
হাকিকুল ইসলাম খোকন, মো. নাসির,
বাপসনিউজ, পিটসবার্গ, পেনসিলভেনিয়া:
একজন শ্রমিক নেতার কর্মজীবন কখনো কখনো শুধু একটি পেশাগত জীবনের গল্প হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে শ্রমিক অধিকার, শিক্ষা, নেতৃত্ব ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার দীর্ঘ পথচলার প্রতিচ্ছবি। ব্রায়ান লাইসেলের কর্মজীবন তেমনই এক অনন্য উদাহরণ। নিউইয়র্কের হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নে কর্মজীবন শুরু করে তিনি পরবর্তীতে আইন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং বিনোদন শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক সংগঠন SAG-AFTRA-এর নেতৃত্বে যুক্ত হন।
নিউইয়র্ক সিটির হোটেল ট্রেডস কাউন্সিল (HTC) লোকাল ৬-এর মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করার পর ২০১৪ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ব্রায়ান লাইসেল SAG-AFTRA ওহাইও-পিটসবার্গ-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্রায়ানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় তাঁর HTC লোকাল ৬-এর বিজনেস এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়। সে সময় আমি ম্যানহাটনের ফিফথ অ্যাভিনিউ ও ৫৫তম স্ট্রিটের বিখ্যাত ‘দ্য পেনিনসুলা নিউইয়র্ক’ হোটেলে ‘রুম সার্ভিস ডেলিগেট’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম।
শ্রমিক আন্দোলনের সেই সময়গুলো আমার কর্মজীবনের অত্যন্ত স্মরণীয় অধ্যায়। ব্রায়ান ছিলেন বিনয়ী, পেশাদার এবং জ্ঞানী একজন মানুষ। তবে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল, তা হলো ইউনিয়ন চুক্তি সম্পর্কে তাঁর অসাধারণ জ্ঞান।
চুক্তির কোনো ধারা বা শর্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিতেন। অনেক সময় শুধু উত্তরই নয়, চুক্তির ঠিক কোন পৃষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে, সেটিও নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারতেন।
একজন ইউনিয়ন ডেলিগেট হিসেবে তাঁর কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। শ্রমিকদের অধিকার, চুক্তির ভাষা, কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব এবং ইউনিয়ন ডেলিগেটের দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে তিনি আমাকে সহযোগিতা করেছেন।
আমার কাছে ব্রায়ান শুধু একজন বিজনেস এজেন্ট ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি ইউনিয়ন চুক্তিকে এত গভীরভাবে বুঝতেন যে মনে হতো, চুক্তিটি যেন তাঁর নিজেরই লেখা।
বহু বছর পর HTC লোকাল ৬-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিজনেস ম্যানেজার পিটার ওয়ার্ডের সঙ্গে ব্রায়ান সম্পর্কে কথা বলার সুযোগ হয়। লোকাল ৬-এ কর্মজীবনের সময় পিটার তাঁর সঙ্গে কাজ করেছিলেন।
আমি বিশেষ করে ইউনিয়ন চুক্তি সম্পর্কে ব্রায়ানের অসাধারণ জ্ঞানের কথা উল্লেখ করে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম। পিটারের একটি মন্তব্য আজও আমার মনে গেঁথে আছে। তিনি ব্রায়ানকে এমন একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যার মস্তিষ্ক যেন ‘ইউনিয়ন চুক্তির বই’।
পিটারের এই মন্তব্য শুনে ‘দ্য পেনিনসুলা নিউইয়র্ক’-এর সেই দিনগুলোর স্মৃতি আবারও মনে পড়ে যায়। একজন ডেলিগেট হিসেবে আমিও ব্রায়ানকে ঠিক এমন একজন মানুষ হিসেবেই দেখেছিলাম—যাঁর কাছে চুক্তির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেন হাতের তালুর মতো পরিচিত ছিল।
ইউনিয়ন পরিবেশে এ ধরনের জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন বিজনেস এজেন্টকে শুধু যৌথ দরকষাকষি চুক্তির সাধারণ নীতিই জানতে হয় না; শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় চুক্তির সুনির্দিষ্ট ভাষা ও শর্ত সম্পর্কেও গভীর ধারণা থাকতে হয়। ব্রায়ানের মধ্যে সেই দক্ষতা ছিল।
ব্রায়ানের কর্মজীবনে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ। সর্বজনীনভাবে পাওয়া পেশাগত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলিনা জোসেফ এফ. রাইস স্কুল অব ল থেকে ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে জুরিস ডক্টর (জে.ডি.) ডিগ্রি অর্জন করেন।
এর আগে তিনি দ্য পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত জার্মান ভাষা ও তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়ে ব্যাচেলর অব আর্টস (বি.এ.) ডিগ্রি অর্জন করেন।
এ ছাড়া জার্মানির ফিলিপস-ইউনিভার্সিটি মারবুর্গে ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত জার্মান ভাষা ও তুলনামূলক সাহিত্যের ওপর পড়াশোনা করেন।
শ্রমিক সংগঠনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং আইন বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমন্বয় তাঁর পেশাগত দক্ষতার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে। আইন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণের আগেই যৌথ দরকষাকষি, কর্মক্ষেত্রের অধিকার এবং শ্রমিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তীতে ব্রায়ান লাইসেল বিনোদন শিল্পের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং SAG-AFTRA-এর নেতৃত্বের অংশ হয়ে ওঠেন। অভিনেতা, সম্প্রচারকর্মী ও অন্যান্য মিডিয়া পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্বকারী এই শ্রমিক সংগঠনে তিনি আঞ্চলিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০১৪ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে তিনি SAG-AFTRA ওহাইও-পিটসবার্গ-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁর কর্মজীবন দেখায়, শ্রমিক আন্দোলনের একটি ক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতা কীভাবে অন্য একটি শিল্পের শ্রমিক নেতৃত্বে কাজে লাগতে পারে। ম্যানহাটনের ব্যস্ত হোটেল থেকে পিটসবার্গের আঞ্চলিক নেতৃত্ব—পেশাগত ক্ষেত্র পরিবর্তিত হলেও শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্বের মূল চেতনা তাঁর কর্মজীবনে অব্যাহত রয়েছে।
আমার কাছে ব্রায়ান লাইসেলের কর্মজীবন শুধু একটি পেশাগত জীবনবৃত্তান্ত নয়; এটি একই সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ।
আজও মনে পড়ে ‘দ্য পেনিনসুলা নিউইয়র্ক’-এ ‘রুম সার্ভিস ডেলিগেট’ হিসেবে ইউনিয়ন চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন করার সেই দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে, কীভাবে ব্রায়ান অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস ও নির্ভুলতার সঙ্গে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতেন এবং বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিতেন।