আব্দুল্লাহ আল মামুন:
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সুযোগে অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো শিশু-কিশোরদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আকর্ষণীয় গ্রাফিক্স, অনলাইন গেমের প্রলোভন এবং অল্প সময়ে অর্থ উপার্জনের আশায় কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়ার ঝুঁকিতে। এর ফলে তাদের পড়াশোনা, মানসিক সুস্থতা, পারিবারিক সম্পর্ক ও আর্থিক নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
গেম থেকে জুয়ায় আসক্তির ঝুঁকি
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য ও অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, অনলাইন গেমের প্রতি আগ্রহ থেকে কিছু শিশু-কিশোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপে প্রচারিত বেটিং ও জুয়ার বিজ্ঞাপনের সংস্পর্শে আসছে। সহজে জেতার প্রলোভন দেখিয়ে এসব বিজ্ঞাপন তাদের আকৃষ্ট করতে পারে। তবে সব অনলাইন গেমই জুয়া নয়; অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরা কিংবা আর্থিক পুরস্কারের আশায় ঝুঁকি নেওয়ার বিষয়টি আলাদা।
শুরুতে অল্প অর্থ দিয়ে খেলা শুরু করলেও একপর্যায়ে কেউ কেউ বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে ফেলে। হারানো অর্থ ফেরত পাওয়ার আশায় বারবার বাজি ধরার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অভিভাবকের অজান্তে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
অভিভাবকদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো, কিছু শিশু পরিবারের অজান্তে বিকাশ, রকেট, নগদ কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের অর্থ অনলাইন জুয়ায় ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের জমানো টাকা কিংবা পড়াশোনার খরচ থেকেও অর্থ ব্যয়ের ঘটনা সামনে আসছে।
ঢাকার এক অভিভাবক নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “আমার ১২ বছরের ছেলে পড়াশোনার জন্য নেওয়া মোবাইলে গেম খেলতে খেলতে কখন যে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ে, বুঝতে পারিনি। হঠাৎ একদিন দেখি, আমার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে বড় অঙ্কের টাকা উধাও। জিজ্ঞাসা করতেই কান্নাকাটি করে আসল ঘটনা বলে।”
তিনি আরও জানান, ঘটনাটি জানার পর থেকে ছেলের মানসিক অবস্থা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
পরিবারের অজান্তে আর্থিক লেনদেনের এমন ঘটনা শিশুদের ডিজিটাল কার্যক্রমের ওপর অভিভাবকদের সচেতন নজরদারির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট জানান, তাঁর দোকানে প্রতিদিন শিশু-কিশোর ও তরুণদের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো এবং নগদায়নের জন্য আসতে দেখা যায়। তাঁদের কারও কারও লেনদেন অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে তাঁর সন্দেহ।
তিনি বলেন, “মাঝেমধ্যে অবাক হই, এত ছোট ছোট বাচ্চা এত টাকা পায় কোথায়! জিজ্ঞেস করলে কেউ বলে জমানো টাকা, কেউ বলে পড়াশোনার খরচ। বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক।”
তবে শুধু লেনদেনের ধরন দেখে কোনো অর্থ অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। এ ধরনের অভিযোগ যাচাই করতে লেনদেনের প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পরীক্ষা করা জরুরি।
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব
শিশু-কিশোরদের মধ্যে জুয়ায় আসক্তির প্রবণতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, মেজাজের পরিবর্তন, অর্থ হারানোর কারণে উদ্বেগ এবং পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে।
অনলাইন জুয়ায় বারবার অংশ নেওয়ার ফলে কিছু শিশু আর্থিক ক্ষতি সত্ত্বেও খেলা চালিয়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে তাদের বকাঝকা বা অপমান না করে সমস্যার কারণ বোঝা, মানসিক সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে শুধু অবাধ্যতা হিসেবে না দেখে তার পেছনে কোনো অনলাইন ঝুঁকি, মানসিক চাপ কিংবা অন্য সমস্যা রয়েছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তির সুযোগ, ঝুঁকি ও নজরদারি
প্রযুক্তি শিশুদের শেখা, বিনোদন ও যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন, অনিরাপদ অ্যাপ এবং অর্থ লেনদেনের সহজ ব্যবস্থা শিশুদের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অবৈধ জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ শনাক্ত করা, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিশুদের লক্ষ্য করে প্রচারিত ঝুঁকিপূর্ণ বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের অনলাইন জুয়া থেকে দূরে রাখতে করণীয়
১. প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার: শিশুদের ব্যবহৃত স্মার্টফোনে বয়সোপযোগী নিরাপত্তা সেটিংস চালু করা, অনুপযুক্ত ওয়েবসাইট সীমিত করা এবং অ্যাপ ডাউনলোডের ওপর অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ রাখা।
২. আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: বিকাশ, নগদ, রকেট ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পিন, ওটিপি এবং অন্যান্য গোপন তথ্য সুরক্ষিত রাখা। শিশুদের অনলাইন পেমেন্টের ঝুঁকি সম্পর্কে বোঝানো।
৩. বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা: শিশুদের অনলাইন কার্যক্রম, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মানসিক অবস্থার বিষয়ে নিয়মিত কথা বলা। সমস্যা ধরা পড়লে ভয় দেখানো বা অপমান না করে সমাধানের পথ খোঁজা।
৪. বিকল্প বিনোদনের সুযোগ তৈরি: খেলাধুলা, বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক কার্যক্রমে শিশুদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা। একই সঙ্গে বয়সোপযোগী ও নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা।
৫. সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন জুয়ার আর্থিক ও মানসিক ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা এবং শিশুদের প্রলোভনমূলক বিজ্ঞাপন চিনতে শেখানো।
৬. আইন প্রয়োগ ও অভিযোগের ব্যবস্থা: অবৈধ অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারী প্ল্যাটফর্ম এবং শিশুদের ঝুঁকির মুখে ফেলে এমন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনানুগ পদক্ষেপ নিশ্চিত করা।
শৈশব সুরক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি
শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সচেতনতা, পারিবারিক যোগাযোগ, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং কার্যকর নজরদারি। অনলাইন জুয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে শিশুদের বয়সোপযোগী শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সমস্যায় জড়িয়ে পড়া শিশুদের জন্য সহায়তামূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
শৈশব যেন অর্থের প্রলোভন ও অনলাইন জুয়ার ঝুঁকিতে বিপন্ন না হয়, সে জন্য অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও প্রশাসনকে একযোগে কাজ করতে হবে। সচেতনতা ও সময়মতো সহায়তার মাধ্যমেই শিশুদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
আব্দুল্লাহ আল মামুন
Reporter Name 





















