
হাকিকুল ইসলাম খোকন, বাপসনিউজ:
ঢাকাসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আলোচনা সভা ও প্রতিকৃতিতে মাল্যদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তমের ৫০তম হত্যা দিবস পালন করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। খবর আইবিএন নিউজ।
নেত্রকোনার পূর্বধলার কাজলা গ্রামে শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তমের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
বাংলাদেশের জন্মশত্রু-চিরশত্রুদের কবল থেকে দেশ পুনরুদ্ধারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতীয় পুনর্জাগরণ সংঘটিত করতে হবে—জাসদের আলোচনা সভায় বক্তারা এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মুক্তিযুদ্ধে মৃত্যুঞ্জয়ী সেক্টর কমান্ডার, মহান বিপ্লবী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মহানায়ক শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তমের ৫০তম হত্যা দিবস উপলক্ষে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গত ২১ জুলাই ২০২৬, মঙ্গলবার, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আলোচনা সভা, শহীদ কর্নেল তাহেরের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান, নেত্রকোনার পূর্বধলার কাজলা গ্রামে তার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং দলীয় কার্যালয়সমূহে দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।
জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বাপসনিউজকে এ তথ্য জানান।
শহীদ কর্নেল আবু তাহেরের ৫০তম হত্যা দিবস উপলক্ষে জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির উদ্যোগে গত ২১ জুলাই ২০২৬, মঙ্গলবার, বিকেল ৪টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ শহীদ কর্নেল তাহের মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট রবিউল আলমের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মীর্জা আনোয়ারুল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ সভায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মা-লে)-এর পলিটব্যুরোর সদস্য মোশাহিদ আহমেদ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা এবং গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজ সেলিম।
জাসদ নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন দলের সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সফি উদ্দিন মোল্লা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন খান জকি, শওকত রায়হান, নইমুল আহসান জুয়েল, মোহাম্মদ মোহসীন, ওবায়দুর রহমান চুন্নু, স্থায়ী কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুজ্জামান বাদশা, জাতীয় যুব জোটের সভাপতি শরিফুল কবির স্বপন, জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশের সহ-সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক, জাতীয় নারী জোটের নেত্রী সৈয়দা শামীমা সুলতানা হ্যাপি এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র)-এর সহ-সভাপতি গোলাম কিবরিয়াসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
আলোচনা সভায় বক্তারা মুক্তিযুদ্ধে মৃত্যুঞ্জয়ী সেক্টর কমান্ডার, মহান বিপ্লবী এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মহানায়ক শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, কর্নেল তাহের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
বক্তারা বলেন, কর্নেল তাহের তার রাজনৈতিক আদর্শগত দূরদৃষ্টির মাধ্যমে ১৯৭২ সালেই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামো ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনরুত্থানের আশঙ্কা করেছিলেন। তাই তিনি ‘মুক্তিযোদ্ধারা আবার জয়ী হবে’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখে মুক্তিযোদ্ধাদের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামো এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পরিবর্তনের বিপ্লবী সংগ্রাম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তারা আরও বলেন, কর্নেল তাহের সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে শুধু কথার কথা হিসেবে না নিয়ে সেনাবাহিনীর লোভনীয় চাকরি ছেড়ে বিপ্লবী সংগ্রামে যুক্ত হন এবং ১৯৭৫ সালের মহান সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষমতার কেন্দ্রে আঘাত হেনেছিলেন।
বক্তারা আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জনগণ এবং মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিহিংসার শিকার হন। কর্নেল তাহেরও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন। তাকে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের ১ নম্বর সামরিক ট্রাইব্যুনালে মিথ্যা মামলায় সাজানো বিচারের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
বক্তারা বলেন, ইতিহাসের নির্মম পরিহাস—সেনাবাহিনীর উশৃঙ্খল অফিসারদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও ক্ষমতা দখলের উন্মত্ততার বিরুদ্ধে সিপাহীদের সুশৃঙ্খল বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়ে কর্নেল তাহের জিয়াউর রহমানসহ অসংখ্য সেনা কর্মকর্তার জীবন রক্ষা করেছিলেন। অথচ তাকেই পরবর্তীতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।
তারা আরও বলেন, আজও শহীদ কর্নেল তাহেরের মতো জননেতা হাসানুল হক ইনু ও জননেতা রাশেদ খান মেনন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন।
বক্তারা আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদে, পাকিস্তানের ফিল্ড কো-অর্ডিনেশনে কোটা আন্দোলনের ছদ্মবেশে সশস্ত্র জঙ্গিবাদীদের উত্থান ঘটিয়ে রেজিম চেঞ্জ অপারেশনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্মশত্রু-চিরশত্রু স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ধর্মান্ধ ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টরা বাংলাদেশ দখল করে নিয়েছে।
তাদের মতে, বাংলাদেশের জন্মশত্রু-চিরশত্রুদের কবল থেকে দেশ পুনরুদ্ধারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতীয় পুনর্জাগরণ সংঘটিত করাই এখন দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক এবং সামাজিক শক্তির প্রধান ও প্রাথমিক রাজনৈতিক কর্তব্য।
বক্তারা প্রতিহিংসামূলক মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি জননেতা রাশেদ খান মেনন, জননেতা হাসানুল হক ইনুসহ কারাবন্দি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিও জানান।
আলোচনা সভার পূর্বে শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তমের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করেন জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি ও ঢাকা মহানগর কমিটি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মা-লে), গণতন্ত্রী পার্টি, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, জাতীয় শ্রমিক জোট-বাংলাদেশ, জাতীয় যুব জোট, জাতীয় নারী জোট, জাতীয় আইনজীবী পরিষদ এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র)।
জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটি, ময়মনসিংহ জেলা কমিটি ও নেত্রকোনা জেলা কমিটির পক্ষ থেকে গত ২১ জুলাই ২০২৬, মঙ্গলবার, সকাল সাড়ে ১০টায় নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলার কাজলা গ্রামে শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তমের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সমাধি চত্বরে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রতন সরকার, ময়মনসিংহ জেলা জাসদের সদস্য আজিজুল হক, ময়মনসিংহ কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস ও ময়মনসিংহ জেলা জাসদের সদস্য নূর হোসেন, ময়মনসিংহ মহানগর জাসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন এবং নেত্রকোনা জেলা জাসদের প্রচার সম্পাদক সম্রাট হোসেন প্রমুখ।
এদিকে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরেও পালন করা হয়। কর্নেল আবু তাহের অনুসারীদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সভায় জেএসএফ সংগঠক হাজী আনোয়ার হোসেন লিটনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা, সিনিয়র সাংবাদিক ও লায়ন হাকিকুল ইসলাম খোকন।