
মোঃ মুক্তাদির হোসেন,
স্টাফ রিপোর্টার
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বোয়ালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মাহবুবা বেগমের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কাঙ্ক্ষিত অর্থ না পাওয়ায় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র আটকে রাখা, অর্থের বিনিময়ে অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী দেখিয়ে বোর্ডের বই উত্তোলন ও তা বিক্রি, এমনকি বিদ্যালয়ের জমিতে দোকান নির্মাণ করে অর্থ আত্মসাতের মতো নানা অনিয়মে জড়িত তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণিতে ৪৭ জন শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন করা হলেও টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতকার্য হয় মাত্র ২৮ জন। এছাড়া আরও ১৫ জন ছিল অনিয়মিত শিক্ষার্থী। কিন্তু ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় বোয়ালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪৩ জন শিক্ষার্থীর পাশাপাশি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে গঠনিকা বিদ্যানিকেতন ও নতুন কুঁড়ি কিন্ডারগার্টেনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আরও প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রধান শিক্ষিকা মাহবুবা বেগম বিভিন্ন বিদ্যালয়ের একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দিলেও নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উর্মি হাবীবা, সৃজন রক্ষিত ও শাহাদাত হোসেনের ফরম পূরণ করেননি। এছাড়া কাঙ্ক্ষিত অর্থ না পাওয়ায় মানবিক বিভাগের শিহাব (রোল-৩১১২৭৪, রেজি: ২৩১০৮১২৬০০), মোঃ রিফাত (রোল-৩১১২৭৫, রেজি: ২৩১০৮১২৫৯৬), ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের বিপুল রায় (রোল-৩১১২৮১, রেজি: ২৩১০৮১২৭৭৫), শোভন এগ্নেসিয়াস ক্রুশ (রোল-৫১৪০২১, রেজি: ২৩১০৮১২৭০৪) এবং নিরব হোসেনের (রোল-৫১৪০২২, রেজি: ২৩১০৮০২৪৬৮) প্রবেশপত্র আটকে দেওয়া হয়। ফলে ফরম পূরণ করেও তারা এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের কোনো সহকারী শিক্ষক এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাদের বিরুদ্ধে শোকজসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়।
এছাড়া গত প্রায় ১২ বছর ধরে বিদ্যালয়ে প্রকৃত ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর তুলনায় হাজিরা খাতায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি শিক্ষার্থীর নাম দেখিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে অতিরিক্ত বোর্ড বই উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। পরে এসব বই পার্শ্ববর্তী গঠনিকা বিদ্যানিকেতন, নতুন কুঁড়ি কিন্ডারগার্টেন-১ (দূর্বাটি) ও নতুন কুঁড়ি কিন্ডারগার্টেন-২ (ভাদার্ত্তী) সহ বিভিন্ন অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয় বলেও জানা গেছে।
গত ১৭ মে নাগরী ইউনিয়নের গঠনিকা বিদ্যানিকেতনের মালিকানাধীন একটি দোকান থেকে বিভিন্ন শ্রেণির দুই বস্তা বোর্ড বই উদ্ধার করেন উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদা বেগম।
এ বিষয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী মোঃ রিফাতের মা হোসনেয়ারা আক্তার বলেন, “আমার ছেলের প্রবেশপত্র আসার পরও প্রধান শিক্ষিকার চাহিদামতো টাকা দিতে না পারায় তাকে প্রবেশপত্র দেওয়া হয়নি। এবার পরীক্ষা দিতে না পারায় আমার ছেলের শিক্ষা জীবন থেকে একটি বছর নষ্ট হয়ে গেছে।”
অন্য চারজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।
গঠনিকা বিদ্যানিকেতনের প্রধান শিক্ষক দিলীপ চন্দ্র বণিক জানান, “আমাদের বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমতি না থাকায় গত ১০ বছর ধরে বোয়ালী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাধ্যমে বোর্ড বই সংগ্রহ, রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণ করে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আসছি।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বোয়ালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মাহবুবা বেগম বলেন, “বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও এলাকাবাসীর অনুরোধে বিদ্যালয়ের স্বার্থে বহিরাগত শিক্ষার্থীদের বোর্ড বই সরবরাহ ও ফরম পূরণ করা হয়েছে। টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ পাঁচজন শিক্ষার্থীর ভুলবশত ফরম পূরণ হয়ে যাওয়ায় তাদের প্রবেশপত্র প্রদান করা হয়নি।”
তবে বহিরাগত অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ, বোর্ড বই বিক্রি ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
বিদ্যালয়ের জমিতে দোকান নির্মাণ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিগত কমিটির সঙ্গে আলোচনা করেই এসব কাজ করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম কামরুল ইসলাম বলেন, “বোয়ালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”