
সাহিত্য প্রতিবেদক :
“মানুষের উপর প্রভুত্ব কায়েম করা গণতন্ত্র নয় বরং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাই হচ্ছে গণতন্ত্র।”
কথাটি বলেছিলেন আমেরিকা ফাস্ট স্টেট সেক্রেটারি ও থার্ড প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন, আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের রচয়িতা ও সংবিধানের অন্যতম প্রথম সংশোধনী কারিগরও তিনিই ছিলেন।
তিনি এই দুই লাইনের বাক্যের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বলার প্রয়াস করেছিলেন, গণতন্ত্র হচ্ছে নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতীক। একজন ব্যক্তি মানুষ নিজের জীবনের যেকোন সিদ্ধান্ত যেভাবে নিজেই নেওয়ার অধিকার রাখে, ঠিক তেমনি একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের যেকোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলার অধিকারও তিনি রাখে। এটা নাগরিকত্বের অধিকার। যা প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল কাঠামোর প্রতীক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল শর্ত।
গণতন্ত্র, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সকল ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিক অধিকার প্রয়োগের চাবিকাঠি, ছয়টি অক্ষরের একটি শব্দ। যেখানে রাষ্ট্রকর্তারা নিশ্চিত করবে সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা, ভোটার অধিকার, পাঁচটি মৌলিক অধিকার। মানুষ বলবে, আওয়াজ তুলবে, ন্যায্য বিচার পাবে।
সর্বোপরি তারা তাদের রাষ্ট্রের জন্য সুযোগ্য নেতৃত্বে বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সরব অংশগ্রহণ করবে, সুশাসক প্রাপ্তির অধিকার ভোগ করতে নৈতিক দায়িত্ব পালন করবে এবং সেই দায়িত্ব নির্বিঘ্নে পালন করার নির্ভরতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। অথচ আমরা কী দেখি? কী দেখে বড় হয়েছি? আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কী পাবে?
১৯৭১ এ গোলামির জিঞ্জির ছিঁড়ে মুক্তি পাওয়া এই দেশমাতৃকার বুকে লম্বা সময় ধরে ছদ্য স্বাধীনতার বুলডোজার চালানো রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের কান্ডগুলো গবেষণা করলে সাধারন জনতার বুক ফুঁড়ে দীর্ঘ শ্বাস বৈ কিছুই বের হয় না।
প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একটা দিন আসে। যেদিনটাকে সাধারণ মুক্তিকামী মানুষ নতুন করে আশায় বুক বাঁধে। প্রত্যাশার ফাঁদে পড়ে বেছে নেয় পরের পাঁচ বছরের জন্য একজন হর্তাকর্তাকে, অতঃপর!
যুগের পর যুগ পেরিয়ে যায়। কিন্তু তাদের এহেন অভিভাবকত্বের ওয়াদা পূরণ হয় না। রাষ্ট্র তার যোগ্য শাসকের ছোঁয়া আজ অবধি পেল না। মানুষ তাদের পাঁচটি মৌলিক চাহিদা নির্ভেজাল, নিশ্চিন্তে উপভোগ করতে পারে না। এভাবেই চলছে নিকাহনামায়(ভোটার স্লিপে) সই করে পাঁচ বছর মেয়াদি কন্ট্রাক্ট দাম্পত্য! যাতে এক পক্ষ সব শুষে নেয় তো অপরপক্ষ আজীবন ভুক্তভোগী।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে গিয়েছে বিগত লীগ আমলের শাসনব্যবস্থা। ফ্যাসিস্ট সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে মানুষের সবকটি নাগরিক অধিকার পায়ে পিষে শ্বাসরোধ করে মারার সাক্ষী আপামর বাঙালি। যা প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের সহ্য ক্ষমতাকে লঘু করে তুলেছিল।
গণতন্ত্রের এহেন ভুমি ভূমিধস তামাশার আলোকে লেখা উপন্যাস ‘গণতন্ত্রের মঞ্চনাটক’! লেখিকা শেখ মরিয়ম বিবি রচিত এই বইটি ২০২৫ এর সেপ্টেম্বর মাসে স্বরবিন্দু প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়। এটাই এখন পর্যন্ত এই লেখিকার একমাত্র একক বই। তবে তিনি নিয়মিত ফেসবুকে লিখেন।
‘গণতন্ত্রের মঞ্চনাটক’ উপন্যাসের মূল থিম ফুটিয়ে তোলা চমৎকার প্রচ্ছদটি করেছেন প্রচ্ছদশিল্পী ফারিহা তাবাসসুম, নামলিপিতে আছেন শিল্পী ফারহান শিব্বির। স্বরবিন্দুর প্রকাশনার প্রকাশক ওমর ফারুক নিজের তত্ত্বাবধানে দারুন প্লটের এই উপন্যাসটি সর্বমহলের পাঠকের দ্বোরে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টায় সচেষ্ট।
বাংলা একাডেমি আয়োজিত আন্তর্জাতিক একুশে বইমেলা-২০২৬ এর ৪৪১ নং স্টল, স্বরবিন্দু প্রকাশনা সহ রকমারি ডটকম, হিলসা বইঘর এবং অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও এভেইলেবল পাওয়া যাচ্ছে বইটি। দু’টো খন্ডে প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রথম খন্ডটি ১৮০ পৃষ্ঠার, মূল্য মাত্র ৩০৯ টাকা।
বইটি পাঠক কেন পড়বে? জিজ্ঞেস করলে লেখিকা বললেন, “ সমকালীন রাজনীতি, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কিশোর সমাজকে অপব্যবহার করা, নেতাদের দ্বিচারিতা, হত্যা, গুম-খুন, নারী অধিকারের অপব্যবহার, বাকস্বাধীনতাকে খাঁচায় বন্দী রাখার নারকীয় চিত্রের মিশেলে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু মর্মান্তিক ঘটনার উল্লেখও পাঠক এই বইয়ে পাবে। যা তাদের মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলবে। সবকিছু তাদের জানা, শোনা! তবুও মনে হবে, কেন এমন হল?
