মো: মারুফ, চট্টগ্রাম সিটি রির্পোটার
সেফটি কমিটির সভায় উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাসেল কনভেনশন এবং নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে। এই দুই কনভেনশনের মূল দর্শন হলো—পরিবেশ সুরক্ষা এবং শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষ ও পরিবেশ উভয়ের সুরক্ষা সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ঐতিহাসিক ফিলাডেলফিয়া ঘোষণা (Philadelphia Declaration, 1944) বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এই ঘোষণায় বলা হয়েছে, “শ্রম কোনো পণ্য নয়” এবং “যেখানেই দারিদ্র্য থাকবে, সেখানেই সমগ্র বিশ্বের সমৃদ্ধি হুমকির মুখে থাকবে।” ঘোষণাটি আরও উল্লেখ করে যে, সকল মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সমান সুযোগ, মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO) বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে, নিরাপদ ও টেকসই জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে শ্রমিককে। অথচ আমাদের বাস্তবতায় গ্রিন ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠার আলোচনায় শ্রমিকের স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পেশাগত রোগ প্রতিরোধের বিষয়গুলো প্রায়ই প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
ফিলাডেলফিয়া ঘোষণার আলোকে জাহাজভাঙা শিল্পের বর্তমান রূপান্তরকে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, শিল্পের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটলেও শ্রমিকের মানবিক ও সামাজিক অধিকার এখনো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। একটি শিল্পকে আধুনিক বা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বলা যাবে না যদি সেই শিল্পের শ্রমিকরা পেশাগত রোগে আক্রান্ত হন, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা না পান, কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন কিংবা অসুস্থতা ও অক্ষমতার ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকেন।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অনুযায়ী “শোভন কাজ” (Decent Work), “সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ” এবং “দায়িত্বশীল উৎপাদন ও ভোগ” নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। তাই জাহাজভাঙা শিল্পে কেবল আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন বা অবকাঠামো উন্নয়নকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্জিত হবে যখন একজন শ্রমিক নিরাপদে কাজ করতে পারবেন, কর্মক্ষেত্রে অসুস্থ হলে যথাযথ চিকিৎসা পাবেন, পেশাগত রোগে আক্রান্ত হলে ক্ষতিপূরণ পাবেন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ লাভ করবেন।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন—পরিবেশ ও শ্রমিকের স্বার্থ পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। একটি শিল্প তখনই সত্যিকার অর্থে সবুজ (Green) হতে পারে, যখন তা পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকেও সমান গুরুত্ব দেয়।
বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প আজ এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর (Just Transition) হতে হবে। অর্থাৎ পরিবেশগত উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমিকদের কাছেও পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় গ্রিন ইয়ার্ডের সাইনবোর্ড থাকলেও শিল্পের ভেতরে বৈষম্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অনিরাপত্তা থেকেই যাবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই আমাদের আহ্বান—জাহাজভাঙা শিল্পকে শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, শ্রমিকবান্ধবও করতে হবে। কারণ পরিবেশ রক্ষার সংগ্রাম এবং শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম মূলত একই সংগ্রাম—মানুষ ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ রক্ষার সংগ্রাম।