মো: মারুফ, চট্টগ্রাম সিটি রির্পোটার
চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার আমবাগান থেকে ডবলমুরিং থানার ঝর্ণাপাড়া— বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক বেচাকেনা, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে আলমগীর নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, মাদকের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে একাধিক কিশোর গ্যাং পরিচালনার পাশাপাশি অস্ত্রের মহড়াও দেন তিনি। এতে পুরো এলাকায় তৈরি হয়েছে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা।
এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে এলাকাবাসীর তীব্র ক্ষোভের মুখে প্রায় তিন সপ্তাহ আগে নগর পুলিশের উত্তর জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) আমিরুল ইসলাম প্রকাশ্যে আলমগীরকে ‘নিজ দায়িত্বে নিজ হাতে’ গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেন। কিন্তু সময় গড়ালেও এখন পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন অভিযুক্ত এই ব্যক্তি। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে— ঘোষণার পরও কেন অধরা আলমগীর?
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আলমগীরকে গ্রেপ্তারে শতভাগ চেষ্টা চলছে। তার বাসা আমবাগান এলাকায় হলেও তিনি নিয়মিত সেখানে থাকেন না। বেশিরভাগ সময় ডবলমুরিং থানার ঝর্ণাপাড়া এলাকায় অবস্থান করেন।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, থানা পুলিশের একটি অংশের সঙ্গে আলমগীরের ‘সুসম্পর্ক’ রয়েছে। শুধু আলমগীর নন, তার পরিবারের সদস্যরাও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। মাদক বেচাকেনা নির্বিঘ্ন রাখতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের রাত ৯টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়। নির্দেশ অমান্য করলেই নেমে আসে হামলা ও মারধরের খড়্গ।
ঝর্ণাপাড়ার বাসিন্দা ‘মো. হানিফ’ বলেন, ‘রাত ৯টার পর এলাকায় কেউ দোকান খোলা রাখতে সাহস পায় না। কথা না শুনলে লোকজন নিয়ে এসে ভয়ভীতি দেখায়, মারধরও করে।’
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৫ মে রাত ৯টার দিকে ঝর্ণাপাড়া এলাকায় অনুসারীদের নিয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন আলমগীর। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্থানীয় মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়।
পরে এলাকাবাসীর সঙ্গে আলমগীর গ্রুপের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই সময় উত্তেজিত জনতার সামনে ডিসি আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কথা দিচ্ছি, নিজ দায়িত্বে নিজ হাতে আলমগীরকে গ্রেপ্তার করবো।’
স্থানীয়দের দাবি, আলমগীর আমবাগান এলাকায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন। তার মা রেনু বেগম, যিনি এলাকায় ‘সোনিয়ার মা’ নামে পরিচিত। জাহাঙ্গীর নামে তার এক ভাইও রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, পরিবারের একাধিক সদস্য অতীতে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেছেন। তবে জামিনে বেরিয়ে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ।
আলমগীরের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই হামলার শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, ভিন্নমত বা প্রতিবাদ দেখলেই সদলবলে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হামলা চালানো হয়।
গত ১৮ মে আলমগীরকে গ্রেপ্তারের দাবিতে পাহাড়তলী ঝর্ণাপাড়া এলাকায় প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বক্তারা অভিযোগ করেন, আলমগীর ও তার বাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতায় ঝর্ণাপাড়া ও সরাইপাড়া এলাকার সাধারণ মানুষের জীবন-নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।
সভায় বক্তারা বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, ব্যবসায়ীদের জোরপূর্বক দোকান বন্ধে বাধ্য করা এবং নির্দেশ অমান্য করলে মারধরের ঘটনা নিয়মিত হয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, আলমগীরের বিরুদ্ধে ১৫টির বেশি মামলা রয়েছে।
কিন্তু প্রকাশ্য ঘোষণার পরও তাকে গ্রেপ্তার না করায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এতে তার প্রভাব ও দাপট আরও বেড়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
দক্ষিণ পাহাড়তলীর এক বাসিন্দা ‘মো. সেলিম’ অভিযোগ করে বলেন, ‘ডবলমুরিং থানার কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে আলমগীরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তার অপরাধের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে পুলিশ কমিশনারের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তার কাছে অস্ত্রও রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঝাউতলা, নালাপাড়া, টাইগারপাস, ঝর্ণাপাড়া ও আমবাগান এলাকায় একাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে আলমগীর। থানায় তার বিরুদ্ধে কোনো তথ্য দিলে তা দ্রুতই তার কাছে পৌঁছে যায়।’ তবে অভিযোগের বিষয়ে আলমগীরের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।