
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ১৬ আগস্ট ২০২৬: শরিয়াহভিত্তিক নৈতিক ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা, হালাল শিল্পের বিকাশ এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ ইসলামিক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BICCI)-এর প্রথম সদস্য সম্মেলন।
রোববার রাজধানীর পল্টন মোড়ের ভূঁইয়া টাওয়ারের ডি.সি.সি. হলে আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীরা অংশ নেন। নতুন সদস্যদের পরিচিতি, চেম্বারের লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা, আসন্ন কর্মসূচি এবং অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরুর মধ্য দিয়ে সম্মেলনটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ব্যবসা কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক কল্যাণ ও মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। তাই ইসলামী শরিয়াহর নীতি, সততা, আমানতদারি, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বোধকে ব্যবসার মূলভিত্তি করে একটি নতুন ব্যবসায়িক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সময় এসেছে।
বক্তারা বলেন, ইসলামী শরিয়াহর মূলনীতির আলোকে দেশের ব্যবসায়ী সমাজকে সুসংগঠিত করা এবং একটি নৈতিক, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা BICCI-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে দেশীয় ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তাঁরা মনে করেন, ব্যবসায় সততা ও নৈতিকতার চর্চা বাড়লে শুধু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো অর্থনীতিই উপকৃত হবে। পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে ব্যবসায়ী সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সম্মেলনে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের বিকাশ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা একটি সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিং আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
তাঁদের মতে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য উপযোগী ও শক্তিশালী নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলা গেলে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও শরিয়াহসম্মত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়বে।
সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতি। বক্তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এই বিশাল বাজারকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ শুধু ভোক্তা বাজার হিসেবে নয়, বরং হালাল পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
খাদ্য, প্রসাধনী, ঔষধ, পোশাক, পর্যটন, লজিস্টিকসসহ বিভিন্ন খাতে সমন্বিত হালাল শিল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হালাল সনদায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো শক্তিশালী করার তাগিদ দেন বক্তারা।
তাঁদের প্রত্যাশা, যথাযথ পরিকল্পনা, নীতিগত সহায়তা ও ব্যবসায়ী সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ থাকলে হালাল অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে।
সম্মেলনে BICCI-এর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যবসায়িক নীতি প্রতিষ্ঠা, নৈতিক ব্যবসার পরিবেশ তৈরি, হালাল শিল্পের বিকাশ, হালাল সনদায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়িক সহযোগিতা বৃদ্ধি।
এ ছাড়া দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, মুসলিম দেশগুলোর ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি এবং সরকারের কাছে হালাল অর্থনীতি ও শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে গঠনমূলক প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সম্মেলনে নতুন সদস্যদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে BICCI-এর অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। একটি দক্ষ, সৎ, প্রতিনিধিত্বশীল ও পেশাদার সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে চেম্বারের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে সভাপতি এডভোকেট শফিকুর রহমান BICCI-এর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও নৈতিক, স্বচ্ছ ও সহযোগিতামূলক করতে সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তিনি চেম্বারের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
সম্মেলনের মূল বক্তব্য ও কীনোটে BICCI-কে কেবল একটি ব্যবসায়ী সংগঠন হিসেবে নয়, বরং ‘ব্যবসায়িক বিপ্লবের সূচনা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, শরিয়াহভিত্তিক নীতি, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসা ও অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। একটি স্বাবলম্বী, সুসংগঠিত, নৈতিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার বৃহত্তর লক্ষ্যেই BICCI কাজ করতে চায়।
এ সময় আগামী ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠেয় ‘হালাল সার্টিফিকেশন কী এবং কেন প্রয়োজন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করা হয়।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন BICCI-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এ. ফাত্তাহ আসিফ। স্বাগত বক্তব্য দেন সুলতান মাহমুদুর রহমান ও সুলতান মাহমুদ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সাইয়েদ মাহফুজ খন্দকার, সম্পাদক, ইনসাফ। মূল বক্তব্য ও কীনোট উপস্থাপন করেন BICCI-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব এম. মুফাজ্জল ইবনে মাহফুজ।
অ্যাডহক কমিটি গঠনসংক্রান্ত অধিবেশনে বক্তব্য দেন মাহমুদুল ইসলাম তুষার। অনুষ্ঠানে ইসলামিক স্মার্ট সিটির চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিকও বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে BICCI-এর আরেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আব্দুর রহমান দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন।
দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় BICCI-এর প্রথম সদস্য সম্মেলন। তবে আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কেবল একটি নতুন সাংগঠনিক অধ্যায়ের সূচনা নয়, বরং বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনে নৈতিকতা, আস্থা, শরিয়াহভিত্তিক মূল্যবোধ এবং বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগের একটি নতুন পথচলারও সূচনা হলো।