
হাকিকুল ইসলাম খোকন, বাপসনিউজ || ১২ ফেব্রুয়ারি 2026
জামায়াতে ইসলামীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় চরম ব্যর্থতার জন্য বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, সংখ্যালঘু নিরাপত্তায় চরম অনীহা প্রকাশ এবং প্রকাশে পিটিয়ে হত্যা, বাড়ি-ঘর জ¦ালিয়ে দেয়া এবং চাঁদাবাজি ও ধর্ষণের সাথে জড়িতদের দায়মুক্তির জন্য ইউনূস সরকারকে কাঠ গড়ায় দাঁড় করানোর দাবি উত্থাপিত হয়েছে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,সোমবার ক্যাপিটল হিলে ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা’ শীর্ষক কংগ্রেশনাল শুনানিতে দু’জন কংগ্রেসম্যান বক্তব্য প্রদান করেন। এছাড়া আরো চার কংগ্রেসম্যানের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গি তথা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেসম্যানরা। শুনানিতে অংশ নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মাইকেল রুবিন জামায়াতে ইসলামীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন এবং মুহম্মদ ইউনূসকে গণতন্ত্র ও মানবতার দুশমন হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করেন তিনি। আলোচনায় অংশগ্রহণকারিরা ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’র ২১৯ নম্বর সেকশনের ভিত্তিকে জামায়াতে ইসলামীকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্রে এই সংগঠনের কর্মী এবং জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে পূর্ণ তদন্ত শুরুর আহবান জানিয়েছেন।

একইসাথে ১২ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। শুনানিতে মাইকেল রুবিন উল্লেখ করেন, ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্যায়-অপকর্ম-দুর্নীতির দায় থেকে রেহাই পেতে চায় ধর্মীয় সংগঠন তথা জামায়াতে ইসলামী। ওরা অপকর্ম ঢাকতেও ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে যা বাংলাদেশের জন্য কখানোই শুভ ফল বয়ে আনবে না। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে বিস্ময়ের সাথে মাইকেল রুবিন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন জামায়াতে ইসলামীর সাথে সম্পর্ক তৈরী করছে এটা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ধর্মের লেবাসে যারা সন্ত্রাসে লিপ্ত, যারা গণতন্ত্রে শ্রদ্ধাশীল নয়, যারা প্রতিনিয়ত নারীর স্বাধীনতাকেও হরণ করছে, তাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক হয় কীভাবে। এ ব্যাপারে ডেমোক্র্যাটদের উচিত হবে রিপাবলিকানদের সাথে একযোগে কাজ করার। মাইকেল রুবিন বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী হয়েছেন মুহম্মদ ইউনূস।

আলোচনায় অংশ নিয়ে কংগ্রেসম্যান (মিশিগান-রিপাবলিকান) টম ব্যারেট বলেন, ইসলামী চরমপন্থিরা দেশে দেশে অস্থিরতা তৈরী করছে। ওদের কবল থেকে মানবতাকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র সরব রয়েছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের বন্ধু হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসম্যানরা উদ্বিগ্ন। আমরা সবসময় বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি-স্থিতি অটুট রাখতে বদ্ধ পরিকর। ধর্মীয় বিশ^াসের কারণে কোথাও কেউ আক্রান্ত হউক কিংবা হত্যার শিকার হউক তাকে কেউই সমর্থন দেই না। ভাার্জিনিয়ার কংগ্রেসম্যান (ডেমোক্র্যাট) সুহাস সুব্রমনিয়ম বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধিকে মেনে নেয়া যায় না। একইভাবে দেশটির সবচেয়ে পুরনো এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারি আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে যে নির্বাচনের চেষ্টা চলছে তা ঠিক হচ্ছে না, এ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধই থাকবে। তিনি বলেন, এখন বক্তব্য-বিবৃতির সময় নয়, অ্যাকশন দেখাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে এবং সকলকে জানাতে হবে বাংলাদেশের নির্বাচন সত্যিকার অর্থে অবাধ ও নিরপেক্ষ হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক অ্যামাসেডর অ্যাট-লার্জ এবং ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস সামিটের কো-চেয়ার স্যামুয়েল ব্রাউনব্যাক ভিডিওতে প্রদত্ত বক্তব্যে বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ব্যাহত হলে তার প্রভাব দেশটির মানচিত্রেই শুধু হেরফের ঘটায় না, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডেও প্রভাব ফেলে। গণতন্ত্র বিশস যোগ্য থাকে না।

