অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,
অবশেষে মারা গেলেন ওসমান হাদী। একজন মানুষ চলে যাওয়া মানে শুধু একটি জীবন থেমে যাওয়া নয়—কখনো কখনো তা একটি সময়, একটি সংগ্রাম ও একটি নীরব ইতিহাসের পরিসমাপ্তি। ওসমান হাদী তেমনই একজন মানুষ ছিলেন, যাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে কম, কিন্তু যাঁর উপস্থিতি ছিল বহু আন্দোলনের ভেতরে, বহু পরিবর্তনের পেছনে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে এমন বহু মানুষ আছেন, যাঁরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দেননি, মঞ্চের আলোয় থাকেননি; কিন্তু আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, সংগঠনের কাঠামো শক্ত করেছেন, আর সংকটকালে নীরবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওসমান হাদী ছিলেন সেই ধারার প্রতিনিধি।
জীবন শিক্ষা ও মানস গঠন
ওসমান হাদীর জীবন ছিল শিক্ষানির্ভর ও মূল্যবোধকেন্দ্রিক। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতি ও সমাজভাবনায় আগ্রহী ছিলেন। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার নয়, বরং মানুষের অধিকার, ন্যায্যতা ও সম্মানের প্রশ্ন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে আজীবন আন্দোলনমুখী করে রেখেছিল।
তিনি বিশ্বাস করতেন—রাজনীতি মানে কেবল স্লোগান নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি কখনো হঠাৎ উগ্রতার পথে যাননি, আবার অন্যায়ের সঙ্গে আপসও করেননি।
আন্দোলনের শুরু থেকে নীরব যোদ্ধা
বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের শুরুতে ওসমান হাদীর ভূমিকা ছিল সংগঠক হিসেবে। আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি, কর্মী সমন্বয়, মাঠপর্যায়ে যোগাযোগ—এসব কাজেই তাঁকে বেশি দেখা গেছে। ইতিহাস বলে, কোনো আন্দোলন সফল হয় তখনই, যখন তার ভিত শক্ত থাকে। ওসমান হাদী সেই ভিত নির্মাণের কাজে আজীবন যুক্ত ছিলেন।
তিনি জানতেন, সামনে থাকা মানেই সব নয়। কখনো কখনো আড়ালে থেকেই বড় দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে অনেক আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর নাম আলাদাভাবে লেখা না হলেও, আন্দোলনের কর্মপ্রবাহে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
রাজনৈতিক জীবন: ক্ষমতার বাইরে থেকেও প্রভাব
ওসমান হাদীর রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল—তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে থেকেও প্রভাব রাখতেন। দলীয় পদ-পদবির মোহ তাঁকে গ্রাস করেনি। বরং তিনি ছিলেন নীতিনিষ্ঠ পরামর্শদাতা ও অভিজ্ঞ অভিভাবকের মতো।
সংকটকালে তিনি উত্তেজনা নয়, সংযমের কথা বলতেন। বিভক্তির সময়ে ঐক্যের পথ খুঁজতেন। এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে সমসাময়িক অনেক রাজনীতিকের চেয়ে আলাদা করেছে।
জীবনের শেষ অধ্যায় ও শিক্ষা
মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ওসমান হাদী নিভৃতেই ছিলেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও তিনি রাজনীতি ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। সময়ের পরিবর্তন, আন্দোলনের গতিপথ, নতুন প্রজন্মের ভূমিকা—সবকিছু তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।
তার জীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সব সংগ্রাম দৃশ্যমান হয় না, সব ত্যাগের স্বীকৃতি মেলে না, কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত নীরব কর্মীদের কথাও মনে রাখে।
একটি নীরব প্রস্থান, কিন্তু দীর্ঘ প্রতিধ্বনি
ওসমান হাদীর মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আন্দোলনের ইতিহাস কেবল শীর্ষ নেতৃত্বের নয়; এটি হাজারো নিভৃত মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। যারা ক্যামেরার সামনে ছিলেন না, কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে নিজেদের সর্বস্ব দিয়েছেন।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া জীবনদর্শন—সংযম, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ—আগামী দিনের রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনের জন্য এক মূল্যবান পাঠ হয়ে থাকবে।
ওসমান হাদীর প্রস্থান একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, কিন্তু তাঁর জীবনের শিক্ষা এখনো চলছে।
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট