সাকিব আহসান, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি ঃ বাংলার গ্রামীণ জনজীবনে ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠান কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার পথ নয়, সামাজিক সংহতি ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রও। এরকম একটি অনন্য লোকাচার হলো বট–অশ্বত্থ গাছের “বিয়ে”। মন্ত্রোচ্চারণ, মালাবদল, সিঁদুরদান, ভোজ ও উৎসবমুখর সামাজিক আয়োজনের মাধ্যমে এই ‘গাছের গাছ বিয়ে’ একদিকে যেমন প্রাচীন শাস্ত্র–পুরাণের প্রতীকী ব্যাখ্যাকে ধারণ করে, অন্যদিকে আধুনিক যুগে পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষরোপণের বার্তাও বহন করছে।
উল্লেখিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো—ঐতিহাসিক উৎস কোথায়, গ্রামীণ সমাজে এর সাংস্কৃতিক-সামাজিক তাৎপর্য কী, এবং আজকের দিনে এর ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোতে পারে।
ঐতিহাসিক–ধর্মীয় প্রেক্ষাপট
ভারতীয় উপমহাদেশে বট ও অশ্বত্থ দু’টিই পবিত্র বৃক্ষ হিসেবে বিশেষভাবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
অশ্বত্থ (পিপল, Ficus religiosa): উপনিষদ ও গীতায় অশ্বত্থকে বিশ্বসৃষ্টির প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গীতায় কৃষ্ণ নিজেকে অশ্বত্থের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ধর্মীয় অভিধানে অশ্বত্থ বিষ্ণুর প্রতীক।
বট (Ficus benghalensis): অসংখ্য শাখা–প্রশাখা ও দীর্ঘজীবী স্বভাবের কারণে বটকে অমরত্ব, প্রাণশক্তি ও সৃষ্টিশীলতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। বহু প্রবাদে এটিকে শিব বা ত্রিমূর্তির রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পদ্মপুরাণে উল্লেখ আছে—অশ্বত্থ, বট ও পলাশ যথাক্রমে বিষ্ণু, রুদ্র ও ব্রহ্মার প্রতীক। ফলে লোকবিশ্বাসে এই গাছের যুগলতাকে দেব–দেবীর দাম্পত্য প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে।
লোকবিশ্বাস ও সামাজিক অর্থ
গ্রামবাংলায় প্রচলিত বিশ্বাস—বট–অশ্বত্থের বিয়ে দিলে গৃহে শান্তি, বংশবৃদ্ধি, দীর্ঘায়ু ও সমৃদ্ধির আশীর্বাদ মেলে। খরা বা অনাবৃষ্টির সময় বৃষ্টি কামনায়ও এই বিয়ে দেওয়া হয়। আধুনিক সময়ে অনেকে একে বৃক্ষরক্ষা আন্দোলন বা সবুজ সংরক্ষণের প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত করছেন।
রীতি–পদ্ধতি: “বিয়ে” কেমন করে হয়
-
পাত্র–পাত্রী নির্বাচন: কাছাকাছি জন্মানো বট ও অশ্বত্থকে ‘বর–কনে’ ধরা হয়।
-
আলংকার/পোশাক: বটকে বর ধরে ধুতি, অশ্বত্থকে কনে ধরে শাড়ির কাপড় পরানো হয়।
-
মন্ত্রোচ্চারণ–মালাবদল–সিঁদুরদান: পুরোহিত বৈদিক মন্ত্র পাঠ করেন।
-
প্রদক্ষিণ ও শপথ: গাছ ঘিরে প্রদক্ষিণ করে বৃক্ষরক্ষা ও চারা লাগানোর প্রতিজ্ঞা করা হয়।
-
ভোজ ও উৎসব: গান–বাদ্য, ভোজন ও মিলনমেলা সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়।
নৃতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক বিস্তার
শুধু বাংলায় নয়, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশসহ বহু অঞ্চলে গাছ–গাছের বিয়ে দেওয়ার নথি রয়েছে। নৃতত্ত্ববিদরা একে আচার–ভিত্তিক সংরক্ষণ চর্চা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
শাস্ত্র–পুরাণের প্রতীকী ব্যাখ্যা
অশ্বত্থকে বৌদ্ধধর্মে বোধিবৃক্ষ ধরা হয়। বটকে দীর্ঘজীবন ও উর্বরতার প্রতীক মনে করা হয়। বিবাহিতা নারীরা স্বামীর দীর্ঘায়ুর জন্য বটপূজা করেন। বট–অশ্বত্থ–পলাশ যথাক্রমে ব্রহ্মা–বিষ্ণু–শিবের প্রতীক হিসেবে পুরাণে বর্ণিত।
আধুনিক পুনর্নির্মাণঃ পরিবেশ ও গণসংস্কৃতি
-
খরাপ্রবণ এলাকায় বৃষ্টির কামনায় এই বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
-
পরিবেশ প্রচারণায় সবুজ সংরক্ষণের অংশ হিসেবে একে নতুনভাবে দেখা হচ্ছে।
-
শহর-গ্রামে গান-বাজনা, নিমন্ত্রণপত্র, ভোজ সহ আধুনিক আকারে রূপ নিচ্ছে।
পীরগঞ্জের উদাহরণ
পীরগঞ্জ উপজেলার ৮নং দৌলতপুর ইউনিয়নের পুরোহিত গণেশ্বর চক্রবর্তীর মতে, পিতা–পুরুষের সময় থেকে এই আচার চলে আসছে। আগে এটি দেবতার আশীর্বাদ কামনার উপায় ছিল, এখন মানুষ একে বৃক্ষরক্ষার প্রতিজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত করছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
-
চ্যালেঞ্জ: নগরায়ন, ধর্মীয় অনীহা ও তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহে এ চর্চা হারাতে পারে।
-
সম্ভাবনা: পরিবেশ আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোর সহায়তায় এটি নতুনভাবে বিকশিত হতে পারে।
অতএব, বট–অশ্বত্থ গাছের বিয়ে নিছক এক ‘অদ্ভুত’ প্রথা নয়। এর ভেতরে রয়েছে শাস্ত্র–পুরাণের প্রতীকী ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস ও সামাজিক সংহতি, গ্রামীণ জীবনের উৎসবমুখরতা এবং সমসাময়িক পরিবেশ আন্দোলনের প্রতীকী ভাষা।
সাকিব আহসান, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি 


















