রাবিয়া সুলতানা পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। নারী ও পুরুষকে এভাবেই দেখেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বর্তমানে নারীরা কোনো কাজেই পিছিয়ে নেই। তারা তাদের নিজ যোগ্যতায় এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর কয়েক দশক আগেও কর্মক্ষেত্রে নারীদের পদচারণা চোখে পড়ার মতো ছিলো না। কিন্তু এখন নারীরা ঘরে বাইরে সব পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করছে। বর্তমান নারীরা বড় অবদান রাখছে দেশের অর্থনীতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১০ সালে যেখানে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল ১৬ দশমিক ২ লাখ, সেখানে ২০১৬-১৭ সালে এসে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৬ লাখ। ১৯৭৪ সালে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি শ্রমবাজারে পুরুষ শ্রমিকের হার বৃদ্ধির তুলনায় বেশি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী বিগত বছরগুলোতে শ্রমবাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি হচ্ছে শ্রমবাজারে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ। ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে, গ্রামীণ নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার শহরের নারীর তুলনায় বেশি। আবার পোশাক খাত ছাড়াও এখন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, যোগাযোগ খাত, রিয়েল স্টেট সেবা, টেলিকমিউনিকেশন, ব্যাংকিং, ইনসিওরেন্স খাতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের একজন সংগ্রামী ও সফল নারী রাবিয়া সুলতানা। ১৯৮২ সালে মানিকগঞ্জের দৌলতপুরের চরকাটারী চরাঞ্চলে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। পিতা আব্বাস আলী মোল্লা। পেশায় একজন কৃষক। একজন স্বীকৃতিহীন মুক্তিযোদ্ধা। মাতা নুরুন্নাহার বেগম। একজন গৃহিনী। স্বামী মরহুম আবু দাউদ মধু বিশ্বাস। সন্তান হিসেবে রয়েছেন একমাত্র মেয়ে আফিয়া আবিদা মৈত্রী। ভাই বোনদের মধ্যে ৪ বোন- আছিয়া, আম্বিয়া, রাবিয়া, নাজমা ও তিন ভাই- আব্দুর রব সুজন, আমিনুর ইসলাম, শহিদুল ইসলাম। শ্বশুরবাড়ি রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলায়। বর্তমানে রাজধানীর মিরপুরে আনন্দ নগরে থাকেন তিনি। তার সংগ্রামী জীবন নিয়ে কথা হয় দেশের বহুল প্রচলিত মাসিক ম্যাগাজিন মানব জীবনের সাথে। তার সেই সাক্ষাৎকারটি মানবজীবন পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
