Dhaka ০৬:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরনাম:
নাগেশ্বরী অ্যাপোলো ক্লিনিকে সিজারের পর চিকিৎসায় অবহেলার মৃত্যুর অভিযোগ নির্বিঘ্ন দুর্গোৎসব নিশ্চিত করতে নগরীর পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করলেন সিএমপি কমিশনার চরভদ্রাসনে ১৫ মণ্ডপে শুরু শারদীয় দুর্গাপূজা, চলবে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক শিবির নেতা সুমন গ্রেপ্তার চরভদ্রাসনে দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় তৎপর পুলিশ, ১৫ পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ওসির বাঁশখালীতে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো সংগঠন ও মানবতার ফেরিওয়ালাদের সংবর্ধনা দেবে প্রবাসী মানব কল্যাণ ফাউন্ডেশন চন্দনাইশে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৩ পরিবারের বসতঘর ভস্মীভূত, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডিমলায় প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা হচ্ছে গুজব সুনামগঞ্জে মাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ, আটক ছেলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে ভেঙ্গে দেওয়া হলো জামায়াতের কুমিল্লা মহানগর সংগঠন ও ইমারাত
বিজ্ঞাপন :
জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় চীফ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন । সম্পদক-ইমদাদুল হক তৈয়ব-01711576603, সিভি পাঠান এই ইমেইলে- editor.manobjibon@gmail.com

ভারতে নয় এবার কম টাকায় কিডনি প্রতিস্থাপন হবে বাংলাদেশেই

“প্রায় দুই হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করে রেকর্ড গড়েছেন ডা. কামরুল ইসলাম”

ইমদাদুল হক তৈয়ব:

প্রায় দুই  হাজার কিডনি প্রতিস্থাপনের মাইলফলক সাফল্য স্পর্শ করেছেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক অধ্যাপক কামরুল ইসলাম। সম্প্রতি সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিতে তার এ অভাবনীয় সাফল্যর কথা জানা যায়।

বাবাকে হারানোর পর মো. কামরুল ইসলামের ছোটবেলা ও শিক্ষাজীবন কেটেছিল সীমাহীন কষ্টে। তুখোড় মেধাবী এ শিক্ষার্থী এমবিবিএস ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে ১৯৮৯ সালে চিকিৎসক হন। এরপর থেকে স্বাস্থ্যসেবায় অকুতোভয় ও নিবেদিতপ্রাণ তিনি। কর্মজীবনে বেশ কিছু দিন কাজ করেছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকদু) ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

চিকিৎসা বিদ্যায় অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গত ১৫ মার্চ অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে সরকার। সম্প্রতি দৈনিক মানবজীবন.কমের মুখোমুখি হয় এই মহান ব্যাক্তিত্ব ডা. কামরুল ইসলাম । তাঁর সংগ্রামমুখর পথচলা, সাফল্যের অপ্রকাশিত অধ্যায় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হলো।

দৈনিক মানবজীবন.কম:  শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি চারণ করবেন কি?

অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম: মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্ভবত আমাকে তৃতীয় শ্রেণিতে বাবা ভর্তি করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবই বন্ধ হয়ে গেল। আমার বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে হারালাম। সেই স্মৃতি আসলে খুবই কষ্টের, মাঝে মাঝে মনে হয় যেন বুকে পাথর জমেছিল। যাই হোক, যত দিন যায়, ধীরে ধীরে সব ভুলে যেতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলো। আমরা চার ভাই, তার মধ্যে বড় ভাই কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন আর আমি মেঝো। আমার ছোটজন সবেমাত্র স্কুলে যায়। আর সবার ছোটজন বাবা মারা যাওয়ার সময় বয়স ছিল পাঁচ দিন। চার ভাই আর আমার মা মনে হয় যুদ্ধে সাগরে পড়ার মত অবস্থা। আমরা পাবনা ইশ্বরদীর পাকশিতে নানি বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেছি।

