মোঃ গোলাম কিবরিয়া, রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি :
নাম গণেশ চন্দ্র সেন। বাড়ি রাজশাহী জেলার পুঠিয়া উপজেলায়। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে রাজশাহী শহর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে বাঁশি বিক্রি করেই চলছে তার জীবন-জীবিকা।
কাঁধে ঝোলা ব্যাগ আর মুখে সুরেলা বাঁশির সুর—হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতোই পথ চলেন তিনি। কখনো পল্লীগীতি, কখনো ভাওয়াইয়া, লালনগীতি, বিচ্ছেদ কিংবা পুরনো বাংলা সিনেমার গানের সুর তুলে মুগ্ধ করেন পথচারীদের। শুধু বাঁশি বিক্রিই নয়, ক্রেতাদের বাঁশি বাজানোও শিখিয়ে দেন তিনি।
গণেশ চন্দ্র নিজেও গান লেখেন, সুর ও তাল দেন। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। ইচ্ছে ছিল কোনো একটি টেলিভিশন চ্যানেলে গান করার। আজীবন সুর-সংগীতের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ায় সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
তবুও বাঁশির প্রতি ভালোবাসা তাকে কখনো এই পেশা থেকে দূরে সরাতে পারেনি। জীবনের নানা উত্থান-পতনের মাঝেও বাঁশি বিক্রিকেই জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার কান্দ্রা গ্রামের বাসিন্দা গণেশ চন্দ্র দাস তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক। তার তিন ছেলেই বিবাহিত। তবে প্রায় ১৫ বছর আগে চিকিৎসার অভাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তার একমাত্র মেয়ে। সেই শোক আজও বয়ে বেড়ান তিনি।
পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি বেশি দূর। নিজের চেষ্টায় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও দারিদ্র্যের কারণে তা আর এগোয়নি। পরে জীবিকার তাগিদে নেমে পড়েন সংগ্রামের জীবনে।
তার জীবনে নেই কোনো বিলাসিতা। দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের সংগ্রামই তার নিত্যসঙ্গী। কখনো কখনো অর্ধাহারেও কাটাতে হয় দিন। তবুও মুখে হাসি রেখে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাঁশিভর্তি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুটে চলেন রাজশাহী শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।
জীবনযুদ্ধে লড়াকু এই মানুষটির চোখে-মুখে আজও সুরের প্রতি অদম্য ভালোবাসা। অভিমান আছে, কষ্ট আছে, কিন্তু বাঁশির সুরে সেসব যেন হারিয়ে যায়। সুরই যেন তার জীবন, সুরই তার বেঁচে থাকার শক্তি।