১. বাংলাদেশে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক দলকে সাথে নিয়ে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের কথা আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছিলাম। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে জাতীয় ঐক্যের বদলে জাতিকে বিভক্ত করে সংঘাত সহিংসতা জিইয়ে রাখার একটি কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যায়। এর প্রধান কারণ হতে পারে, সাম্প্রতিক দেশি বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার দ্বারা পরিচালিত অনলাইন জরিপগুলোতে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার আভাস পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ব্যালটযুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে ভীতসন্ত্রস্ত, কেননা বর্তমানে আওয়ামী লীগের বিরোধী শক্তিগুলোর ব্যর্থতা ও সহিংসতার কারণে জনগণের ব্যালটের রায়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভালো করার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘ ৯ মাস পর এসে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার জন্য এর চেয়ে বড় আর কোনো কারণ থাকতে পারে না।
২. জুলাই-আগস্টের ঘটনায় এ পর্যন্ত শত শত মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং হাজার হাজার লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অথচ, এখন পর্যন্ত কোনো আদালতেই শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ বা এর কোনো অঙ্গসংগঠনের কোনো নেতাকর্মীই দোষী সাব্যস্ত হয় নি। তাহলে, সরকার কোন যুক্তিতে বা আইনের ভিত্তিতে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হুট করেই আওয়ামী লীগের সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো? অর্থাৎ, সরকার ও উপদেষ্টা পরিষদের এই সিদ্ধান্ত বেআইনি এবং এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবেই প্রতিহিংসামূলক ও একতরফা। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যারা সকল নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করার কথা, পারস্পরিক ঝগড়া বিবাদ মীমাংসা করার কথা এবং সংলাপ ও আলোচনার মধ্য দিয়ে বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দুরত্ব কমিয়ে আনার কথা, সেই অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে জাতিকে বিভক্তকরণের এই পদক্ষেপে আমরা হতাশ হয়েছি।
৩. জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে পুলিশসহ দেড় থেকে দুই হাজারের মত লোক নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, এর অর্ধেকরও বেশি নিহত হয়েছেন ৫ থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে। এই সময়কালের পরেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই পর্যন্ত আরও দুই হাজার লোক নিহত হয়েছে বলে পরিসংখ্যান বলছে। এসব হত্যাকান্ডের জন্য কারা দায়ী? যদি ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী নিহতের ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হয়, যদিও তা দেশের কোনো আদালতে এখন অব্দি প্রমাণিত নয়, তাহলে এই ৫-১৫ আগস্টের সময়কালে শত শত নিহতের ঘটনার জন্য দায়ী আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তিদের বিচার হওয়া কি উচিত নয়? উপরন্তু, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুসারে, ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী সময়ে নিহতদের ৬৬% ই ৭.৬২ স্নাইপার রাইফেল দ্বারা নিহত হয়েছেন, যা আমাদের দেশের পুলিশ, সেনাবাহিনী, আনসার, র্যাব বা কোনো সামরিক, আধাসামরিক ও বেসামরিক বাহিনী ব্যবহার করে না। এই রাইফেল ব্যবহার করে ঘটানো টার্গেট কিলিংয়ের বিষয়গুলো এখন পর্যন্ত অনুন্মোচিত। শত শত পুলিশ হত্যার ঘটনাগুলো বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে রাখাও এক ধরনের বেআইনি পদক্ষেপ, যা পুরো ঘটনা জনগণের দৃষ্টি থেকে আড়াল করার অপচেষ্টার নামান্তর। আমরা আবারও বলছি যে, দেশের কোনো আদালতই এখন পর্যন্ত জুলাই-আগস্ট আন্দোলন সম্পর্কিত মামলার কোনো রায় প্রকাশ করে নি। সুতরাং, ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী ঘটনায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের রিপোর্টে উল্লেখিত শত শত লোক নিহতের ঘটনায় যেসকল রাজনৈতিক দল দায়ী, তাদের কী হবে? জাতিসংঘের রিপোর্টের আংশিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার এভাবে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করতে পারে না। অধিকন্তু, জাতিসংঘ রিপোর্টে রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ না করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, যাকে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছে। এর ফলে, অন্তর্বর্তী সরকার অচিরেই জাতিসংঘের সমর্থন হারাতে পারে।