আমার লেখাপড়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দুঃখী মাকে শান্তি দেওয়া। কারণ আমি খুব ভালো করে জানতাম, আম্মা ভালো ফলাফল ছাড়া আর কোনো কিছুতেই খুশি হন না। এমবিবিএস পাস করেছি, উনি কখনও আমাকে ক্লিনিকে কাজ করতে দেননি। বলেছেন, আরও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নাও। এফসিপিএস কর। আমি প্র্যাকটিস শুরু করি এফসিপিএস করার পরে। এমবিবিএস করে হয়তো কারও অনুপস্থিতিতে একটা বা দুইটা ডিউটি করেছি। কিন্তু আম্মা কাজ করতে দেননি। বলতেন, আগে পড়াশোনা শেষ কর। আর আমি যখন প্র্যাকটিস শুরু করি আস্তে আস্তে আমাদের স্বচ্ছলতা দেখা দিলো, আমার ছোট ভাইও ইঞ্জিনিয়ার। তার আবার ক্যানসার ধরা পড়লো। তাকে চিকিৎসা করানো হলো, এক পর্যায়ে মারা গেল সে। আমার আম্মা এখনও বেঁচে আছেন। সেটাই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। আল্লাহ উনাকে নেক হায়াত দান করুক। আমার সবচেয়ে অনুপ্রেরণা আমার মা।

আরও পড়ুনঃ  ডেঙ্গু প্রতিরোধে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন আধা ঘণ্টা সময় দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

দৈনিক মানবজীবন.কম:  রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: আমার তিনটা প্রতিক্রিয়া বলতে পারেন। আমার, জনগণ ও সরকারের প্রতিক্রিয়া? আমি প্রথমেই সরকারকে সাধুবাদ জানাই। সরকার খুঁজে খুঁজে এ রকম একটা বড় পুরস্কার আমার মতো নগণ্য ব্যক্তিকে দিয়েছে। আমার উপর দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে। তার বড় কিছু হলো অনুপ্রেরণা। আর যারা ভালো কাজ করছেন, তারা যে কি অনুপ্রাণিত হবেন বলে বোঝানো যাবে না। আমার মতো এ রকম মানুষকে সরকার খুঁজে খুঁজে পুরস্কার দেয়, তাহলে অনেকেই অনুপ্রাণিত হবেন। তারা ভালো কাজ করতে থাকবেন, আমাদের দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

দৈনিক মানবজীবন.কম:  কীভাবে এত  সাফল্যে অর্জন করলেন?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: পরিশ্রম আর মেধার বিকল্প নেই। সাফল্যের জন্য আপনাকে পরিশ্রম করতেই হবে। আল্লাহ প্রদত্ত কিছু মেধা থাকে, কিন্তু আপনাকে শান দিতে হয়। শান দিলে এটা প্রখর হয়। শান দেওয়ার উপায় হচ্ছে বই পড়া। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেওয়া। দেখা কাজটা করা। পড়ার সময় যেসব কমপ্লিকেশন হয়, সেসবের আউটকাম ভালো করা যায় সেদিকে খেয়াল রাখা। প্রতিনিয়ত কাজের ধরন পরিবর্তন করতে হবে, যাতে ভালো আউটকাম দেওয়া যায়। পরিশ্রম করতেই হবে। আমি যদি শুধু বসে বসে চিন্তা করি, তাতে কিন্তু কখনই ভালো আউটকাম আসবে না।

মেধা ও শিক্ষা অর্জন করতে হবে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম খরচে ভালো পাওয়া যায়, সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র শিক্ষা। শিক্ষার দ্বারা যেটা অর্জন করা সম্ভব, অন্য কিছুতেই সেটা অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের এক সময় কিছুই ছিল না। মেধা, শিক্ষা আর কাজ করতে করতে এ জায়গায় আসা। এ সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে শিক্ষা, পরিশ্রম আর মেধা।

দৈনিক মানবজীবন.কম:  আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী ?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: আমাদের দেশের গরিব রোগীদের আরও বেশি করে সেবা দেওয়া যায়, আরও বড় পরিসরে অনেক মানুষকে যাতে সেবা দিতে পারি—এটাই আমার মূল পরিকল্পনা। আমাদের সেবার গুণমান আরও বাড়ানো যায়, সেদিকে আরও বেশি মনোযোগ দিব। আমরা বাণিজ্যিকভাবে অতিরিক্ত খরচ চাই না, সেবার মানটা ঠিক রাখতে। সেটা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে হচ্ছে। সে জিনিসটাই যেন, আমাদের দেশেও হতে পারে সেদিকে মনোযোগী হতে চাই।

