নাইম উদ্দীন
পোরশা (নওগাঁ) প্রতিনিধি
নওগাঁর পোরশা উপজেলায় কবর খনন করতে গিয়ে অলৌকিক চিহ্নযুক্ত প্রাচীন পাথর সদৃশ পাঁচটি বস্তু উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত ব্যক্তির পরিবার দাবি করছে, ধর্মীয় ও অলৌকিক বিবেচনায় বস্তুগুলো পুনরায় কবরে পুঁতে রাখা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, মূল্যবান প্রত্নসম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই এ ধরনের দাবি করা হচ্ছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় মাস আগে পোরশা উপজেলার ঘাটনগর ইউনিয়নের কালুকান্দর গ্রামের বাসিন্দা মোস্তফা মণ্ডল মারা যান। গ্রামের গোরস্থানে তাঁর কবর খননের দায়িত্বে ছিলেন বাহার আলী, শরিফুল ইসলাম ও শফিউদ্দিন নামে তিন ব্যক্তি। তারা জানান, কোমরসমান গভীরতায় মাটি খননের সময় কালো, সাদা, ধূসর ও বাদামি রঙের পাঁচটি পাথর সদৃশ বস্তু পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বস্তুগুলোর নিচের অংশে ‘আল্লাহু’ সদৃশ লেখা বা চিহ্ন দেখা গিয়েছিল।
ঘটনাটি জানাজানি হলে কৌতূহলী গ্রামবাসী বস্তুগুলো দেখেন এবং সেগুলো সাময়িকভাবে বাহার আলীর জিম্মায় রাখা হয়।
দাফন সম্পন্ন হওয়ার চার দিন পর নিহত মোস্তফা মণ্ডলের বড় ছেলে ইউনুস আলী পরিবারের সদস্যদের দেখানোর কথা বলে বাহার আলীর কাছ থেকে পাথরগুলো নিয়ে যান। পরদিন বাহার আলী সেগুলো ফেরত চাইলে ইউনুস আলী জানান, স্থানীয় কয়েকজন বুজুর্গ ও মুরব্বির পরামর্শে ফজরের নামাজের পর তিনি অলৌকিক ওই বস্তুগুলো আবার তাঁর বাবার কবরে রেখে এসেছেন।
তবে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, কাউকে না জানিয়ে ভোরবেলা একা কবরে গিয়ে বস্তুগুলো পুনরায় পুঁতে রাখার বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেকের ধারণা, মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আত্মসাৎ বা পাচারের উদ্দেশ্যেই অলৌকিকতার গল্প তৈরি করা হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে বিষয়টির সুরাহার জন্য তিন দফা সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হলেও ইউনুস আলী মাত্র একটিতে উপস্থিত হন। বাকি দুটি বৈঠকে তিনি বিভিন্ন অজুহাতে অনুপস্থিত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে উত্তেজিত গ্রামবাসী ইউনুস আলীর বাড়িতে গেলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর মা দাবি করেন, মুরব্বিদের পরামর্শেই বস্তুগুলো পুনরায় কবরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি তাঁর স্বামীর কবর পুনরায় খনন না করার জন্য গ্রামবাসীর প্রতি অনুরোধ জানান।
ইউনুস আলীর অনুপস্থিতি এবং পরিবারের সদস্যদের অসংলগ্ন বক্তব্যে স্থানীয়দের সন্দেহ ও ক্ষোভ আরও বেড়েছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ও জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান ফজলুর করিম আরজু বলেন, "পোরশা এলাকার ভূতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক পুরোনো। মাটির নিচে হাজার বছরের প্রাচীন নিদর্শন থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। উদ্ধার হওয়া বস্তুগুলো কোনো প্রাচীন সভ্যতার প্রত্ননিদর্শনও হতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা পাওয়া গেলে ওই এলাকায় খননকাজ চালিয়ে সরকারি উদ্যোগে প্রত্নসম্পদ উদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।"
বর্তমানে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে কালুকান্দর গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সম্ভাব্য প্রত্নসম্পদ হিসেবে বিবেচিত ওই বস্তুগুলোর প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের দ্রুত ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সচেতন মহল।
তবে উল্লেখ্য, উদ্ধার হওয়া বস্তুগুলোর বয়স, প্রকৃতি কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য সম্পর্কে এখনো কোনো সরকারি বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য জানা সম্ভব হবে।