মানবজীবন: কেমন আছেন? রাবিয়া সুলতানা: আল্লাহর রহমতে ভালোই আছি। করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের কাজের ব্যস্ততাও এককটু বেশি। এভাবেই চলছে। মানব জীবন: আপনার সংগ্রামী জীবনের ছোটবেলায় বেড়ে ওঠা সম্পর্কে কিছু বলুন। রাবিয়া সুলতানা: আমার ছোটবেলা কাটে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর এর চরকাটারী চরাঞ্চল এলাকায়। যমুনা নদীর পাড়ে। একসময় শত বিঘা জমির মালিক হওয়া সত্ত্বেও নি¤œবিত্তের কাতারে চলে আসতে হয়। যমুনার বুকে বিলিন হয়ে যায় আমাদের জমি জমা সব। সর্বনাশী যমুনার ছোবলে আমরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাই। তাইতো ছোটবেলা থেকেই জমিদারি জৌলুস হারিয়ে দুর্ভিক্ষের ভাগ্য বেছে নিতে হয় আমাদেরকে। সংসারের অভাব অনাটন এসব দেখেই কাটে আমাদের ছোটবেলা। কিন্তু আমরা হার মানিনি। নিঃস্ব থেকে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখি। মানবজীবন: আপনার ছোটবেলায় পড়াশোনা তথা প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে কিছু বলুন। রাবিয়া সুলতানা: ছোটবেলা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে আমাকে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তখন আমাদের এলাকায় লেখাপড়া করার মতো স্কুল ছিল না। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা দালানকোঠা সব সর্বগ্রাসী যমুনার পেটে চলে যায়। একসময় খালাতো বোন লেখাপড়া করানোর প্রতিশ্রুতি দিলে চলে গেলাম মা-বাবা ভাই-বোন ছেড়ে সুদূর চট্টগ্রাম। বয়স তখন সাত-আট বছর হবে। কিন্তু তিনি লেখাপড়া করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে গেলেও আর লেখাপড়া করালেন না। শুধু সারাদিন কাজ করাতেন। তাই আবার চলে এলাম ভাঙ্গা বাড়িতে। প্রথম শ্রেণী পার না করতেই বাড়ি এসে ভর্তি হলাম তৃতীয় শ্রেণীতে। ইতোমধ্যে পারিবারিক অবস্থা আরো খারাপ হতে থকলো। জমানো ধান গম গরুর পাল সব শেষ হয়ে যেতে লাগলো। বড় আপা তখন ঢাকায় থাকেন সপরিবারে। চলে এলাম ঢাকা আমিনবাজারে। পাশের বাসার এক ফুফু বললেন ওনার বাসায় যেন থাকি। খুব জৌলুষপূর্ণ জীবন-যাপন করবো পাশাপাশি লেখাপড়া করতে পারব। আমিতো খুশি চলে গেলাম সেই বাসায়। দারুন আদর ভালোবাসা দিয়ে রাখলেন কিন্তু স্কুলে ভর্তি করার নাম নেই। সেখানেও সারাদিন কাজ করাতেন তিনি। সারাদিন কাজ করে রান্না ঘরের আলো নিভিয়ে বাইরের লাইটের আলো দিয়ে মশার কামড় খেতাম আর পড়তাম। আমার বাবা ঢাকয় আসলেন আমাকে দেখতে। এসে দেখলেন আমাকে স্কুলে ভর্তি করে নি তাই সে দিনে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণি ডিঙিয়ে চতুর্থ শ্রেণীর মাত্র চার দিন বাকি বার্ষিক পরীক্ষা। মা বললেন পরীক্ষা দিলে পাস করতে পারবি? বললাম হ্যাঁ আমাকে পারতেই হবে। আমার মনে আছে। স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার চারদিন আগে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া শুরু করলাম। চার দিনে ছয় বিষয় ঝালাপালা করে সারা দিন-রাত পড়াশোনা করলাম। পরীক্ষা দিয়ে আমার রোল হল চার। শুরু হলো এগিয়ে যাওয়ার যুদ্ধ। তখন থেকেই টিউশনি শুরু করলাম ১০ টাকা বেতনে। তাতেই সারা বছরের খাতা-কলম খরচ চলে যেত। কষ্টকে সঙ্গী করে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চললাম। স্কুলজীবন থেকেই আমি কোকিল কন্ঠি ছিলাম। হাই স্কুলে আমার সাথে রেডিও টিভি কণ্ঠশিল্পীর প্রতিযোগিতা হয়েছিল কিন্তু আমি প্রথম হয়েছিলাম