বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) একজন আলোচিত ও পরিচিত কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম। র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ভেজাল ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহসী অভিযান চালিয়ে তিনি দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁর শৈশব, কৈশোর, ছাত্রজীবন ও কর্মজীবনের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
★শৈশব ও কৈশোর:
মো. সারওয়ার আলমের জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলায়। তাঁর শৈশব ও কৈশোরের প্রাথমিক সময়টা কেটেছে নিজ গ্রাম ও উপজেলাতেই। গ্রামীণ পরিবেশ ও মধ্যবিত্ত পারিবারিক আবহে অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু নীতিবান একজন মানুষ হিসেবে তিনি বেড়ে ওঠেন। ১৯৮৩ সালে তিনি পাকুন্দিয়ার ইসমাঈল মেমোরিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন।
★ছাত্রজীবন:
সারওয়ার আলম ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ও কৃতি শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের উল্লেখযোগ্য ধাপগুলো হলো:
মাধ্যমিক (SSC): ১৯৯৩ সালে পাকুন্দিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি (SSC) পাস করেন।
উচ্চ মাধ্যমিক (HSC): ১৯৯৫ সালে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বিভাগে এইচএসসি (HSC) পাস করেন।
উচ্চশিক্ষা: উচ্চ মাধ্যমিকের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে প্রাণিবিদ্যা (Zoology) বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সাথে অনার্স সম্পন্ন করেন এবং ২০০৫ সালে প্রথম শ্রেণীতে মাস্টার্স (MS) ডিগ্রি অর্জন করেন।
★কর্মজীবন:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করার পর তিনি সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতি নেন এবং ২৭তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৮ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন।
তাঁর কর্মজীবনকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাগে দেখা যায়:
১. র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিতি (২০১৫ - ২০২০)
কর্মজীবনে সারওয়ার আলম সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও প্রশংসায় আসেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন। এই সময়ে তিনি প্রায় ৩০০-এর বেশি সফল মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালনা করেন।
★উল্লেখযোগ্য অভিযান: খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক মেশানো প্রতিরোধ, নকল কসমেটিকস ও ওষুধের কারখানা সিলগালা করা, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান, এবং হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নানাবিধ অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি আপসহীন ভূমিকা পালন করেন। সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপগুলোর জন্য তিনি "জনতার ম্যাজিস্ট্রেট" হিসেবে পরিচিতি পান।
২. মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন
২০২০ সালের নভেম্বর মাসে তাঁকে র্যাব থেকে বদলি করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি সরকারের উপ-সচিব পদে পদোন্নতি পান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একান্ত সচিব (PS) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
৩. সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব ও সাম্প্রতিক আপডেট
২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী 'সাদাপাথর' পর্যটন কেন্দ্রের পাথর লুট ও চুরির ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা জোরদার ও পরিবেশ রক্ষায় তিনি সেখানে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেন।
সর্বশেষ তথ্য (জুন ২০২৬): সম্প্রতি সিলেটের বিখ্যাত হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারের দানবাক্স ও ডেগ সিলগালা করে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরই প্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ২১ জুন রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে তাঁকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব পদে বদলি করা হয়েছে।
ধর্মচর্চায় পরিবার:
সরওয়ার আলমের বাবা বুরহান উদ্দীন এবং দাদা মুরশিদ উদ্দীন উভয়ই খুব দ্বীনদার ছিলেন,
মাসিক মদিনা সম্পদনা মাওলানা মহীউদ্দীন খান রাহ. এবং হজরত মাদানি রাহ.-এর অন্যতম খলিফা মাওলানা আমিনুল হক্ব মাহমুদী রাহ. উভয়ের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলেন তারা, জনাব সারওয়ার আলমের দাদী মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রাহ.-এর মামাতো বোন, তারা মাসিক মদিনার নিয়মিত পাঠক ছিলেন, ডিসি সারওয়ার আলম সাহেব এবং তার পরিবার আহলে হক্ব আলেমদের মাধ্যমে ইসলামি শিক্ষা অর্জন করেছেন, তিনি নিজে পাকুন্দিয়া মংগল বাড়ীয় মাদ্রাসার ছত্র ছিলেন।
★ব্যক্তিগত জীবন:
ব্যক্তিগত জীবনে মো. সারওয়ার আলম ২০০৯ সালে চট্টগ্রামের সন্তান সানজিদা শারমিন লিন্ডার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি চার কন্যাসন্তানের (মাহরিন সামারা, নাজিফা সাফরিন, তানহা এবং মানহা) জনক।
লেখক-
খিজির মুহাম্মদ জুলফিকার