আরও পড়ুনঃ  চাঁদপুরে ৫ দিন ধরে নিখোঁজ শারীরিক প্রতিবন্ধী ফাহিম, সন্ধান চায় পরিবার

দৈনিক মানবজীবন.কম:  দেশের তরুণ চিকিৎসকদের সুয়োগ সুবিধা সম্পর্কে কিছু বলবেন?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: অর্থনৈতিক বাধা বড় বাধা নয়, এখনকার সমাজে বাধাটা আরও কমে আসছে। আমরা যখন ইন্টার্নি করি, তখন আমাদেরকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিত। আমি আড়াই হাজার টাকা থেকে এক হাজার টাকা খরচ করতাম। আরও দেড় হাজার টাকা বাঁচিয়ে রাখতাম। পরবর্তী এক বছরের এফসিপিএস কোর্সের জন্য। সেই সময় আমি কোনো জায়গায় কাজ করতে চাইতাম না, যাতে আমি পুরো সময়টা পড়াশোনায় ব্যয় করতে পারি।

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এমন কিছু শিক্ষার্থীকেও দেখেছি, ভালো ফলাফল করে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। সে আবার টিউশনি করছে। টিউশন যদি প্রয়োজন হয় তাহলে করবা। কিন্তু প্রয়োজন না হলে করার দরকার নেই। এখন টাকা ইনকামের সময় নয়। এখন সবচেয়ে সময় পড়াশোনা আর প্রশিক্ষণের। যত বেশি পারা যায়, শিক্ষা অর্জন করার এবং এটাই আমার বড় উপদেশ। যত দিন পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ না হবে, ততদিন পর্যন্ত অতিরিক্ত ইনকামের পেছনে না দৌড়ানো উচিত। ভালো করার জন্য যত পরিশ্রম করা দরকার, সব করতে হবে এবং কোনো রোগীর যদি কোনো কারণে ক্ষতি হয়, সেক্ষেত্রে সহানুভূতির দৃষ্টি রাখা উচিত। সে রোগীটার যাতে কষ্ট লাঘব হয়, সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখা উচিত। কাজেই, কাজের দিকে না ছুটে ফলের দিকে ছুটলে এমনিতেই টাকা আসবে।

দৈনিক মানবজীবন.কম:  দেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে আপনার পরামর্শ কী?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: নীতি নির্ধারক পর্যায়ে যারা আছেন, তারা ভালো বলতে পারবেন। সার্বিকভাবে, স্বাস্থ্য সেবা খাতে আমরা যারা অংশীদার চিকিৎসক। আমাদের দেশের ৮০ শতাংশ রোগী গরিব। আমরা যদি গরিব রোগীর চিন্তা মাথায় রাখি। তাহলে কখনও রোগীর অভাব হবে না। আমরা যদি ভালো সেবা ও আউটকামের চিন্তা মাথায় রাখি, তাহলে রোগী দেখে কূল পাওয়া যাবে না।

আরও পড়ুনঃ  তাজমীন হত্যা মামলায় অভিযুক্ত সুমনকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য, জঙ্গলে মিলল স্কুলছাত্রীর আইফোন

দৈনিক মানবজীবন.কম:  তৃণমূল পর্যায়ে এখনও কিডনি বিশেষজ্ঞ নেই, এ বিষয়ে আপনার মতামত?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: এ ব্যাপারে সরকার ব্যাপক চিন্তা ভাবনা করছে। কিডনির ব্যাপারে সরকার অনেক আন্তরিক। অনেক ডায়ালাইসিস সেন্টার করার পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় যাতে ট্রান্সপ্যালান্ট হয়, সে ব্যাপারে আমাকেও মন্ত্রণালয় ডেকে ছিল। সরকারের আন্তরিকতা রয়েছে এবং চেষ্টা করছে। আমরা ধারণা এটা আরও বিস্তৃতি লাভ করবে। অনেক দিন জাতীয় কিডনি হাসপাতালে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট বন্ধ ছিল। সেখানে আমিও গিয়ে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে দিয়ে আসছি। ঢাকা মেডিকেলে রোযার আগে হয়তো কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। সিএমএইচে করে দিয়ে এসেছি। আবার খবর এসেছে, সেখানে তারা রোগী রেডি করছে। ঢাকার বাহিরে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয় না। যেসব রোগী ঢাকার ভিতরে বিভিন্ন সেন্টারে বিশেষ করে সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠানে হওয়া প্রয়োজন, তাদের চিকিৎসক নার্সরা এসে আমাদের এখানে ট্রেনিং করছে।