এ সময় ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের প্রেসিডেন্ট ও সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি আটক সাংবাদিক নেতা শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবুসহ সকলের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন। প্রায় তিনশ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের, সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুতি, ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার ঘটনাবলি তুলে ধরেন তিনি। এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি বাংলাদেশের সাংবাদিকদের রক্ষায় সরব হতে বিশ^ সম্প্রদায়ের মানবিক সহযোগিতা কামনা করেন ফরিদা ইয়াসমিন। বাংলাদেশের নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রসঙ্গ টেনে জাতীয় মহিলা পরিষদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরো বলেন, গেল জানুয়ারিতে ৩১ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১১ জনই গণধর্ষণের শিকার। এ ধরনের অপকর্মে লিপ্তদের গ্রেফতার কিংবা বিচারে সোপর্দ করার তথ্য দিয়েছেন ।
অনুষ্ঠানে সাউথ এশিয়ান মাইনোরিটিজ কালেক্টিভ’র প্রেসিডেন্ট প্রিয়া সাহা বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের কোনো নিরাপত্তা নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সামনেই চলছে বর্বরতা। চাঁদা না দিলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটতরাজের পর বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে।
নিউ আমেরিকান ভোটার এসোসিয়েশনের সভাপতি ড. দীলিপ নাথ বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যেই বেশ কজন কংগ্রেসম্যান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কংগ্রেসের ফ্লোরে বক্তব্য রেখেছেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মুহম্মদ ইউনূসকে চিঠি দিয়েছেন। তারা অবিলম্বে আইনের শাসনের ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন। ড. দীলিপ নাথের আশাবাদ, অবিলম্বে ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটিতে বাংলাদেশের পরিস্থিতির আলোকে একটি শুনানি অনুষ্ঠিত হবে ।
সাংবাদিক ও সংগঠক শুভ রায় বলেন, আশ্চার্যজনকভাবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বাংলাদেশের বর্তমানের নাজুক পরিস্থিতি তেমনভাবে প্রকাশিত হচ্ছে না। আর এমনটি ঘটছে সুশাসন আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ায়। এটা মানবতার প্রশ্নে খুবই বিপজ্জনক একটি ব্যাপার। শুভ রায় উল্লেখ করেন, দেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক দল হচ্ছে আওয়ামী লীগ, এটিকে নিষিদ্ধ করে অনুষ্ঠিত নির্বাচন কখনোই স্বাধীন ও স্বচ্ছ হতে পারে না। তেমন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও থাকবে না গণতান্ত্রিক বিশ্বে। শুভ রায় বলেন, সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনায় সক্ষম না হওয়ায় দুষ্ট লোকেরা আস্কারা পাচ্ছে। বিপন্ন হয়ে পড়েছে মানবতা।

শুনানি আয়োজনের জন্য উৎসব চক্রবর্তীসহ কহোনা ও হিন্দু অ্যাকশনকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান ড. দীলিপ নাথ। এ সময় বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ওপেন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক আরিফা রহমান রুমা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট রানা হাসান মাহমুদ, পলিসি এনালিস্ট রিটভিক হ্যারি, জিওপলিটিক্যাল এনালিস্ট অ্যাদেল নজরিয়ানা এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি শাস্তিকা বিশ^াস, পূজা দেবি, শায়ান শিল এবং প্রেমজিৎ আচারী ।
কংগ্রেশনাল শুনানির সময় ফ্লোরে উপস্থিত ছিলেন নিউজার্সির সিনেটর (ডেমোক্র্যাট) কোরি বুকার, ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান (ডেমোক্র্যাট) মাইক লেভিন, কংগ্রেসম্যান (রিপাবলিকান) ইয়ং কিম, কংগ্রেসম্যান (ডেমোক্র্যাট) ডেভিড মীনের প্রতিনিধিত্বকারিরা। এছাড়া কয়েকটি থিঙ্কট্যাংকের কর্মকর্তারাও ফ্লোরে ছিলেন। নিউইয়র্ক ডেলিগেটসের মধ্য থেকে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিয়ে কলম্বিয়া বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দ্বীজেন ভট্টাচার্য বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র নামধারী ধর্মীয় জঙ্গিদের কথিত আন্দালন দমনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিবৃত্ত থাকার আহবান জানিয়ে ফোন করেছিলেন জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রধান ভলকার তুর্ক। সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানকে ৪ আগস্ট ভলকার তুর্ক বলেছিলেন যে, আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হলে ভবিষ্যতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশকে ঠাঁই দেয়া হবে না। এ ধরনের হুমকির মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা ও তার সরকার উৎখাতে জামায়াতি ষড়যন্ত্রে সহায়তা দিয়েছেন ভলকার। জবাবে মাইকেল রুবিন বলেন, প্রসঙ্গটি শুধু এই শুনানিতে নয়, নিউইয়র্ক পোস্ট অথবা ডেইলি নিউজ কিংয়বা ডেইলি সান পত্রিকার উপ-সম্পাদকীয় অথবা মূলধারার বহুল প্রচারিত কোনো মিডিয়ায় আসা জরুরি। যাতে সাধারণ-সচেতন আমেরিকানরা জাতিসংঘের স্ববিরোধী আচরণ সম্পর্কে জানতে পারেন। ড. দ্বীজেন আরো উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ ভোটারের প্রতিনিধিত্বকারি আওয়ামী লীগসহ বেশ কয়েকটি দলকে নিষিদ্ধ করে নির্বাচনের নামে যে তামাশা চলছে সেটির নেপথ্যেও ভলকার তুৃর্কসহ জামায়াত-প্রেমীদের মদদ রয়েছে। সাংবাদিক দস্তগীর জাহাঙ্গিরের প্রশ্ন ছিল, জামায়াতে ইসলামীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে, এ ব্যাপারে মাইকেল রুবিনের মত কি? জবাবে সহমত পোষণ করেছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে গবেষণারত মাইকেল রুবিন।
শুনানিতে অংশ নেয়া প্রবাস প্রজন্মের অনুভ‚তি জানতে চাইলে শায়ান শিল বলেন, মা-বাবার মাতৃভ‚মিতে চলমান বর্বরতায় আমরা সন্ত্রস্ত জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছি। এমমন একটি ভয়ংকর পরিস্থিতির ওপর কংগ্রেসনাল শুনানিতে থাকতে পেরে গৌরববোধ করছি কারণ আমরাও এই আামেরিকায় বাস করেও ভেতরে ভেতরে কষ্ট অনুভব করি। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে সোস্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে বলেও উল্লেখ করেন শায়ান। শুনানিতে নিউইয়র্ক থেকে অংশগ্রহণকারীদের সমন্বয় করেন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর এসোসিয়েট্স শক্তি গুপ্ত।
আই বি এন নিউজ
Reporter Name 




















