
গত সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে নতুন একটি ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ঘোষণা করেছেন। সামরিক অভিযানের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পর এবার অর্থনৈতিকভাবে তেহরানকে কোণঠাসা করার কৌশল নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
সাধারণত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করে। এরপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হয় এবং সবশেষে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় আসে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এবার সেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কূটনীতির পর সামরিক হামলার পথ বেছে নেয়।
ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল ইরানের প্রায় ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পরিত্যাগে বাধ্য করা এবং সম্ভব হলে দেশটির সরকারকে পতনের দিকে ঠেলে দেওয়া। তবে ১৮ জন মার্কিন সেনা ও শত শত, এমনকি হাজারো ইরানির প্রাণহানি এবং ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ের পরও সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
এখন নতুন করে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে বড় ধরনের অর্থনৈতিক অভিযান শুরু করতে চাইছে ওয়াশিংটন। হোয়াইট হাউসের ভাষায়, এর লক্ষ্য হলো ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা অবশিষ্ট সব অর্থনৈতিক জীবনরেখা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।
পরিকল্পনার আওতায় ইরানে অর্থ প্রবাহের সবশেষ পথও বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে। এর মধ্যে ছদ্মবেশী ডিজিটাল লেনদেন, জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বর্ণের লেনদেনের মতো ব্যবস্থাও রয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের হাতে থাকা প্রতিটি বিকল্প ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে নতুন এই উদ্যোগকে ঘিরে বড় প্রশ্নও উঠেছে। যদি এত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের সুযোগ আগে থেকেই থাকে, তাহলে সামরিক অভিযান শুরুর আগে সেগুলো ব্যবহার করা হয়নি কেন? সামরিক সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত এবং সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ্যে এসেছে।
ইরানের অর্থনীতিকে কার্যকরভাবে চাপে ফেলতে হলে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০২৫ সালে ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন।
ফলে ইরানের তেল বিক্রির প্রধান বাজার চীনের ওপর চাপ না দিয়ে ওয়াশিংটনের নতুন অর্থনৈতিক অভিযান কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান, পারমাণবিক সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অতিরিক্ত উৎপাদনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা চলছে।
১৯৪৪ সালের নরমান্ডি অভিযানের মূল ‘ডি-ডে’-তে চীনের সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে এই অর্থনৈতিক ‘ডি-ডে’ সফল করতে চীনের সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষ করে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটনে সম্ভাব্য রাষ্ট্রীয় সফরের মাত্র এক মাস আগে বেইজিং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে—এমন কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি।
জর্জটাউন ল স্কুলের ভিজিটিং স্কলার পিটার হ্যারেলের মতে, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে ইরানকে চাপে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ট্রাম্পের সামনে দুটি বড় পথ ছিল—চীনের ওপর কঠোর চাপ সৃষ্টি করা অথবা ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপ করা।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দিকের পূর্ব ইউরোপের পরিস্থিতির সরাসরি তুলনা করাও কঠিন। বার্লিন প্রাচীর পতনের সময় সেখানে কোনো সক্রিয় বাহ্যিক যুদ্ধ চলছিল না। বরং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্রদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
তবু ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান কৌশলের পেছনে হয়তো সেই ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা রয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে দ্রুত সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত স্বীকার করেছিল যে নিষেধাজ্ঞা ধীরগতিতে কাজ করে এবং ইতিহাসে এর সাফল্যও সীমিত।
কিন্তু সামরিক অভিযান প্রত্যাশিত ফল না দেওয়ায় এখন আবার সেই অর্থনৈতিক চাপের পথেই ফিরছে ওয়াশিংটন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ইরানের প্রধান তেল ক্রেতা চীনকে পাশে না পেলে ট্রাম্পের এই নতুন অর্থনৈতিক ‘ডি-ডে’ আদৌ কতটা সফল হবে?