এছাড়াও রয়েছে দুজোড়া মানব হৃদয়ের গল্প। যা পাঠকের মনেও দোল দিয়ে যাবে। জানান দিবে রাজনৈতিক নেতা মানেই রোবট নয়। তাদেরও মন আছে, আছে ভালোবাসার অনূভুতি। পরিবারের সঙ্গে তাদের শুধু স্বার্থের নয়। আত্নার সম্পর্কও থাকে। এছাড়াও রয়েছে পারিবারিক ও রাজনৈতিক কলহের শিকার কিশোরীর জীবনের গল্প।
সব কিছু মিলিয়ে বলা যায়, এটা একটা পরিপূর্ণ মসলাদার উপন্যাস। যা পড়ে পাঠক তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবে। এক বাক্যে বলে ফেলবে, পয়সা উসুল। ”
একজন নবীন লেখিকা হিসেবে পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলব, আপনারা দয়া করে মানসম্মত লেখার প্রতি সদয় হোন। সাহিত্য পাড়ায় আজকাল আহাজারি শোনা যায়, সাহিত্য পচেঁ গেছে। এতে করে নতুন পাঠক বাড়ছে না। তাই বলব, সাহিত্য বাঁচাতে ভালো কন্টেন্ট লেখা যেমন লেখকের দায়িত্ব, তেমনি ভালো লেখা পড়ে লেখকের অনুপ্রেরণা যোগান দেওয়াও আপনাদের দায়িত্ব। দয়া করে আপনার পাঠকগত দায়িত্ব পালন করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে সহযোগিতা করুন। ভালো লেখা পড়ে অনুগ্রহ করে একজন সুপাঠক হিসেবে নিজেকে এবং নিজের পরিচিতি সাহিত্য প্রেমিকে লেখকের অনুপ্রেরণা হিসেবে গড়ে তুলুন। একজন নব্য লেখক হিসেবে বলব, পাঠক বৈ আমরা কিছু না। আপনাদের জন্যই আমাদের লেখা। তাই পড়ার পর দু’টো বাক্য খরচ করে আপনার অনুভূতি জানালে আমরা উৎসাহ পাই, পরের পথটা গুছিয়ে চলতে পারি। আশাকরি পাঠকের ভালোবাসা আমাদের কলমকে তরান্বিত হতে সাহায্য করবে।
বইটা প্রকাশিত হবার পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঠকদের কাছে অন্যতম তৃপ্তিময় লেখনি বলে সমাদৃত হয়েছে। পড়ার পর অনেকেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে লেখকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে কিছু অনুভূতি বাক্য! তেমনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন মেধাবী ছাত্র শাহজাদা সাজ্জাদ, নিজের অনুভূতি জানিয়ে লিখেছেন,
‘ বান্ধবী শেখ মরিয়ম বিবির লেখা “গণতন্ত্রের মঞ্চনাটক” নামে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে গত সেপ্টেম্বরে। তখন পরীক্ষা চলমান থাকায় উপন্যাসটি পড়তে পারিনি। জানাতে পারিনি নিজের মতামতও। পরীক্ষা শেষ হবার পরে এটাই ছিল আমার প্রধান লক্ষ্য যে, বইটা পড়া শেষ করে একটা রিভিউ দিতে হবে।
যদিও আমি নিজে বই সম্পর্কে তেমন কিছু জানিনা, বুঝিওনা। তাছাড়া আমার ফেসবুক লিস্টে আমাকে যারা পড়াশোনা করিয়ে কলম ধরা ও লেখা শিখিয়েছেন, তারাও আছেন। তাদের সামনে আমি বইয়ের কি রিভিউ দেব সেটাই প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। তারপরও নিজের মতো চেষ্টা করছি।
প্রথম কথা “গণতন্ত্রের মঞ্চনাটক” এমন একটি উপন্যাস, যেখানে ব্যক্তিগত প্রেম, সামাজিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক ঘটনা একসাথে মিলেমিশে তৈরি করেছে একটি বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র। লেখিকা শেখ মরিয়ম বিবি তার উপন্যাসের নামটিও দিয়েছেন এমন কিছু যা দূর হতেই মানুষকে আকর্ষণ করতে বাধ্য করে।