তাই আমার স্কুলের শিক্ষক মন্ডলী আমাকে এসএসসি পর্যন্ত বিনা বেতনে লেখাপড়া করার সুযোগ দেন। আমি তখন চরকাটারি সবুজসেনা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ি। তখন আমাদের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আব্দুর রশিদ স্যার। আমার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার অন্যতম কর্ণধার আমার প্রাণপ্রিয় সুরুজ বিএসসি স্যার। সব শিক্ষক খুব ভালোবাসতেন আমায়। ছাত্রী হিসেবে ভাল ছিলাম তাই। ১৯৯৭ সালে চরকাটারি সবুজসেনা থেকে আমরা শতাধিক শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দেই। সে বছরের পরীক্ষা খুব কঠিন হয়েছিল। তারপরেও সবার মধ্যে আমি ভালো রেজাল্ট করে উত্তীর্ণ হয়ে ছিলাম। আমরা সহপাঠিরা ছিলাম একই সুতায় গাঁথা যেন একটি মালার মতো। দারুন আনন্দময় ছিল সে সময় গুলো। মানবজীবন: আপনি তো চরাঞ্চলে বড় হয়েছেন। তখনকার গ্রাম্য জীবন সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন। রাবিয়া সুলতানা: তখনকার গ্রাম্য জীবন খুবই উপভোগ্য। স্কুল থেকে ফিরে বইগুলো রেখেই নাদীতে গোসলে নামতাম। প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে পুকুরে খেলাধুলা গোসল করতাম। আম কাঁঠাল গাছের মগডালে উঠে পানিতে লাফিয়ে পড়তাম। সেসব স্মৃতি এখন মনে হলে গা শিউরে ওঠে। বৃষ্টির দিনে বাগানে বস্তা নিয়ে আম কুড়াতে বের হতাম। ধান কাটা, পাট কাটা, খেতে মই দেওয়া, আলু তোলা, আখ থেকে গুর বানানো, যমুনা নদী থেকে মাছ ধরা সব কাজে পারদর্শী ছিলাম। ছোটবেলায় খেলাধুলাতেও ছিলাম চ্যাম্পিয়ন। দৌঁড়ে কোনদিনও প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হইনি। মানবজীবন: আপনি ঢাকায় কখন কিভাবে আসলেন? রাবিয়া সুলতানা: ১৯৯৮ সালে ভর্তি হই মিরপুর সরকারি বাংলা কলেজে। ছোটবেলা একবার ঢাকায় এসেছিলাম। কিন্তু তখন থাকতে পরিনি। পুনরায় ঢাকায় আসলাম। এবার বড় ভাইয়ের সাথে। বড়[ ভাই আব্দুর রব সুজন ভাই আমার জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে সাহায্য করেছেন। মাথার ওপর ছাঁয়া হয়ে ছিলেন তিনি। ঢাকায় এসে পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করলাম টিউশনি ও সঙ্গীত সাধনা। যোগ দিলাম সংগীত একাডেমীতে। ২০০০ সালে সাউন্ডটেক এর ব্যানার থেকে এবং ২০০২ সালে আবু দাউদ মধু বিশ্বাস, এ আর সুজন, রুহুল আমিন, ইয়াকুব আলী বাচ্চু, তুষার ভাইয়ের কথায়, শেখ রফিক এর সুরে গানের অ্যালবাম বের হয়। সেজন্য কলেজে ভিশন জনপ্রিয়তা ছিল আমার। মানবজীবন: আপনি নাকি বিএনসিসিতে কাজ করেছিলেন। সে অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু বলুন। রাবিয়া সুলতানা: আমার জীবনে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। কলেজে থাকতেই আমি যোগদান করি বিএনসিসিতে। খুব কড়া নিয়ম কানুন। মাঠে বসে আড্ডা দেওয়া যাবে না। কোন ছেলের সাথে মেশা যাবে না এমনকি দাঁড়িয়েও কথা বলা যাবে না। সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স। বিএনসিসির