প্রেস বিজ্ঞপ্তি
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ অমিতাভ বড়ুয়ার ছবি স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কেন্দ্রের ফটো গ্যালারিতে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কেন্দ্রের পরিচালক শাহীন আখতার এবং উপ-আঞ্চলিক পরিচালক তাব্বাসুম হকের হাতে ওস্তাদ অমিতাভ-পায়রা ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা ওস্তাদ অমিতাভ বড়ুয়ার একটি দুর্লভ ছবি তুলে দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ওস্তাদ অমিতাভ বড়ুয়ার কন্যা, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী পাপিয়া বড়ুয়া, ফাউন্ডেশনের সদস্য সাংবাদিক রতন বড়ুয়া এবং চ্যানেল আইয়ের সংগীতশিল্পী জনি বড়ুয়া।
ওস্তাদ অমিতাভ বড়ুয়ার ছবি গ্রহণ করায় আঞ্চলিক পরিচালক ও উপ-আঞ্চলিক পরিচালকের প্রতি অমিতাভ-পায়রা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
সংগীতে নিবেদিতপ্রাণ, নিভৃতচারী সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ অমিতাভ বড়ুয়ার জন্ম ১৯২৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামে। তাঁর বাবা হলধর বড়ুয়া এবং মা বঙ্গবালা বড়ুয়া। দুই সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ, আর তাঁর একমাত্র ছোট বোন দীপ্তি বড়ুয়া।
মহামুনি পাহাড়তলীর সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাঁকে সংগীত সাধনায় অনুপ্রাণিত করে। একই গ্রামের কৃতী সংগীতসাধক মোহনচন্দ্র বড়ুয়া এবং জ্যেষ্ঠ আত্মীয় মুনিন্দ্রলাল বড়ুয়ার কাছ থেকেও তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনুপ্রেরণা লাভ করেন।
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তাঁর গুরু ছিলেন ওস্তাদ মকসুদ আলী খান ও ওস্তাদ ফজলুল হক।
তিনি দীর্ঘদিন "প্রাচ্য ছন্দগীতিকা" ও "শাশ্বত ললিতকলা একাডেমি"-তে সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া "সঙ্গীত পরিষদ"-এর অধ্যক্ষ এবং ওস্তাদ নীরদবরণ বড়ুয়া প্রতিষ্ঠিত "সুরসপ্তক সংগীত বিদ্যাপীঠ"-এর অধ্যক্ষ হিসেবে আমৃত্যু নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের পাশাপাশি আঞ্চলিক, লোকগীতি ও আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবেও তিনি একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
১৯৬০ সালের ২৩ ডিসেম্বর এইচএমভি (HMV) কোম্পানি থেকে তাঁর ৬টি গ্রামোফোন রেকর্ডে ১২টি গান প্রকাশিত হয়। ১৯৬২ সালের ৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচার শুরু হওয়ার দিন থেকেই তিনি গীতিকার ও শিল্পী হিসেবে আমৃত্যু যুক্ত ছিলেন।
চট্টগ্রাম টেলিভিশন কেন্দ্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তিনি অংশ নেন। তাঁর রচিত চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান "গুরা বউ সইন্ধ্যাকালে চেরাগ দিতো গেইল" শিল্পী শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের কণ্ঠে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
এছাড়া তিনি জাতীয় গণমাধ্যম বেতার ও টেলিভিশনের বিচারকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে রয়েছেন দিলারা আলো, আরেফিন হক আলো, কল্যাণী ঘোষ, মিনতি পাল, মানস পাল চৌধুরী, সুলতানা শারমিন ও পাপিয়া আহমেদ।
'মহুয়া' ছদ্মনামে তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গল্প, কবিতা, নিবন্ধ ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে "প্রভাতী", "বহ্নিশিখা" (কাব্যগ্রন্থ), "গীতিশতক" (গানের সংকলন), "জ্ঞানতাপস" (মোহনচন্দ্র বড়ুয়ার জীবনী) এবং ধারাবাহিক উপন্যাস "গল্প তেরশ সাতাত্তর", "পাথেয়" ও "ঝরাফুল"।
জীবদ্দশায় বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টিপ্রচার সংঘ তাঁকে "গীতশ্রী" ও "সাহিত্যরত্ন" উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়া চট্টল ইয়ুথ স্কয়ার, মহামুনি সাংস্কৃতিক সংঘ, মহামুনি তরুণ সংঘ, নাজিরহাট সঙ্গীতাঙ্গন, রমনী মোহন স্মৃতি সংসদ এবং রাউজান সরগম সঙ্গীত বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাঁকে সম্মাননা প্রদান করে।
এশিয়া মহাদেশের প্রথম ডি-লিটপ্রাপ্ত বেণীমাধব বড়ুয়ার নাতনি, রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ঘাটচেক গ্রামের শিক্ষক, চিকিৎসক ও তৎকালীন মেম্বার বাবু সুনিল কান্তি বড়ুয়া এবং আশালতা বড়ুয়ার কন্যা সবিতা বড়ুয়া পায়রার সঙ্গে ওস্তাদ অমিতাভ বড়ুয়া বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
তাঁদের চার পুত্র ও চার কন্যা সন্তান রয়েছে। তাঁদের সন্তানরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। পুত্র অনুভব বড়ুয়া ফ্রান্সপ্রবাসী এবং ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত তবলা শিল্পী। কন্যা পাপিয়া বড়ুয়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী।
২০০৭ সালের ১১ জুলাই মহান এই শিল্পী, সুরকার, গীতিকার, সাহিত্যসাধক ও সংস্কৃতিপ্রেমী ওস্তাদ অমিতাভ বড়ুয়া পরলোকগমন করেন।