তিনি শিরোনামেই একটি শক্তিশালী ধারণা ছুড়ে দিয়েছেন তার উপন্যাস সম্পর্কে। ‘গণতন্ত্র’ এখানে কেবল একটি ব্যবস্থা নয় বরং এটি আমাদের গতিশীল জীবনের এক চলন্ত ‘নাট্যমঞ্চ’। যেখানে প্রত্যেক চরিত্রই কোনো না কোনো ভূমিকায় অভিনয় করতে আবদ্ধ। সেই ভূমিকার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় তাদের স্বপ্ন, সংগ্রাম, ভয়, হতাশা এবং ভালোবাসা।
লেখিকা উপন্যাসের শুরুতেই পাঠকদেরকে নিয়ে গিয়েছেন এদেশীয় রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতায়। যেখানে নেতা নিজে মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতায় মানুষ মারা, দাঙ্গা হাঙ্গামার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে ভাষণ দেয়। অথচ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য নিজেই গোপনে মানুষ খুন করে।
রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান তারাজ ও আফনূর উপন্যাসের মূল চরিত্র হলেও আমাকে কেন জানি বারবার মুরাদ ছেলেটাই আকর্ষন করেছে। মুরাদ ছেলেটা তার বাল্যবন্ধু তারাজের পাশে ঢাল হয়ে থাকে সারাক্ষণ। বন্ধু তারাজের সামান্য অসুবিধে হলেও উৎকণ্ঠায় কুঁকড়ে যায় মুরাদ।
আইনজীবী আফনূর ও তারাজের সম্পর্কের রোমান্টিক আখ্যান গল্পকে কোমলতা দিয়েছে, যা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কঠোরতার বিপরীতে একটি সুন্দর ভারসাম্য সৃষ্টি করেছে পুরো উপন্যাস জুড়ে। উপন্যাসটিতে দেখা যায় প্রেম কেবল ব্যক্তিগত কোনো অনুভূতি নয়, এটি এক ধরনের আশ্রয়।
যে আশ্রয় একটা ভয়াবহ অতীত বয়ে বেড়ানো আফনূর পেয়েছে তারাজের কাছে। স্পষ্টভাষী তারাজ কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই আফনূরকে নিজের করে নিয়েছে। কঠোর মেজাজি ও ভারিক্কি চলনের মেয়ে আফনূরও বেরিয়ে যেতে পারনি তারাজের নাগপাশ থেকে। এটাই হয়তো ভালোবাসা।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র তারাজ যতটা স্পষ্টভাষী তার ছোট ভাই তাজিশ যেন ঠিক ততটাই লাজুক প্রকৃতির। চেয়েও অনেক কথা বলতে না পারা এই ছেলেটার মধ্যে সিরিয়াস লাইফে আমি আমার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই বইটির আরেকটি মূল স্তম্ভ। নির্বাচনী প্রক্রিয়া, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, মানুষ হত্যা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা সবকিছুই শেখ মরিয়ম বিবি বাস্তব দৃশ্যপটের মতো সাজিয়ে উপস্থাপন করেছেন।
লেখার ভাষা সহজ, সরল এবং অনেক ক্ষেত্রে রয়েছে মনোরম সুন্দর কিছু কাব্যিক লাইন, যা এই উপন্যাসটির আকর্ষণ বাড়িয়েছে বহু গুনে। আমার কাছে এই উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি সমসাময়িক ও বড্ড প্রাসঙ্গিক।
ক্ষেত্রবিশেষে আপনি এটার ভেতর জর্জ অরওয়েলের এনিমেল ফার্ম কিংবা এই জাতীয় কিছু উপন্যাসের মিল খুজে পেতে পারেন। রাজনৈতিক বাস্তবতা যেভাবে প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে, সেখানে উপন্যাসটির ঘটনাচক্রও চলমান পরিবর্তনের এক বাস্তব প্রতিফলন বলে মনে হবে।’
Reporter Name 




