মাধ্যমে অনেক অর্জন আমার জীবনে। প্রায় সারা দেশের দর্শনীয় স্থান দেখার সুযোগ হয়েছে ক্যাডেট কোর এর মাধ্যমে। খুলনা, চট্টগ্রাম যখন ক্যাম্প হত ফায়ারিং করতাম। বন্দুক দিয়ে গুলি ছুড়তে যে কি মজা লাগতো তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। প্রথমে সাধারণ ক্যাডেট, তারপর লেন্স কর্পোরাল । কর্পোরাল সার্জেন্ট এবং সর্বোচ্চ পজিশন ক্যাডেট আন্ডার অফিসার। শত শত ক্যাডেট এর মধ্যে একজন সিইউও অসাধারণ পাওয়ার। ঢাকা আর্মি স্টেডিয়ামে সিইউও এর ব্যাচ পরিধান করি। আমার বড় ভাই গিয়েছিলেন অভিভাবক হিসাবে। কিন্তু আমাকে যখন ব্যাচ পড়ানো হয় তখন তাকে দেখার সুযোগ হয়নাই। কারণ আমি তপ্ত রোদের মধ্যে রাইফেল নিয়ে যখন প্যারেড করছিলাম। সেসময় তার পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল না। কারণ সর্বোচ্চ র্যাংক করার জন্য সর্বোচ্চ কঠিন প্যারেড করতে হচ্ছিল। সিইউও’র ব্যাচ পড়ানোর আগের দিনই কঠিন শাস্তি পেয়েছিলাম। ৩০ সেকেন্ডে ড্রেস, জুতা, চুল বেনী করে রেডি হতে হবে। তাই তাঁবুতে শুতে যাওয়ার সময় চুল বেঁধে শার্টের বোতাম লাগিয়ে রাখতাম। সকালে শুধু বাথরুম সেরে অল্প সময়ে রেডি হতাম। কিন্তু আমার সিনিয়র আপা চাননি আমি ওই পোস্টে যাই। তাই যখন তখন তিনি আমাকে নানা ধরনের চাপে রাখতেন । একটা মজার স্মৃতি আছে তখনকার। আমাদেরকে যেদিন ব্যাচ পড়ানো হবে, সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে লাইন ধরেছি বাথরুমে যাওয়ার জন্য। সে সময় আমার ডাক আসে। তখন বাথরুম না সেরেই আমাকে দৌঁড় দিতে হয়েছিল। এক দৌঁড়ে গিয়ে ‘জি স্যার’। ছেলেমেয়ে সব সিনিয়রকে স্যার বলতে হতো। কমান্ড দিলেন জলদি প্যারেড তালে তালে। আমার সেদিন অনেক কষ্ট হচ্ছিল। কষ্টে দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছিল। পাশে ছিল হোম ইকোনোমিক কলেজ এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটির মেয়েদের তাবু। তখন হোম ইউকোনোমির লীনা আপা, বাংলা কলেজের কয়েকজন সার্জেন্ট আমাদের সেই সিনিয়রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। এবং সিনিয়র সিইউও আব্দুস সালাম স্যার, সানোয়ার স্যার এবং আমার প্রাণপ্রিয় প্রফেসর আন্ডার অফিসার জাহিদা মেহেরুন্নেসা ম্যাডাম কে জানায়। ম্যাডাম এসে আমাদের শাস্তি বন্ধ করে। আমার প্রিয় স্যার প্রফেসর আন্ডার অফিসার ফারুক ঢালির কানেও বিষয়টি চলে যায়। শেষ হয় সেই সিনিয়রের চক্রান্ত। সারাদিন প্যারেড করার পর সন্ধ্যা থেকে হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনেক আনন্দ হতো রাত পর্যন্ত। গান গাওয়া দারুন সব ক্যাম্পেই জনপ্রিয়তা ছিল আমার। আমরা সহপাঠিরা জমিয়ে রাখতাম পুরো ক্যাম্প।
