
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ইমদাদুল হক তৈয়ব:
বর্তমান সময়ে দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বিত ধারা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিত্বদের মধ্যে হাফেজ মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ মুসা খান অন্যতম। শিক্ষা বিস্তার, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, লেখালেখি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং সমাজসেবামূলক উদ্যোগ নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর ভাবনা, কর্মপরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে কথা বলেছেন মানবজীবনের সঙ্গে।

মানবজীবন: আপনার শিক্ষা ও দাওয়াহভিত্তিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাই।
মাওলানা মুসা খান: আলহামদুলিল্লাহ, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও দ্বীনি খেদমতের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছি। আমার প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা আবু হুরায়রা বর্তমানে আটটি শাখার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। আমরা কওমী ও জাতীয় কারিকুলামের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই, যাতে তারা দ্বীনি জ্ঞানের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষায়ও সফল হতে পারে।
মানবজীবন: আপনার শিক্ষা ব্যবস্থার বিশেষত্ব কী?
মাওলানা মুসা খান: আমাদের মূল লক্ষ্য হলো দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে, তা কমিয়ে আনা। একজন শিক্ষার্থী যেন কুরআন-হাদিসের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে, সেই সুযোগ আমরা তৈরি করছি।
মানবজীবন: পরিচালক কর্মশালার ধারণা কীভাবে এসেছে?
মাওলানা মুসা খান: অনেকেই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, কিন্তু দক্ষ পরিচালনার অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হয় না। তাই আমরা পরিচালক কর্মশালার আয়োজন করে থাকি। ইতোমধ্যে ২,৫০০-এর বেশি পরিচালক এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তাঁরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সফলভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন এবং জাতি গঠনে অবদান রাখছেন।
মানবজীবন: লেখক হিসেবেও আপনার পরিচিতি রয়েছে। এ বিষয়ে কিছু বলুন।
মাওলানা মুসা খান: শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বেশ কয়েকটি বই লিখেছি। মাদরাসা পরিচালনা বিষয়ক তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ‘মাদরাসার ছাত্রদের প্যারেন্টিং’, ‘শিক্ষক ও ক্যারিয়ার’ এবং ‘ফিরে আসার পথ’ নামে বই প্রকাশিত হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, বইগুলো পাঠকমহলে বেশ সাড়া পেয়েছে।
মানবজীবন: শিশুদের জন্য আলাদা কারিকুলাম প্রণয়নের উদ্যোগ সম্পর্কে বলুন।
মাওলানা মুসা খান: শিশুদের নৈতিক ও আদর্শিক বিকাশ নিশ্চিত করতে আমরা প্লে-গ্রুপ থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত নিজস্ব কারিকুলামে ৫৫টি বই প্রকাশ করেছি। আমাদের লক্ষ্য, নতুন প্রজন্মকে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা প্রদান করা এবং তাদের সুস্থ সংস্কৃতির ধারক হিসেবে গড়ে তোলা।
মানবজীবন: সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে আপনার সম্পৃক্ততা কতটুকু?
মাওলানা মুসা খান: সমাজসেবা আমাদের কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের তত্ত্বাবধানে একটি এতিমখানা পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে এতিম শিশুদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা, আবাসন ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়। এছাড়া প্রতিবছর বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সম্প্রতি কুরবানির ঈদ উপলক্ষে ৫০০ পরিবারের মাঝে কুরবানির হাদিয়া বিতরণ করা হয়েছে।

মানবজীবন: বর্তমানে আর কী কী দায়িত্ব পালন করছেন?
মাওলানা মুসা খান: প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের পাশাপাশি একটি মাদরাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। একই সঙ্গে ঢাকার মধুবাগ কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব হিসেবেও দ্বীনি খেদমতের সুযোগ পাচ্ছি।
মানবজীবন: আপনার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন কী?
মাওলানা মুসা খান: আমি চাই এমন একটি শিক্ষা মডেল প্রতিষ্ঠিত হোক, যেখানে দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার সুন্দর সমন্বয় থাকবে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক এবং সেখান থেকে নৈতিক, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরি হোক। এ লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
মানবজীবন: দেশবাসীর উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?
মাওলানা মুসা খান: শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবসেবার বিকল্প নেই। আমরা যদি আগামী প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষা ও আদর্শ দিতে পারি, তাহলে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। এজন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিক্ষা, লেখালেখি, প্রশিক্ষণ ও সমাজসেবার বহুমাত্রিক কার্যক্রমের মাধ্যমে হাফেজ মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ মুসা খান একটি ব্যতিক্রমধর্মী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর স্বপ্ন ও কর্মপ্রচেষ্টা দেশের শিক্ষা অঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করছে।