
ইসলামের ইতিহাসে যুবক ও তরুণ সাহাবিদের অবদান অনন্য। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শুধু তাদের উৎসাহিতই করেননি, বরং যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে এসব তরুণই পরবর্তীকালে ইসলামের ইতিহাসে প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি তরুণরা—এই বাস্তবতাকে মহানবী (সা.) বহু আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি তরুণদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, তাদের চিন্তা-ভাবনাকে মূল্য দিতেন এবং সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কাজে সম্পৃক্ত করতেন।
আজকের সমাজে যেখানে অনেক তরুণ নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পান না, সেখানে মহানবী (সা.) তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।
তরুণ সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বদর যুদ্ধে অংশ নিতে চাইলেও বয়স কম হওয়ায় মহানবী (সা.) তাকে অনুমতি দেননি। তবে তিনি তার মেধা ও জ্ঞানপিপাসাকে মূল্যায়ন করেন।
রাসুল (সা.) তাকে হিব্রু ও সিরিয়ানি ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই জায়েদ (রা.) মহানবীর অন্যতম লেখক ও দোভাষীতে পরিণত হন।
পরবর্তীতে ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজ শহীদ হওয়ার পর পবিত্র কোরআন সংকলনের মতো ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তার কাঁধেই অর্পণ করা হয়। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, মহানবী (সা.) তরুণদের যোগ্যতা বুঝে তাদের জন্য সঠিক ক্ষেত্র তৈরি করে দিতেন।
মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.) ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও বিচক্ষণ এক তরুণ সাহাবি। বয়স কম হলেও মহানবী (সা.) তাকে ইসলামের প্রথম দূত হিসেবে মদিনায় পাঠান, যাতে তিনি সেখানকার মানুষকে ইসলামের শিক্ষা দিতে পারেন।
মদিনায় তার সফল দাওয়াতি কার্যক্রমের ফলে অল্প সময়েই আনসারদের অধিকাংশ পরিবার ইসলামের আলোয় আলোকিত হয়। তরুণদের নেতৃত্বে আস্থার এটি ছিল এক অনন্য উদাহরণ।
এক যুবক একবার মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে ব্যভিচারের অনুমতি চেয়েছিলেন। তিনি তাকে অপমান বা তিরস্কার না করে অত্যন্ত কোমলভাবে বোঝান।
তিনি প্রশ্ন করেন—নিজের মা, বোন কিংবা পরিবারের অন্য কোনো নারীর জন্য এমনটি কি সে পছন্দ করবে? যুবকটি না বললে মহানবী (সা.) একই যুক্তিতে তাকে অন্যের সম্মান রক্ষার গুরুত্ব বোঝান এবং তার জন্য দোয়া করেন।
এই ঘটনার পর ওই যুবক আর কখনো সেই পাপের দিকে ফিরে যাননি।
এ ঘটনা প্রমাণ করে, তরুণদের সংশোধনের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) কঠোরতার পরিবর্তে সহানুভূতি, যুক্তি ও ভালোবাসার পথ অনুসরণ করতেন।
মহানবীর (সা.) চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন জ্ঞানপিপাসু এক কিশোর। তার আগ্রহ দেখে মহানবী (সা.) দোয়া করেছিলেন—
"হে আল্লাহ! তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং কোরআনের তাফসির শিক্ষা দিন।" (মুসনাদ আহমাদ)
এই দোয়ার বরকতেই তিনি পরবর্তীকালে ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির ও হাদিস বিশারদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
আরেকটি ঘটনায় সফরের সময় মহানবী (সা.) তাকে বলেন—
"আল্লাহর হুকুমের হেফাজত করো, আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাইবে; সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছেই চাইবে।" (সুনান আত-তিরমিজি)
এই উপদেশ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সারাজীবনের পথচলার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিশ্বাস করতেন, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে তরুণদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি তাদের মতামতকে মূল্য দিতেন, মেধা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করতেন, দায়িত্ব অর্পণ করতেন এবং ভালোবাসা ও দোয়ার মাধ্যমে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতেন।
বর্তমান সময়েও তরুণদের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। কারণ আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব, উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান শক্তি।