মানবজীবন: আপনার কর্মজীবনের শুরু সম্পর্কে কিছু বলুন: রাবিয়া সুলতানা: আমি কলেজ জীবনে থাকতেই ১৯৯৮ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের একটা চাকরিতে জয়েন করি। সে ১৯৯৮ সালে সারা দেশে বন্যা হয়েছিল। আমরা রুটি, চিড়া, গুর বন্যার্তদের সহযোগিতা করতাম। তখন অনেক কাজের চাপ ছিল। চাকরি, টিউশনি, কলেজ, বিএনসিসি একসাথে চালানো হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম ছিল। তাই লেখাপড়ার ক্ষতি হবে বলে চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। তার সাথে যুক্ত হলাম লায়ন্স ক্লাবের স্বেচ্ছাসেবক দলে। লিও ক্লাব অব ঢাকা মিরপুরের পরিচালক (মহিলা) হিসেবে কাজ করতাম। ৬ টি দেশ থেকে লায়ন্স এসেছিলেন শীতকালীন ভ্রমণে মহাস্থানগড়ে। সেখানেও বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ছিল। সেখানেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। খেলায় দৌঁড়ে ৩১ জন প্রতিযোগী পাকিস্তান আমেরিকাসহ আরো চারটি দেশের লায়ন্সরা অংশ নেয়। সেখানেও আমি প্রথম স্থান অধিকার করি। মিউজিক্যাল চেয়ার গান অভিনয় সব ইভেন্টে আমি পুরস্কৃত হই। আমি বিএড পাস করার পরে সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করি। কিন্তু ভাগ্যে ছিল না। শিক্ষিকা হওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল আমার। তখন বিভিন্ন কিন্টারগার্ডেন প্রতিষ্ঠা হয়। সনেট কিন্টারগার্ডেন আসমা বিদ্যানিকেতনে শিক্ষিকতা হিসেবে আমার প্রথম চাকরি। পরবর্তিতে স্বপ্ন পূরণ হলো আরেক ধাপ এগিয়ে। চাকরি হলো ১০০ বছর পুরনো হাইস্কুলে। মিরপুর সিদ্ধান্ত হাই স্কুল চাকরি হলো ২০০৬ সালে । মানবজীবন: সে সময় আপনি সঙ্গিত ছাড়াও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আরও কি কি বিষয়ে কাজ করতেন? রাবিয়া সুলতানা: আমি ছাত্রীজীবন থেকেই নাটক লিখেছি। নিজেই স্ক্রিপ্ট লিখাতাম এবং পরিচালনা করতাম পথনাটক, মঞ্চনাটক। সে সময় প্রশিকা নামক এক সংস্থায় কাজ করতাম। একটা নাটকে মাথাপিছু মাত্র ৭০ টাকা মজুরি দিত প্রশিকা। ৩১টা নাটক পরিচালনা করেছি এবং অভিনয় করেছি। তাছাড়া ওই সময়ে এটিএন বাংলায় বিশিষ্ট কৌতুক অভিনেতা অনিল কুমার বিশ্বাসের সাথে একটা ম্যাগাজিনে অভিনয় করতাম। মানবজীবন: আপনার জীবনে ভালো মানুষ হিসেবে আপনি কাকে মূল্যায়ন করবেন? রাবিয়া সুলতানা: আমার জীবনে ভালো মানুষ কাউকে যদি বলতেই হয় তবে সেটা বলবো আমি আমার খালু কবি হাবিবুর রাহমান খানকে। কবি হাবিবুর রহমান খান যিনি ছিলেন বাংলাদেশে চেয়ারম্যান কবিতা কাননের অন্যতম। যিনি ছিলেন সততার প্রতীক। একজন পাক্কা ঈমানদার নির্লোভ। যিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন কিন্তু সার্টিফিকেট নেননি। পৃথিবীতে এমন ভালো মানুষ দ্বিতীয়টা দেখিনি আমি আমার জীবনে। আমার লেখাপড়া যখন শেষ পর্যায়ে। বিএসএস পরীক্ষা শেষ কিন্তু রেজাল্ট পাইনি তখনও। আমার খালু একটি প্রস্তাব দিলেন আমি যেন বিএড এ ভর্তি হই। আমি বললাম পরিক্ষার ফল তো প্রকাশ হয়নি। তখন উনি বললেন কেন? তুমি কি ফেল করবা। আমি বললাম আমি যেভাবে পরিক্ষা দিয়েছি ফেল করার কথা না। আমি ভালো রেজাল্ট করব। আমার সেই আত্মবিশ্বাস দেখে প্রবেশপত্র দিয়েই ভর্তি করালেন শেরেবাংলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। তাঁর পরামর্শে সেখান থেকে আমি বিএড পাস করলাম।