
আমির হোসাইন, স্টাফ রিপোর্টার:
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ৭৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ‘শাহ আরেফিন-অদ্বৈত মৈত্রী সেতু’র পাঁচটি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। সোমবার (১৭ মে) ভোররাতে এ ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, সেতুর পূর্ব পাশের ৩ ও ৪ নম্বর পিলারের ওপর স্থাপিত পাঁচটি গার্ডার হঠাৎ ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। স্থানীয়রা বিকট শব্দ শুনে সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি দেখতে পান।
স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, সেতুর আশপাশে দিনের বেলায় শেভ মেশিন ও রাতের আঁধারে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রভাব ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং নিম্নমানের কাজের কারণে সেতুটির নির্মাণকাজ বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলেও দাবি তাদের।
এলাকাবাসী জানান, এর আগেও ২০২২ সালে একই পাশে আরও দুটি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়ে গিয়েছিল। তিন বছরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আট বছরেও সেতুর নির্মাণ শেষ না হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
যাদুকাটা নদীর বালু-পাথর সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ঘাগড়া গ্রামের বাসিন্দা হাকিকুল ইসলাম বলেন, “রাতের আঁধারে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণেই আজ আমাদের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। দুর্বলভাবে সেতুর কাজ করায় ভবিষ্যতেও এই সেতু নিয়ে মানুষের মনে ভয় থেকেই যাবে।”
বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, “এ অঞ্চলের মানুষের অনেক স্বপ্ন ছিল এই সেতুকে ঘিরে। গত এক বছরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনট্রাকশন গার্ডারগুলো রড ও ফাইভ দিয়ে বসিয়েছিল। পরে তারা কাজ ফেলে চলে যায়। সম্প্রতি কিছু শ্রমিক এসে ওই রড ও ফাইভ খুলে নিয়ে যাওয়ার পরই গার্ডারগুলো শূন্য অবস্থায় থেকে ভেঙে পড়ে যায়।”
বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রাখাব উদ্দিন বলেন, “শুরু থেকেই সেতুর কাজ খুবই নিম্নমানের হয়েছে। এ নিয়ে দ্বিতীয়বার গার্ডার ভেঙে পড়ল। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে যাদুকাটা ও পাটলাই নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ১২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতুটির কাজ পায় তমা কনট্রাকশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২১ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা সম্পন্ন হয়নি।
এলজিইডি আরও জানায়, সেতুর ১৫টি স্প্যানের মধ্যে ১২টির কাজ এবং ৭৫টি গার্ডারের মধ্যে ৬০টির কাজ শেষ হয়েছে। এখনো ৩টি স্প্যান ও ২০টি গার্ডারের কাজ বাকি রয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে পাহাড়ি ঢলের স্রোতে দুটি গার্ডার ভেঙে পড়েছিল।
তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, “খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সেতুর পূর্ব পাশের মাঝ নদীর পিলারে থাকা পাঁচটি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। তবে কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।”