শাকিল হোসেন, কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি :
নতুন বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। দুই মণ ধানের দামে মিলছে এক মণ ওজনের একজন কামলা। রুগ্ন, হাড়জিরজিরে শরীর নিয়ে জীবিকার তাগিদে ভোর থেকেই সদর বাজারে ভিড় করছেন শত শত ধান কাটার শ্রমিক।
শুক্রবার ভোর ৬টায় কালিয়াকৈর বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মহাসড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন হাতে লাঠি ও কাস্তে নিয়ে শত শত শ্রমিক। লুঙ্গি পরা, ঘুমঘুম চোখে কাজের অপেক্ষায় থাকা এসব শ্রমিকের বেশিরভাগই উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও রংপুর অঞ্চল থেকে এসেছেন। অনেকেই অপুষ্টিতে ভুগছেন। পরিবারের মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দিতেই তারা ছুটে এসেছেন ধান কাটার কাজে।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থেকে আসা ষাটোর্ধ্ব জমির উদ্দিন বলেন, “শরীরে মাংস নাই, শুধু হাড্ডি। পেটের দায়ে আইছি। ১৩০০ টাকার কমে কামে যামু না। আর যদি জমিতে হাঁটু পানি-কাদা থাকে, তাইলে ১৪০০ টাকা দেওয়া লাগব।”
স্থানীয় কৃষক আব্দুল হামিদ জানান, বর্তমানে এক মণ মোটা ধানের বাজারদর ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। অর্থাৎ দুই মণ ধান বিক্রি করে একজন কামলার একদিনের মজুরি দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে তিন বেলা খাবার, নাস্তা ও বিড়ি-সিগারেটের অতিরিক্ত খরচ।
আরেক কৃষক মনির হোসেন বলেন, “গত বছর ৯০০ টাকায় কামলা পাইছিলাম। এবার খরচ দ্বিগুণ। ধানের দাম কম, খরচ বেশি। এভাবে চললে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠবে না।”
শ্রমিকদের দাবি, বাজারে চাল, ডাল, তেল ও সবজির দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। এছাড়া উত্তরবঙ্গ থেকে কালিয়াকৈরে আসতে জনপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা গাড়িভাড়া লাগে। ঝড়-বৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে থাকায় কাদা-পানিতে কাজ করাও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। ফলে বাধ্য হয়েই তারা বেশি মজুরি দাবি করছেন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে আসা শ্রমিক কামাল বলেন, “বউ মারা গেছে। তিনটা পোলাপান। হাড্ডিসার শরীর নিয়া আইছি। ১৪০০ টাকা না হইলে পোলাপান কী খাইব?”
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কালিয়াকৈরে বোরো ধানের ভালো ফলন হয়েছে। তবে শ্রমিক সংকট থাকায় কৃষকদের কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারি সহায়তায় কয়েকটি হারভেস্টার কৃষকদের দেওয়া হয়েছে, যা ব্যবহারে ধান কাটার খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ কমবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকরাও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীরা যেন সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য বাজার মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে বৃষ্টি ও কালবৈশাখীর সম্ভাবনা রয়েছে। সময়মতো ধান কাটতে না পারলে মাঠেই নষ্ট হতে পারে পাকা ধান। তাই অতিরিক্ত মজুরি দিয়েও শ্রমিক নিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
দুই মণ ধানের দামে এক মণ ওজনের কামলা— এই কঠিন বাস্তবতার হিসাব মেলাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কালিয়াকৈরের কৃষক ও শ্রমিক— উভয় পক্ষই।