ই হক তৈয়ব:
বর্তমান সময়ে চোখের নানা জটিলতা নীরবে বাড়ছে। প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, ডায়াবেটিসের বিস্তার, দূষণ ও সচেতনতার অভাব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে চক্ষুরোগ এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন প্রফেসর ডা. কিউ এম ইকবাল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক চিকিৎসা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি জানান, “চোখের বেশিরভাগ সমস্যাই শুরুতে ছোট মনে হলেও সময়মতো চিকিৎসা না নিলে তা জটিল রূপ নেয়। তাই সচেতনতা ও নিয়মিত পরীক্ষা খুব জরুরি।”
চোখের সাধারণ সমস্যা ও বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়—
১. রিফ্রাকটিভ এরর (চশমার সমস্যা):
শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক—অনেকেই দূরের বা কাছের জিনিস ঝাপসা দেখেন। মোবাইল ও কম্পিউটার ব্যবহারের কারণে এ সমস্যা দ্রুত বাড়ছে।
২. ছানি (ক্যাটারাক্ট):
বয়স্কদের মধ্যে অন্ধত্বের প্রধান কারণ। সময়মতো অপারেশন না করলে দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ হারানোর ঝুঁকি থাকে।
৩. গ্লুকোমা (চোখের চাপ বৃদ্ধি):
নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত। শুরুতে লক্ষণ না থাকায় অনেকেই দেরিতে ধরা পড়েন।
৪. ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি:
ডায়াবেটিস রোগীদের চোখের রেটিনায় ক্ষতি হয়। দেশে ডায়াবেটিস বৃদ্ধির সাথে সাথে এ রোগও বাড়ছে।
৫. ড্রাই আই (চোখ শুষ্ক হওয়া):
দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে চোখে জ্বালা, পানি পড়া বা শুষ্কতা দেখা দেয়।
৬. কর্নিয়া ও সংক্রমণজনিত সমস্যা:
অপরিচ্ছন্নতা, কনট্যাক্ট লেন্সের ভুল ব্যবহার বা আঘাতের কারণে কর্নিয়ার সমস্যা বাড়ছে।
আধুনিক চিকিৎসা ও সমাধান
প্রফেসর ডা. কিউ এম ইকবাল হোসেন বলেন, “বর্তমানে চক্ষু চিকিৎসায় ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে, যা সঠিক সময়ে নিলে অধিকাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব।”
চশমা ও লেজার চিকিৎসা: রিফ্রাকটিভ সমস্যার জন্য
ফ্যাকো সার্জারি: ছানি অপারেশনের আধুনিক ও নিরাপদ পদ্ধতি
লেজার থেরাপি: গ্লুকোমা ও ডায়াবেটিক চোখের রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর
ইনজেকশন ও মেডিকেশন: রেটিনার জটিল রোগে ব্যবহৃত
কৃত্রিম অশ্রু ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন: ড্রাই আই সমস্যায় উপকারী

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন—
নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা (বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের)
প্রত্যেক শিশুকে স্কুলে ভর্তির শুরুতেই চক্ষু পরীক্ষা করে দেখা।
এর মাধ্যমে পরবর্তী সময়ের বহু জটিলতা থেকে চোখ রক্ষা পায়।
শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করা
পর্যাপ্ত আলোতে পড়াশোনা করা
চোখে সমস্যা হলে নিজে নিজে ওষুধ ব্যবহার না করা
পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ (ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাদ্য)
নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা
জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান
তিনি মনে করেন, গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক মানুষ চোখের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। “প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে অন্ধত্বের ঝুঁকি অনেক কমানো সম্ভব। তাই গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন,”—যোগ করেন তিনি।
শেষ কথা;
চোখ মানবজীবনের অমূল্য সম্পদ। আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা থাকা সত্ত্বেও সচেতনতার অভাবে অনেকেই দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছেন। প্রফেসর ডা. কিউ এম ইকবাল হোসেনের মতে, “সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও চিকিৎসাই পারে সুস্থ দৃষ্টি নিশ্চিত করতে।”
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও সচেতনতার মাধ্যমেই একটি দৃষ্টিসম্পন্ন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।