ঢাকা: একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচিকে একীভূত করে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কার্যক্রমের সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর আরও কার্যকর সমন্বয় করা গেলে বাংলাদেশে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা আরও সুনির্দিষ্টভাবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব ও জ্বালানিতে সংস্কারের তাগিদ
বিশ্বব্যাংক বলছে, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত কিছুটা স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে এ স্থিতিশীলতা এসেছে।
তবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, কম রাজস্ব আদায় এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম গতি পেলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
কমছে প্রবৃদ্ধির গতি, বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
কমেছে বিনিয়োগ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়।
খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ হার ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।
খেলাপি ঋণের এই উচ্চ হার ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
রাজস্ব আদায়েও বড় ঘাটতি
রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন হার।
এর ফলে উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে ব্যয়ের জন্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হচ্ছে। একই সময়ে বাজেট ঘাটতি ২০২৫ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
নতুন করে দারিদ্র্যে ২১ লাখ মানুষ
অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের ওপরও। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।
এ সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নারীরা কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত এবং সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্যও এসব সংস্কার জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দরিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেকই সামাজিক সুরক্ষার বাইরে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সহায়তা করছে। তবে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।
এ কারণে সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এ ক্ষেত্রে সরকারের ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে সংস্থাটি। সমন্বিত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যের ভিত্তিতে উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য কমানোর সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাংকের মতে, একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচিকে একীভূত করে বিদ্যমান নগদ সহায়তার সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর কার্যকর সমন্বয় করা গেলে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়বে। এতে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেতে পারে।
সংস্থাটি মনে করছে, সুবিধাভোগী নির্বাচনে তথ্যভিত্তিক ও সমন্বিত ব্যবস্থা চালু করা গেলে সীমিত সরকারি অর্থ আরও কার্যকরভাবে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত দূর করা। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি করা না গেলে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে
এদিকে একই দিনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশকে নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
Reporter Name 






















