কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
একটি প্রায় ৮০ বছরের পুরনো পুকুর, যা এলাকাবাসীর জলাধার ও পরিবেশ রক্ষার একমাত্র আশ্রয় ছিল, সেটি রাতের অন্ধকারে ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন। প্রশাসনের চোখের সামনে এমন পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ চললেও আজও নেওয়া হয়নি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার জানানো হলেও প্রশাসন নীরব থেকেছে।
কিশোরগঞ্জ জেলার কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার কিশোরগঞ্জ মৌজার জেএল নং ০৩৩ এবং ময়মনসিংহ জেলার এস এ খতিয়ান অনুযায়ী জেএল নং ১৭০–তে অবস্থিত এই পুরোনো পুকুর, দাগ নম্বর ২৩৬৪০ ও ৯১৫৫–এ চিহ্নিত জমিটি রাতের আঁধারে গোপনে বালু ও মাটি দিয়ে ভরাট করে সেখানে আংশিকভাবে পাঁচতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পুকুরটির অস্তিত্ব ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে গিয়ে এলাকাবাসী একাধিকবার বাধা প্রদান করলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষ কোনো কর্ণপাত করেনি।
এলাকাবাসী পুকুর রক্ষায় একাধিকবার সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের কিশোরগঞ্জ জেলা কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয় ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে (অভিযোগ নং-৪৮)। এরপরও দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পুকুরটি রক্ষায় নেওয়া হয়নি কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর পদক্ষেপ।
৩১ ডিসেম্বর, ২০২৩ তারিখে কিশোরগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর সহকারী কমিশনার (ভূমি), কিশোরগঞ্জ সদর বরাবর একটি চিঠি প্রেরণ করে (স্মারক নং-২২.০২.৪৮০০.১৪৬.৬০.০০৩.১৩.৪১৫), যেখানে পুকুর ভরাট সংক্রান্ত তথ্য, মালিকানা, বর্তমান অবস্থা, শ্রেণি ও ট্রেসম্যাপসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হয়। কিন্তু এরপরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পুকুরটি শুধু জলাধার নয়, এটি এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাণিকুলের আশ্রয়স্থল হিসেবেও এটি অপরিহার্য। একটি ঐতিহাসিক ও পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পুকুর এভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া ভয়ানক নজির।

এলাকাবাসী জানিয়েছেন, “এই পুকুর আমাদের শৈশব, পরিবেশ, ইতিহাসের অংশ। রাতের অন্ধকারে ভরাট করে এখন ভবন উঠিয়ে দিয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে বহুবার গেছি, কিন্তু কিছুই হয়নি।” তারা বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, আমরা কি সত্যিই একটি পরিবেশ সচেতন জাতি হতে পারব? যখন সরকার জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের কথা বলে, তখন স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের অনিয়ম, প্রশাসনের নির্লিপ্ততা এবং পরিবেশ ধ্বংসের দায় কাদের?