েছে অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা এ পার্কটি। এখানে নেই কোনো নোংরামি, শিশুদের নিয়ে বিব্রত হওয়ার ভয়। অত্যন্ত যত্ন সহকারে এই পার্কটির পরিচর্যা করা হয়েছে, যার প্রমান মিলবে গেট দিয়ে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই। পরিষ্কার রাস্তার দুপাশে কার্পেটের মতো সবুজ ঘাস,দেখলেই ইচ্ছে জাগে ঘাসে নিজের শরীর বিছিয়ে দেয়ার।

 

টিলা আর লেকবেষ্টিত এই পার্কের ভেতরে আছে ২৫০ প্রজাতির ১০ হাজারেরও বেশি সবুজ গাছ – গাছালি। পার্কের সুদৃশ্য বিশাল ৫টি জলাধার এই তীব্র গরমেও আপনাকে এনে দিবে প্রশান্তির ছোঁয়া। এখানে রয়েছে নৌকায় চড়ে লেকে ভ্রমণের সুযোগ। পার্কের ভেতরেই রয়েছে মার্কেট,সেখানে দর্শনার্থীরা সবধরণের কেনাকাটা করতে পারে। আছে লাইব্রেরী, ক্যান্টিন ও প্রাণীজগৎ।

পার্কের প্রায় ৫০ ভাগ জুড়ে আছে লেক। রয়েছে লেকের পাড়ে ফুলের বাগানে নিরিবিলি চুটিয়ে আড্ডা দেবার মতো স্থান। এছাড়া প্রেমিক -প্রেমিকাদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে এখানকার লাভ লেক। পুরো পার্কটিতে পুকুর ও লেক ছাড়াও রয়েছে ঘন সবুজ অরণ্যে ঘেরা ছোট -বড় টিলা। রয়েছে বাংলো, রেস্টুরেন্ট, স্লিপার ও দোলনা। রয়েছে সবুজ ঘাসে ঘেরা শিশুদের জন্য খেলার মাঠ।

লেকময় ঘুরে বাড়ানোর জন্য রয়েছে ১০টি নৌকা। চিকিৎসার জন্য আছে ফ্রি ক্লিনিক। আছে এক ঝাঁক তরুণ -তরুণী নিরাপত্তা ও সেবা সুবিধা দেয়ার জন্য, যারা সর্বক্ষণ দর্শনার্থীদের সেবায় নিয়োজিত। এছাড়াও শুটিং ও পিকনিকের জন্য একটি অনন্য সুন্দর স্থান হচ্ছে জিন্দা পার্ক।

প্রবেশ টিকিট -১০০ টাকা

ফ্যামিলি পিকনিকের জন্য জিন্দা পার্ক এখন বেশ পরিচিত জায়গা। কাঠের ব্রিজ পার হয়ে দীঘির মাঝামাঝি তৈরি করা বাসের টি রুমে বসে প্রিয় জনের সাথে এক কাপ চা খাওয়া বা জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকার সময়গুলো দারুণ উপভোগ করবেন।

সঙ্গে গাড়ি না থাকলেও কোন সমস্যা নেই, বাড়ি ফেরার জন্য পার্কের সামনেই পাবেন গাড়ি বা সিএনজি। আর হ্যা পিকনিক করতে চাইলে অবশ্যই দু – তিনদিন আগে যোগাযোগ করবেন। পিকনিকের খাবারের ব্যবস্থা পার্ক কর্তৃপক্ষই করে থাকে।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে জিন্দা পার্কার দূরত্ব ৩৭ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে বাস যোগে কাঁচপুর ব্রীজ হয়ে ভুলতা গাউসিয়া হয়ে বাইপাস দিয়ে কাঞ্চন ব্রীজ হয়ে জিন্দাপার্ক আসা যায়। কাঞ্চন ব্রীজ থেকে ৫ মিনিটের হাঁটার পথ। অথবা ঢাকা হতে টঙ্গী মীরের বাজার হয়ে বাইপাস রাস্তা দিয়ে জিন্দাপার্ক আসা যায়, টঙ্গী হতে জিন্দা পার্কের দূরত্ব ২৮ কিঃ মিঃ। তবে বেশি সহজ হবে কুঁড়িল বিশ্বরোডের পূর্বাচল হাইওয়ে দিয়ে গেলে, লেগুনাতে জিন্দা পার্ক যেতে ভাড়া ৩০ টাকা নিবে।