৪. কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ হতে পারে না। বরং, অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ হওয়া উচিত, দেশে বিদ্যমান সকল রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগসহ কতিপয় ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল আছে যারা ইচ্ছা করলেই শাহবাগে ২ লাখ লোক জড়ো করতে পারে। যে কেউ এসেই লোক জড়ো করে স্লোগান দিয়ে দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইলেই সরকার সে দাবি মেনে নিবে - তা অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নয়। মবক্রেসি দিয়ে রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দৃষ্টান্ত স্থাপন কোনোভাবেই দেশের জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে না। এখন, এক দলের মবক্রেসি করার সু্যোগ আছে, দু বছর পর অন্য দলের কাছে সে সুযোগ আসতে পারে। সুতরাং, এরকম মবক্রেসি তৈরি করে নির্বাহী আদেশ দিয়ে রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা গণতন্ত্রের জন্য শুভ হতে পারে না এবং তা কোনোক্রমেই জাতীয় ঐকমত্য বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। বরং, এই পদক্ষেপ জাতিকে বিভক্ত করে দীর্ঘমেয়াদী হিংসা হানাহানি ও গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিবে।
৫. যারা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পিছনে ভূমিকা রেখেছেন, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বল আওয়ামী লীগের কোর্টে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আগামী দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জনগণের সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তরিত হবে। আন্তর্জাতিক সকল পরিমন্ডলে ও গণমাধ্যমে শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের নামই বারেবারে উচ্চারিত হতে থাকবে। এখন শেখ হাসিনাসহ পুরো আওয়ামী লীগ কী করতে পারে? দেশের অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী যে দলকে সমর্থন করে, সেই রাজনৈতিক দল কি এসব ঘটনার পর চুপ করে বসে থাকবে? অন্তর্বর্তী সরকারের আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত প্রজ্ঞাপনের কাগজে সীমাবদ্ধ রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। কারণ, এটি বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদের নেই। আমার কাছে মনে হয়, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের জনগণের পালস বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। এই ধরনের অবরুদ্ধ অবস্থা বেশিদিন চলতে থাকলে দেশের ব্যবসা বাণিজ্য, আয় উন্নতি সব বন্ধ হয়ে যাবে। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীরা চুপ করে বসে থাকবেন না, এটাই বাস্তবতা। শেখ হাসিনা এখন বিশ্ব সম্প্রদায়কে বলতে পারবেন যে, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ও বিচারিক কার্যক্রমে তার অংশগ্রহণের সুযোগ হরণ করা হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি প্রবাসী সরকার গঠিত হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না, এবং তা ১৯৭১ সালের মত দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা আমাদের মত একটি সম্ভাবনাময় জাতিকে বহুবছর পিছিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এর ফলে শুধু যে দেশে জনগণ বিভক্ত হবে - তা নয়, বরং দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতীক সেনাবাহিনী বিভক্ত হয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। দেশের প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আমলাতন্ত্রের মত জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিভক্ত হয়ে দেশে একটি বিদ্রোহ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যা দেশে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করবে। সুতরাং, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অনুরোধ, হীরক রাজার ভূমিকা থেকে বেরিয়ে আসুন, জাতিকে বিভক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ত্রিশ লক্ষ অমর শহীদের আত্মত্যাগ ও দুই লক্ষাধিক মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের প্রিয় দেশমাতৃকা বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলাম, এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। আসুন, সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে আমাদের এই মহান জাতিকে গড়ে তোলার জন্য সকলে মিলেমিশে কাজ করি। সকল স্থূল ভাবনা পরিহার করে আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক দলকে সাথে নিয়ে একটি স্থায়ী ও টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্যে একটি স্থিতিশীল, সুন্দর ও শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
বিনীত,
অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দীন
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।