
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসসমূহের মধ্যে “রিসালাত” একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আকীদা। রিসালাত অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য বার্তা পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য অসংখ্য নবী ও রসূল পাঠিয়েছেন এবং তাদের মাধ্যমে মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখিয়েছেন। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে রিসালাতের উদ্দেশ্য, গুরুত্ব এবং বাস্তবতা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
রসূলদের মানবিক পরিচয় ও দায়িত্ব
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, “মুহাম্মাদ একজন রসূল বৈ তো আর কিছুই নয়। তার আগে আরো অনেক রসূলও চলে গেছে…” (সুরা আলে ইমরানঃ ১৪৪)। এই আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, রসূলগণ মানুষই, তবে তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত। তাদের কাজ ছিল আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষের জন্য আদর্শ স্থাপন করা।
আবার সুরা আল-কাহফ (১১০)-এ বলা হয়েছে, “আমি তো একজন মানুষ তোমাদেরই মতো, আমার প্রতি অহী করা হয়…”। এর মাধ্যমে রসূলের মানবিক সত্তা ও আল্লাহর একত্ববাদ প্রচারের মূল দায়িত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

পরীক্ষা, ধৈর্য ও ঈমানের বাস্তবতা
সুরা আলে ইমরান (১৪১-১৪৫) আয়াতে আল্লাহ বলেন, মানুষের ঈমান পরীক্ষা করার জন্য বিপদ-আপদ আসে, যাতে সত্যিকারের মুমিন ও কাফের পৃথক হয়ে যায়। এখানে শিক্ষা হলো— জান্নাত লাভের জন্য সংগ্রাম, ধৈর্য ও আত্মত্যাগ অপরিহার্য।
আল্লাহর ইচ্ছার ওপর সবকিছু নির্ভরশীল: সুরা ইউনুস (৪৯)-এ ঘোষণা করা হয়েছে, “নিজের লাভ-ক্ষতিও আমার ইখতিয়ার নেই। সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।” এটি মানুষের সীমাবদ্ধতা ও আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতার শিক্ষা দেয়।
তাওহীদের সাক্ষ্য ও কুরআনের উদ্দেশ্য: সুরা আল-আন’আম (১৯)-এ বলা হয়েছে, কুরআন মানুষের কাছে সতর্কবার্তা হিসেবে নাযিল হয়েছে এবং আল্লাহই সবচেয়ে বড় সাক্ষী। এ আয়াত শিরক থেকে মুক্ত থাকার আহ্বান জানায়।
মানবজাতির জন্য সর্বজনীন রসূল:
সুরা আন-নিসা (৭৯)-এ বলা হয়েছে, নবী মুহাম্মাদ ﷺ-কে সমগ্র মানবজাতির জন্য রসূল হিসেবে পাঠানো হয়েছে। আবার সুরা আল-আরাফ (১৫৮)-এ ঘোষণা করা হয়েছে, তিনি সকল মানুষের জন্য আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। এটি ইসলামের সার্বজনীনতার প্রমাণ।
দ্বীনের বিজয় ও সত্যের প্রতিষ্ঠা
সুরা আল-ফাতহ (২৮)-এ আল্লাহ বলেন, তিনি তাঁর রসূলকে সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন যাতে তা সব দ্বীনের ওপর বিজয়ী হয়। অর্থাৎ ইসলাম সত্য ও ন্যায়ের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা।
সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী: সুরা সাবা (২৮)-এ বলা হয়েছে, নবীকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠানো হয়েছে।
রসূলের দয়া ও মানবিকতা: সুরা আত-তাওবা (১২৮)-এ নবী ﷺ-এর চরিত্র তুলে ধরা হয়েছে— তিনি উম্মতের কল্যাণকামী, স্নেহশীল ও দয়ালু।
রসূলদের ধারাবাহিকতা: সুরা আন-নাহল (৬৩)-এ বলা হয়েছে, নবীর আগেও বহু জাতির মধ্যে রসূল পাঠানো হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, রিসালাত মানব ইতিহাসের ধারাবাহিক সত্য।
রিসালাতের মূল শিক্ষা: উপরোক্ত আয়াতসমূহ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা পাওয়া যায়—
১) আল্লাহ এক এবং তাঁর ইবাদতই একমাত্র পথ।
২) নবীগণ মানুষ হলেও তারা আল্লাহর নির্বাচিত প্রতিনিধি।
৩) মানুষের জীবন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পরিচালিত।
৪) দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, আখেরাত চিরস্থায়ী।
৫) ঈমান, সৎকাজ ও ধৈর্যই সফলতার মূল চাবিকাঠি।
রিসালাতের বিশ্বাস মানুষের জীবনকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয় এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও আনুগত্য শেখায়। কুরআনের আয়াতগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর অনুসরণই মুক্তি ও সফলতার পথ। তাই আমাদের উচিত তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করে ন্যায়, সত্য ও মানবতার পথে চলা।
রিসালাতের আলো মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে—এটাই ইসলামের চিরন্তন বার্তা।
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া ,লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট
Reporter Name 


























