এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম:
★ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার দূরত্ব কমবে ৪০ কিলোমিটার, সময় বাঁচবে এক ঘণ্টা। টানেলের ব্যবহার বাড়বে, দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে অনুমোদন পেল দক্ষিণ চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত পিএবি-টইটং মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। প্রায় ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আনোয়ারা-বাঁশখালী-টইটং-পেকুয়া-বদরখালী-চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’ প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়েছে।
৯ জুন(মঙ্গলবার) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়। ২০৩০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্ণফুলী টানেলকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলতে এ মহাসড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার ও মহেশখালীর মাতারবাড়ী পর্যন্ত যাতায়াতের দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
৪০ কিলোমিটার দূরত্ব কমবেঃ
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কর্ণফুলী টানেল হয়ে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরে যেতে আনোয়ারা-শিকলবাহা ওয়াই জংশন-পটিয়া বাইপাস-গাছবাড়িয়া-চকরিয়া-বদরখালী রুটে প্রায় ১৩১ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়।
নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যানবাহন কর্ণফুলী টানেল থেকে কালাবিবির দীঘি-বাঁশখালী-টইটং-পেকুয়া-মাতামুহুরী (ঈদমনি)-বদরখালী হয়ে সরাসরি মাতারবাড়ীতে পৌঁছাতে পারবে। এতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরত্ব কমবে এবং যাত্রা সময় এক ঘণ্টা পর্যন্ত সাশ্রয় হবে।
এ ছাড়া কক্সবাজারগামী যানবাহন এই রুট ব্যবহার করলে প্রায় ২৮ কিলোমিটার পথ কম অতিক্রম করতে হবে এবং প্রায় ৪৫ মিনিট সময় সাশ্রয় হবে।
৫৮ কিলোমিটার সড়ক হবে ৩৪ ফুট প্রশস্ত
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ সূত্র জানায়, কালাবিবির দীঘি থেকে মাতামুহুরী (ঈদমনি) পর্যন্ত প্রায় ৫৮ দশমিক ২০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ করা হবে। বর্তমানে অনেক অংশে সড়কের প্রস্থ মাত্র ১৮ ফুট। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি ৩৪ ফুটে উন্নীত করা হবে।
বর্তমানে আনোয়ারার কালাবিবির দীঘির মোড় থেকে বাঁশখালীর চাঁনপুর বাজার পর্যন্ত ১০০ ফুট ভূমি অধিগ্রহণ রয়েছে। তবে চাঁনপুর বাজার থেকে চকরিয়া পর্যন্ত সড়ক সংকীর্ণ হওয়ায় যানজট ও দুর্ঘটনা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। সড়ক প্রশস্ত হলে এসব সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন দুয়ার খোলবেঃ
সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্ণফুলী টানেল চালুর পরও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। কারণ কক্সবাজার ও মাতারবাড়ীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি।
পিএবি-টইটং মহাসড়ক বাস্তবায়িত হলে আনোয়ারা, বাঁশখালী, চকরিয়া, মহেশখালী ও কক্সবাজারকে ঘিরে নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কর্ণফুলী টানেলকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বাড়বে।
টানেলের ব্যবহার বাড়বেঃ
দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল কর্ণফুলী টানেলের সঙ্গে কক্সবাজারমুখী একটি বিকল্প মহাসড়ক সংযোগ স্থাপন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কর্ণফুলী টানেলে যানবাহন চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে টানেল পরিচালনায় রাজস্ব আয় বাড়বে এবং টোল আদায়ের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় ও লোকসান কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল নোমান পারভেজ বলেন, “দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে আনোয়ারা, বাঁশখালী, চকরিয়া, মহেশখালী ও কক্সবাজার অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে এবং কোটি মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, “পিএবি-টইটং সড়ক দক্ষিণ চট্টগ্রামের বহু প্রতীক্ষিত একটি প্রকল্প। এটি বাস্তবায়িত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
বাঁশখালীর সন্তান ব্যাংক কর্মকর্তা ইনজামামুল হক বলেন, “কর্ণফুলী টানেল চালুর পরও কক্সবাজার যেতে ঘুরপথ ব্যবহার করতে হতো। এই সড়ক বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার কমবে, এক ঘণ্টা সময় বাঁচবে এবং টানেল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অর্থনৈতিক হাব গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।”
দীর্ঘদিন ফাইলবন্দী ছিল প্রকল্পটিঃ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় এক বছর আগে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পুনর্মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় অনুমোদন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়।
অবশেষে একনেকের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পথে বড় অগ্রগতি হলো। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কর্ণফুলী টানেল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে উঠবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।