
হাকিকুল ইসলাম খোকন, বাপসনিউজ:
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক পাঁচ বারের সফল প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
আল জাজিরাকে দেয়া শেখ হাসিনার একমাএ তনয় ওয়াসিংটন ডিসির কাছের রাজ্য ভার্জিনীয়ায় বসবাস রত সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎকারে “শেখ হাসিনা যুগের সমাপ্তি ” প্রসঙ্গটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি বিভ্রান্তিও কম নয়। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা কেবল একটি সময় বা পর্বের নাম নন, তিনি একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে।
সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎকারকে তাই ভবিষ্যৎ রাজনীতির একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা বাস্তবতা হিসেবে নয়। রাজনীতিতে বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব সংগঠন, কর্মীদের মনস্তত্ত্ব এবং ক্ষমতার কাঠামো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেসব বিচারে শেখ হাসিনা এখনো আওয়ামী লীগের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, শেখ হাসিনার রাজনীতি কেবল দলীয় নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। উন্নয়ন, অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ছিলেন। এই অভিজ্ঞতার বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করা আওয়ামী লীগের জন্য সহজ কাজ নয়। উত্তরাধিকার প্রশ্নে দলটি এখনো স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কোনো কাঠামো দাঁড় করাতে পারেনি। ফলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা যতই হোক, বর্তমান রাজনীতিতে শেখ হাসিনার বিকল্প দৃশ্যমান নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ শুধু একটি দল নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, যার শিকড় ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দীর্ঘ পথচলায় দলটির নেতৃত্ব বারবার বদলেছে, কিন্তু ১৯৮১ সালের পর থেকে শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছেন সেই কেন্দ্রবিন্দু, যাকে ঘিরেই দলটি পুনর্গঠিত হয়েছে, ক্ষমতায় ফিরেছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্ব, সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে।

আল জাজিরাকে একান্ত সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন সজীব ওয়াজেদ জয়
এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে আওয়ামী লীগের ভেতরে শক্তিশালী সিনিয়র নেতা আছেন, তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব বলয় আছে, রয়েছে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সংগঠকরা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব বলয় শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বকেই কেন্দ্র করে কাজ করে। দলীয় সংকটে, বিভাজনের আশঙ্কায় বা কঠিন রাজনৈতিক মুহূর্তে শেখ হাসিনাই শেষ আশ্রয়। কর্মী-সমর্থকদের আবেগ ও বিশ্বাসের জায়গাটিও সেখানেই গিয়ে থামে। ১৯৯১ সালে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর শেখ হাসিনা দলীয় প্রধান থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্ত নেতাকর্মীদের না মানার কারণে, এক প্রকার তাদের চাপের কারণে সিদ্ধান্ত বদল করতে বাধ্য হয়েছিলেন শেখ হাসিনা এবং তখন থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার বাকী ইতিহাস আমাদের জানা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সেই সময় থেকে শেখ হাসিনা কার্যত এককভাবেই আওয়ামী লীগকে সংগঠন হিসেবে টিকিয়ে রেখেছেন। কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূলের একেবারে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত দলকে যেভাবে তিনি নিয়ন্ত্রণ ও সংযুক্ত করে রেখেছেন, তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। সাংগঠনিকভাবে দুর্বল, চাপগ্রস্ত এবং নানা দিক থেকে কোণঠাসা অবস্থায় থাকা একটি দলকে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবেই সক্রিয় রাখা সম্ভব হয়েছে।
এখানেই শেখ হাসিনার রাজনীতির দ্বৈত অবস্থান স্পষ্ট হয়। আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী এবং বিপুল জনসমর্থন থাকা একটি দলের জন্য শেখ হাসিনা একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। শক্তি এই অর্থে যে, তাঁর নেতৃত্ব ছাড়া দলটি এখনো কার্যকরভাবে দাঁড়াতে পারছে না। আবার দুর্বলতা এই অর্থে যে, দলটি এখনো তাঁর বাইরে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তুলতে ব্যর্থ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতের ‘মাইনাস ফর্মুলা’ প্রয়োগের ইতিহাস নতুন নয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায়, শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের কোনো উদ্যোগ কখনোই অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় সম্ভব হয়নি। বরং এমন চেষ্টা হলে সেখানে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ অবধারিত হয়ে ওঠে। “হাসিনা যুগের সমাপ্তি” যদি বাস্তবায়নের কোনো প্রচেষ্টা হয়, তবে সেটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিবর্তনের মাধ্যমে নয়,…
Reporter Name 