দৈনিক মানবজীবন.কম:  যারা মেডিকেল শিক্ষায় আসতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ জানতে চাই?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেডিকেল সম্পর্কে একটা বিরূপ ধারণা রয়েছে। অনেক পড়াশোনা করতে হয়। অনেক মুখস্ত করতে হয়। এ রকম একটি ধারণা রয়েছে। এটা ঠিক নয়। আসলে মোটা মোটা বই বটে, চিন্তা করে পড়লে বেশি সময় ধরে পড়া লাগে না।

মেডিকেল অঙ্গনে অনেক সময় শুনে শুনে পড়াশোনা করলেও আপনি পাস করে যাবেন। এতো বেশি কঠিন নয়, সামনেই আপনার যন্ত্র পড়ে আছে। মানুষই হলো আপনার যন্ত্র। এ যন্ত্রের মধ্যে নরমাল কি হচ্ছে, ফিজিক্যাল কি হচ্ছে, প্যাথলজিক্যাল কি হচ্ছে–এগুলো আপনার সামনে বসে বসে রোগীর দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু চিন্তা করতে পারবেন। শুধু চিন্তা করলেই প্রায় ৫০ শতাংশ পড়া হয়ে যায়। শিক্ষকরা যখন পড়াবেন, তখন মনোযোগ সহকারে পড়বেন। প্রতিদিন পড়বেন।

একজন চিকিৎসক যে সার্ভিসটা দিতে পারবেন, তা অন্য সার্ভিস থেকে অনেক বেশি। ধরেন, একজন চিকিৎসক, তার একজন আত্মীয়-স্বজনের স্বাস্থ্যগত সমস্যার খোঁজ-খবর নিলেন। সে যে কতটা খুশি হবে..! অন্য প্রফেশনে এ রকমটা করার সুযোগ নেই। বাসায় কেউ অসুস্থ হলে তাঁর জন্য যে সেবাটা দিতে পারবেন। অন্য কোনো সার্ভিস হলে সেটা দিতে পারবেন না।

Tag :
জনপ্রিয় নিউজ

নাগেশ্বরী অ্যাপোলো ক্লিনিকে সিজারের পর চিকিৎসায় অবহেলার মৃত্যুর অভিযোগ

ভারতে নয় এবার কম টাকায় কিডনি প্রতিস্থাপন হবে বাংলাদেশেই

সময়: ০২:১১:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৫

“প্রায় দুই হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করে রেকর্ড গড়েছেন ডা. কামরুল ইসলাম”

ইমদাদুল হক তৈয়ব:

প্রায় দুই  হাজার কিডনি প্রতিস্থাপনের মাইলফলক সাফল্য স্পর্শ করেছেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক অধ্যাপক কামরুল ইসলাম। সম্প্রতি সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিতে তার এ অভাবনীয় সাফল্যর কথা জানা যায়।

বাবাকে হারানোর পর মো. কামরুল ইসলামের ছোটবেলা ও শিক্ষাজীবন কেটেছিল সীমাহীন কষ্টে। তুখোড় মেধাবী এ শিক্ষার্থী এমবিবিএস ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে ১৯৮৯ সালে চিকিৎসক হন। এরপর থেকে স্বাস্থ্যসেবায় অকুতোভয় ও নিবেদিতপ্রাণ তিনি। কর্মজীবনে বেশ কিছু দিন কাজ করেছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকদু) ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

চিকিৎসা বিদ্যায় অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গত ১৫ মার্চ অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে সরকার। সম্প্রতি দৈনিক মানবজীবন.কমের মুখোমুখি হয় এই মহান ব্যাক্তিত্ব ডা. কামরুল ইসলাম । তাঁর সংগ্রামমুখর পথচলা, সাফল্যের অপ্রকাশিত অধ্যায় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হলো।

দৈনিক মানবজীবন.কম:  শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি চারণ করবেন কি?

অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম: মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্ভবত আমাকে তৃতীয় শ্রেণিতে বাবা ভর্তি করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবই বন্ধ হয়ে গেল। আমার বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে হারালাম। সেই স্মৃতি আসলে খুবই কষ্টের, মাঝে মাঝে মনে হয় যেন বুকে পাথর জমেছিল। যাই হোক, যত দিন যায়, ধীরে ধীরে সব ভুলে যেতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলো। আমরা চার ভাই, তার মধ্যে বড় ভাই কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন আর আমি মেঝো। আমার ছোটজন সবেমাত্র স্কুলে যায়। আর সবার ছোটজন বাবা মারা যাওয়ার সময় বয়স ছিল পাঁচ দিন। চার ভাই আর আমার মা মনে হয় যুদ্ধে সাগরে পড়ার মত অবস্থা। আমরা পাবনা ইশ্বরদীর পাকশিতে নানি বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেছি।

আমার লেখাপড়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দুঃখী মাকে শান্তি দেওয়া। কারণ আমি খুব ভালো করে জানতাম, আম্মা ভালো ফলাফল ছাড়া আর কোনো কিছুতেই খুশি হন না। এমবিবিএস পাস করেছি, উনি কখনও আমাকে ক্লিনিকে কাজ করতে দেননি। বলেছেন, আরও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নাও। এফসিপিএস কর। আমি প্র্যাকটিস শুরু করি এফসিপিএস করার পরে। এমবিবিএস করে হয়তো কারও অনুপস্থিতিতে একটা বা দুইটা ডিউটি করেছি। কিন্তু আম্মা কাজ করতে দেননি। বলতেন, আগে পড়াশোনা শেষ কর। আর আমি যখন প্র্যাকটিস শুরু করি আস্তে আস্তে আমাদের স্বচ্ছলতা দেখা দিলো, আমার ছোট ভাইও ইঞ্জিনিয়ার। তার আবার ক্যানসার ধরা পড়লো। তাকে চিকিৎসা করানো হলো, এক পর্যায়ে মারা গেল সে। আমার আম্মা এখনও বেঁচে আছেন। সেটাই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। আল্লাহ উনাকে নেক হায়াত দান করুক। আমার সবচেয়ে অনুপ্রেরণা আমার মা।

আরও পড়ুনঃ  শহীদ আবরার ফাহাদ সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ২৫০–৩০০ কোটি টাকা: প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম

দৈনিক মানবজীবন.কম:  রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: আমার তিনটা প্রতিক্রিয়া বলতে পারেন। আমার, জনগণ ও সরকারের প্রতিক্রিয়া? আমি প্রথমেই সরকারকে সাধুবাদ জানাই। সরকার খুঁজে খুঁজে এ রকম একটা বড় পুরস্কার আমার মতো নগণ্য ব্যক্তিকে দিয়েছে। আমার উপর দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে। তার বড় কিছু হলো অনুপ্রেরণা। আর যারা ভালো কাজ করছেন, তারা যে কি অনুপ্রাণিত হবেন বলে বোঝানো যাবে না। আমার মতো এ রকম মানুষকে সরকার খুঁজে খুঁজে পুরস্কার দেয়, তাহলে অনেকেই অনুপ্রাণিত হবেন। তারা ভালো কাজ করতে থাকবেন, আমাদের দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