 

খাওয়া দাওয়ার সুব্যাবস্থা

খাওয়া – দাওয়ার জন্য পার্কের ভেতরে আছে মহুয়া স্নাকস এন্ড মহুয়া ফুডস রেস্টুরেন্ট। ভাত, ভাজি, ডাল, মাংস ২০০/২৫০ টাকা। তবে পার্কে ঘুরা শেষে ৩০০ ফিট এসে খেলে ভালো হয়। কারণ ৩০০ ফিটের খাবার অনেক ভাল এবং খরচও কম হবে। সেক্ষেত্রে আপনি যেতে পারেন পূবাচল নকশিপল্লীতে। রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড থেকে নতুন ৩০০ ফিট রাস্তা ধরে পর পর দুটো ব্রীজ পার হলেই ভোলানাথপুর আর ভোলানাথপুর থেকে একটু ভেতরে গেলেই নকশিপল্লী রেস্টুরেন্ট।

অন্যরকম আবহে নকশিপল্লী রেস্টুরেন্ট

এখানকার পরিবেশ শহরের আট – দশটা ইট পাথরের রেস্টুরেন্টের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। গাছ – গাছালিতে ভরা সম্পূর্ণ একটি ছিমছাম পরিবেশ। খাওয়ার পর বাকিটা সময় এদিক – সেদিক ঘুরে বা নদীর ধারে বসে এখানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। এমনকি ঘোড়ার গাড়িতে ও সুন্দর নৌকায় চড়তে পারবেন। আর আশে -পাশে রয়েছে হাঁটার অনেক জায়গা। শরৎকালে চারপাশে কাঁশফুল যেন স্বাগত জানায়।

 

এখানকার ঘরগুলোতে খড়ের ছাউনি আর লেকের পানিতে দেখতে পারবেন মাছের খেলা। পরিবেশটা এত মনোমুগ্ধকর যে আপনার ভাল না লেগে পারে না।

 

লাইভ মিউজিক

এ রেস্টুরেন্টে প্রতি বুধবার, শুক্রবার ও শনিবার বিকাল ৩ টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত চলে লাইভ মিউজিক। তাই সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে লাইভ মিউজিক উপভোগ করতে চাইলে চলে আসুন নকশিপল্লী রেস্টুরেন্টে। আর সাথে আছে অনেক রকম খাবার -দাবার।

তাই শহরের ক্লান্তি দূর করে একরাশ প্রশান্তি পেতে শহর ছেড়ে একটু দূরে ছুটির দিনে বিকেল বেলা প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে বা ফ্যামিলির সবাইকে নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন এই রেস্তোরা থেকে।

কিভাবে যাবেন

বিশ্বরোড থেকে বিআরটিসি বাসে করে নেমে যেতে পারেন বালু ব্রীজ, ভাড়া লাগবে ১৫ টাকা। তারপর এখান থেকে হেঁটে বা রিক্সায় চলে যেতে পারেন নকশিপল্লী রেস্তোরায়। তবে হ্যা যাওয়ার সময় পূর্বাচল ভোলানাথপুর বাজার থেকে মিষ্টি, চপ ও নানারকম মাছের বারবিকিউ খেয়ে যেতে ভুলবেন না।

এখানে বেশ ভালো মানের মিষ্টি পাওয়া যায়। অল্প দিনেই বেশ খ্যাতি পেয়েছে এখানকার মিষ্টি। তাই পূর্বাচল ঘুরেতে গেলে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে মিষ্টিও চেখে দেখবেন।

প্রিয়জন, বন্ধু কিংবা পরিবারের সাথে আড্ডা দেয়ার জন্য চমৎকার একটি জায়গা পূর্বাচল। শহুরে কোলাহল ছেড়ে বিকেলের খানিকটা সময় নিজেকে কিংবা প্রিয়জনদের নিয়ে হারানোর জন্য জায়গাটি মন্দ নয়। আপনার সময় বেশ ভালো কাটবে।

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: