ইমদাদুল হক তৈয়ব:
ঢাকা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আঙুল বোলাতেই তথ্যের বন্যা। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার বা ইউটিউব—সবখানেই খবরের পর খবর। বিশ্বজুড়ে কী ঘটছে, মুহূর্তেই তা আমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই অপরিসীম তথ্য-প্রবাহের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বিপদ—মিথ্যা তথ্য, গুজব এবং সুপরিকল্পিত প্রপাগান্ডা। তথ্যের এই মহাসমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে আমরা প্রায়শই তলিয়ে যাচ্ছি বিভ্রান্তির অতলে, যা আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পর্যন্ত হুমকির মুখে ফেলছে। তথ্য-উপাত্তের ভয়াবহ চিত্র সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের প্রভাব উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় গুজবের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারী: একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটির বেশি এবং এর একটি বিশাল অংশ ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছানো যতটা সহজ, ভুল তথ্য ছড়ানোও ততটাই দ্রুত।
গুজবের প্রকোপ:
এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্কের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই বাংলাদেশে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশ ভুল তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল।
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সহিংসতা:
অতীতে ধর্মীয় অবমাননার মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে রামু, নাসিরনগর এবং শাল্লার মতো জায়গায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। পত্রিকাগুলোর পুরনো প্রতিবেদন ঘাঁটলে দেখা যায়, কিভাবে একটি সামান্য ফেসবুক পোস্ট মুহূর্তেই একটি জনপদকে অশান্ত করে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে সোশ্যাল মিডিয়ায় "পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে" এমন অদ্ভুত গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ঢাকার বাড্ডায় মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করতে গিয়ে তাসলিমা বেগম রেনু নামের এক মায়ের মৃত্যু সারা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। [সূত্র: প্রথম আলো, যুগান্তর] তরুণ প্রজন্মের ওপর প্রভাব: ইউনিসেফের (UNICEF) এক সাম্প্রতিক তরুণ জরিপ (U-Report) অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি তিনজনের মধ্যে দুইজন তরুণ সোশ্যাল মিডিয়ায় "অতিরিক্ত ভুয়া খবর ও মিথ্যা তথ্য"কে তাদের মানসিক চাপের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫২ শতাংশ মনে করে যে, এই ধরনের ক্ষতিকারক আচরণ বন্ধ করতে আইন ও বিধিমালা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনার বিবরণ:
কিভাবে ছড়ায় গুজব? গুজব ছড়ানো হয় একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কোনো সংবেদনশীল ঘটনা—যেমন কোনো রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু, ধর্মীয় অবমাননা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—ঘটলেই একদল মানুষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা পুরনো ভিডিও, এডিটেড ছবি বা সম্পূর্ণ কাল্পনিক তথ্য দিয়ে একটি "খবর" তৈরি করে। এরপর "ব্রেকিং নিউজ" বা "সবাই জানুন" লিখে তা দ্রুত শেয়ার করতে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমও অনেক সময় এই ভুল তথ্যগুলোকে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে। কারণ, ব্যবহারকারীরা যে ধরনের কন্টেন্টে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়, অ্যালগরিদম সেই ধরনের কন্টেন্টই বেশি প্রদর্শন করে। গুজব বা চঞ্চল্যকর তথ্যে মানুষ দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়, ফলে তা দ্রুত ভাইরাল হয়।
আমাদের দায়িত্ব:
মিথ্যা ও প্রপাগান্ডা এড়িয়ে চলা তথ্যের এই মহাসমুদ্রে আমরা কেউ যেন ডুবে না যাই, তার জন্য আমাদের প্রত্যেকের কিছু দায়িত্ব রয়েছে:
যাচাই ছাড়া শেয়ার নয়:
কোনো চঞ্চল্যকর তথ্য দেখলেই তা শেয়ার করার আগে অবশ্যই যাচাই করুন। মূলধারার বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমে সেই খবরটি প্রকাশিত হয়েছে কিনা তা দেখুন।
উৎস যাচাই:
তথ্যের উৎস কী? কোনো অপরিচিত ওয়েবসাইট বা অনিভুত ফেসবুক পেজ থেকে তথ্যটি আসলে তা বিশ্বাস করার আগে সতর্ক হন।
শিরোনাম নয়, পুরোটা পড়ুন:
অনেক সময় আকর্ষণীয় শিরোনামের আড়ালে ভুল তথ্য থাকে। তাই পুরো খবরটি পড়ে তবেই সিদ্ধান্তে আসুন। আবেগের বশবর্তী হবেন না: গুজব সাধারণত মানুষের আবেগ (ভয়, রাগ, আনন্দ) কে পুঁজি করে ছড়ানো হয়। কোনো তথ্য পড়ে যদি আপনি খুব বেশি উত্তেজিত হন, তাহলে থামুন, একটু ভাবুন এবং যাচাই করুন।
ফ্যাক্ট-চেকিং টুলের ব্যবহার:
ইন্টারনেটে বর্তমানে অনেক ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট ও টুলস উপলব্ধ রয়েছে। কোনো তথ্য নিয়ে সন্দেহ হলে তা ব্যবহার করে দেখতে পারেন। বাংলাদেশে Jachai.org, BDfactcheck.com, বা Rumor Scanner-এর মতো কিছু প্রতিষ্ঠান সচল রয়েছে।
আইনি সচেতনতা:
মনে রাখবেন, মিথ্যা তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে সমাজে অস্থিরতা তৈরি করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা পরবর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে এই ধরনের অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। আপনার একটি ভুল শেয়ার আপনাকেও আইনি ঝামেলায় ফেলতে পারে।
সব শেষে বলতে চাই, সোশ্যাল মিডিয়া তথ্যের এক বিশাল ভাণ্ডার, কিন্তু তা বিষাক্ত গুজবেরও আধার হতে পারে। তথ্যের এই সুনামি থেকে নিজেকে এবং সমাজকে রক্ষা করতে হলে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভুল তথ্য শেয়ার না করাও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আসুন, আমরা সত্যনিষ্ঠ তথ্য শেয়ার করি, গুজবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই এবং একটি সুস্থ, সহনশীল ভার্চুয়াল সমাজ গড়ে তুলি। আপনার একটি সচেতন পদক্ষেপই পারে একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে দেশকে রক্ষা করতে।