দৈনিক মানবজীবন.কম:  কীভাবে এত  সাফল্যে অর্জন করলেন?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: পরিশ্রম আর মেধার বিকল্প নেই। সাফল্যের জন্য আপনাকে পরিশ্রম করতেই হবে। আল্লাহ প্রদত্ত কিছু মেধা থাকে, কিন্তু আপনাকে শান দিতে হয়। শান দিলে এটা প্রখর হয়। শান দেওয়ার উপায় হচ্ছে বই পড়া। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেওয়া। দেখা কাজটা করা। পড়ার সময় যেসব কমপ্লিকেশন হয়, সেসবের আউটকাম ভালো করা যায় সেদিকে খেয়াল রাখা। প্রতিনিয়ত কাজের ধরন পরিবর্তন করতে হবে, যাতে ভালো আউটকাম দেওয়া যায়। পরিশ্রম করতেই হবে। আমি যদি শুধু বসে বসে চিন্তা করি, তাতে কিন্তু কখনই ভালো আউটকাম আসবে না।

মেধা ও শিক্ষা অর্জন করতে হবে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম খরচে ভালো পাওয়া যায়, সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র শিক্ষা। শিক্ষার দ্বারা যেটা অর্জন করা সম্ভব, অন্য কিছুতেই সেটা অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের এক সময় কিছুই ছিল না। মেধা, শিক্ষা আর কাজ করতে করতে এ জায়গায় আসা। এ সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে শিক্ষা, পরিশ্রম আর মেধা।

দৈনিক মানবজীবন.কম:  আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী ?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: আমাদের দেশের গরিব রোগীদের আরও বেশি করে সেবা দেওয়া যায়, আরও বড় পরিসরে অনেক মানুষকে যাতে সেবা দিতে পারি—এটাই আমার মূল পরিকল্পনা। আমাদের সেবার গুণমান আরও বাড়ানো যায়, সেদিকে আরও বেশি মনোযোগ দিব। আমরা বাণিজ্যিকভাবে অতিরিক্ত খরচ চাই না, সেবার মানটা ঠিক রাখতে। সেটা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে হচ্ছে। সে জিনিসটাই যেন, আমাদের দেশেও হতে পারে সেদিকে মনোযোগী হতে চাই।

আরও পড়ুনঃ  এক বছরের জন্য ৪০০ পরিবারের দায়িত্ব নিলেন রাশমিকা মান্দানা

দৈনিক মানবজীবন.কম:  দেশের তরুণ চিকিৎসকদের সুয়োগ সুবিধা সম্পর্কে কিছু বলবেন?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: অর্থনৈতিক বাধা বড় বাধা নয়, এখনকার সমাজে বাধাটা আরও কমে আসছে। আমরা যখন ইন্টার্নি করি, তখন আমাদেরকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিত। আমি আড়াই হাজার টাকা থেকে এক হাজার টাকা খরচ করতাম। আরও দেড় হাজার টাকা বাঁচিয়ে রাখতাম। পরবর্তী এক বছরের এফসিপিএস কোর্সের জন্য। সেই সময় আমি কোনো জায়গায় কাজ করতে চাইতাম না, যাতে আমি পুরো সময়টা পড়াশোনায় ব্যয় করতে পারি।

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এমন কিছু শিক্ষার্থীকেও দেখেছি, ভালো ফলাফল করে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। সে আবার টিউশনি করছে। টিউশন যদি প্রয়োজন হয় তাহলে করবা। কিন্তু প্রয়োজন না হলে করার দরকার নেই। এখন টাকা ইনকামের সময় নয়। এখন সবচেয়ে সময় পড়াশোনা আর প্রশিক্ষণের। যত বেশি পারা যায়, শিক্ষা অর্জন করার এবং এটাই আমার বড় উপদেশ। যত দিন পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ না হবে, ততদিন পর্যন্ত অতিরিক্ত ইনকামের পেছনে না দৌড়ানো উচিত। ভালো করার জন্য যত পরিশ্রম করা দরকার, সব করতে হবে এবং কোনো রোগীর যদি কোনো কারণে ক্ষতি হয়, সেক্ষেত্রে সহানুভূতির দৃষ্টি রাখা উচিত। সে রোগীটার যাতে কষ্ট লাঘব হয়, সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখা উচিত। কাজেই, কাজের দিকে না ছুটে ফলের দিকে ছুটলে এমনিতেই টাকা আসবে।

