
আইন লঙ্ঘন, জনভোগান্তি ও নীরব প্রশাসন
সাকিব আহসান
প্রতিনিধি, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও:
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ পৌরশহরের ১নং ওয়ার্ডে পীরগঞ্জ ঢাকাইয়া পট্টি কাপড়ের বাজার এলাকায় অবস্থিত ‘বিক্রমপুর বস্ত্রালয়’ নামক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ প্রকাশ্যে পৌরসড়ক দখল করে বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে চরম জনভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
পৌরসড়কের ওপর বালু, ইট, রড ও সিমেন্টের স্তূপ ফেলে রাখায় সড়কটি কার্যত একমুখী সরু পথে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন এ সড়ক ব্যবহার করতে গিয়ে শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ, নারী ও রোগীবাহী যানবাহনকে পড়তে হচ্ছে চরম ঝুঁকি ও দুর্ভোগে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের (৫৮) ক্ষোভের সঙ্গে বলেন,
“এই রাস্তায় হেঁটে মসজিদে যাই। আগে যেখানে দুজন মানুষ সহজে চলাচল করত, এখন সেখানে একা হাঁটাও কষ্টকর। একটু অসাবধান হলেই দুর্ঘটনা।”
আরেক বাসিন্দা রিকশাচালক রবিউল ইসলাম বলেন,
“রড-ইটের কারণে রিকশা ঢুকানো যায় না। যাত্রী নামিয়ে হেঁটে যেতে হয়। এতে ভাড়া কমে, সময় নষ্ট হয়।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবন নির্মাণকারী পক্ষ পৌরসভার অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণ শর্ত লঙ্ঘন করে জনসাধারণের চলাচলের একমাত্র সড়ক দখল করে রেখেছে। সরু সড়কের এক পাশে নির্মাণসামগ্রী, অন্য পাশে ভ্যান, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার চলাচলের ফলে প্রায়ই যানজট ও সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় কোনো সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বা ব্যারিকেড না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
একজন নারী শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“সন্ধ্যার পর এই রাস্তায় চলাচল করতে ভয় লাগে। আলো কম, চারদিকে ইট-বালু—হঠাৎ পড়ে গেলে বা গাড়ি ধাক্কা দিলে কে দায় নেবে?”
আইন অনুযায়ী এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্পষ্টতই দণ্ডনীয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ৬৯ অনুযায়ী জনসাধারণের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সড়ক দখল করা অপরাধ। একই আইনের ধারা ৭০ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া সড়কে নির্মাণসামগ্রী রাখা বা কাজ পরিচালনা করলে জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।
এছাড়া পৌরসভা আইন, ২০০৯-এর ধারা ৮৮ ও ৮৯ অনুযায়ী পৌর এলাকার রাস্তা, ফুটপাত বা জনপরিসর দখল করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ বেআইনি। পৌর কর্তৃপক্ষ চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে উচ্ছেদ, জরিমানা আরোপ এবং নির্মাণকাজ বন্ধ করতে পারে। একইভাবে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী নির্মাণকাজ চলাকালে জননিরাপত্তা ও স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
তবুও স্থানীয়দের প্রশ্ন—আইন এত স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কেন পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নীরব? স্থানীয় ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন,
“দিনের পর দিন অভিযোগ হচ্ছে, কিন্তু কেউ আসে না। মনে হয় নিয়ম শুধু গরিবদের জন্য।”
সচেতন মহলের মতে, একটি অবৈধ দখলকে প্রশ্রয় দেওয়া মানেই ভবিষ্যতে আরও বড় অনিয়মের পথ খুলে দেওয়া। আজ রাস্তা, কাল ফুটপাত বা ড্রেন—এভাবেই জনস্বার্থ ধীরে ধীরে ব্যক্তিস্বার্থের কাছে পরাজিত হয়।
এ অবস্থায় অবিলম্বে পৌরসভা ও প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। রাস্তা দখলমুক্ত করা, বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা ছাড়া নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় পীরগঞ্জ পৌরশহরে আইন থাকবে শুধু কাগজে-কলমে, আর বাস্তবে চলবে প্রভাবশালীদের ইচ্ছার আইন—যার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।
Reporter Name 
