দৈনিক মানবজীবন.কম:  দেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে আপনার পরামর্শ কী?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: নীতি নির্ধারক পর্যায়ে যারা আছেন, তারা ভালো বলতে পারবেন। সার্বিকভাবে, স্বাস্থ্য সেবা খাতে আমরা যারা অংশীদার চিকিৎসক। আমাদের দেশের ৮০ শতাংশ রোগী গরিব। আমরা যদি গরিব রোগীর চিন্তা মাথায় রাখি। তাহলে কখনও রোগীর অভাব হবে না। আমরা যদি ভালো সেবা ও আউটকামের চিন্তা মাথায় রাখি, তাহলে রোগী দেখে কূল পাওয়া যাবে না।

আরও পড়ুনঃ  ‘রাজনীতি ছেড়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দিন’, সারজিস-পাটওয়ারীকে ফারুক হাসানের পাল্টা জবাব

দৈনিক মানবজীবন.কম:  তৃণমূল পর্যায়ে এখনও কিডনি বিশেষজ্ঞ নেই, এ বিষয়ে আপনার মতামত?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: এ ব্যাপারে সরকার ব্যাপক চিন্তা ভাবনা করছে। কিডনির ব্যাপারে সরকার অনেক আন্তরিক। অনেক ডায়ালাইসিস সেন্টার করার পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় যাতে ট্রান্সপ্যালান্ট হয়, সে ব্যাপারে আমাকেও মন্ত্রণালয় ডেকে ছিল। সরকারের আন্তরিকতা রয়েছে এবং চেষ্টা করছে। আমরা ধারণা এটা আরও বিস্তৃতি লাভ করবে। অনেক দিন জাতীয় কিডনি হাসপাতালে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট বন্ধ ছিল। সেখানে আমিও গিয়ে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে দিয়ে আসছি। ঢাকা মেডিকেলে রোযার আগে হয়তো কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। সিএমএইচে করে দিয়ে এসেছি। আবার খবর এসেছে, সেখানে তারা রোগী রেডি করছে। ঢাকার বাহিরে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয় না। যেসব রোগী ঢাকার ভিতরে বিভিন্ন সেন্টারে বিশেষ করে সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠানে হওয়া প্রয়োজন, তাদের চিকিৎসক নার্সরা এসে আমাদের এখানে ট্রেনিং করছে।

দৈনিক মানবজীবন.কম:  যারা মেডিকেল শিক্ষায় আসতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ জানতে চাই?

অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম: শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেডিকেল সম্পর্কে একটা বিরূপ ধারণা রয়েছে। অনেক পড়াশোনা করতে হয়। অনেক মুখস্ত করতে হয়। এ রকম একটি ধারণা রয়েছে। এটা ঠিক নয়। আসলে মোটা মোটা বই বটে, চিন্তা করে পড়লে বেশি সময় ধরে পড়া লাগে না।

মেডিকেল অঙ্গনে অনেক সময় শুনে শুনে পড়াশোনা করলেও আপনি পাস করে যাবেন। এতো বেশি কঠিন নয়, সামনেই আপনার যন্ত্র পড়ে আছে। মানুষই হলো আপনার যন্ত্র। এ যন্ত্রের মধ্যে নরমাল কি হচ্ছে, ফিজিক্যাল কি হচ্ছে, প্যাথলজিক্যাল কি হচ্ছে–এগুলো আপনার সামনে বসে বসে রোগীর দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু চিন্তা করতে পারবেন। শুধু চিন্তা করলেই প্রায় ৫০ শতাংশ পড়া হয়ে যায়। শিক্ষকরা যখন পড়াবেন, তখন মনোযোগ সহকারে পড়বেন। প্রতিদিন পড়বেন।

একজন চিকিৎসক যে সার্ভিসটা দিতে পারবেন, তা অন্য সার্ভিস থেকে অনেক বেশি। ধরেন, একজন চিকিৎসক, তার একজন আত্মীয়-স্বজনের স্বাস্থ্যগত সমস্যার খোঁজ-খবর নিলেন। সে যে কতটা খুশি হবে..! অন্য প্রফেশনে এ রকমটা করার সুযোগ নেই। বাসায় কেউ অসুস্থ হলে তাঁর জন্য যে সেবাটা দিতে পারবেন। অন্য কোনো সার্ভিস হলে সেটা দিতে পারবেন না।