
— মানিক লাল ঘোষ
২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মার তীরে এক শান্ত অথচ গৌরবময় বিপ্লব ঘটে গেল। বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। এই একটি মুহূর্তের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তিধর দেশের অভিজাত ক্লাবে নিজের নাম লেখাল। এটি কেবল একটি প্রকল্পের উদ্বোধন নয়, বরং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই রাজনৈতিক সাহসিকতার চূড়ান্ত বিজয়, যা একসময় প্রবল সমালোচনার মুখেও দমে যায়নি।
রূপপুর প্রকল্পের পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। এই মেগা প্রজেক্টের পরিকল্পনা যখন নেওয়া হয়, তখন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো একে “বিপজ্জনক” এবং “অর্থহীন” বলে আখ্যা দিয়েছিল। বিশেষ করে বিএনপি ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে ধেয়ে এসেছিল তীব্র সমালোচনার তির। বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা মোশাররফ হোসেন জোর গলায় বলেছিলেন, রামপাল-রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের স্বার্থবিরোধী। আরেক প্রভাবশালী নেতা ড. মঈন খান বলেছিলেন, ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন অপরিণামদর্শিতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। কিন্তু শেখ হাসিনা জানতেন, একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। আজ যখন সেই বিরোধী শিবিরের নেতারাই স্বীকার করছেন যে, এই প্রকল্প ২ কোটি মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাবে, তখন প্রমাণ হয়—রাজনীতি সাময়িক হতে পারে, কিন্তু সঠিক উন্নয়নের সিদ্ধান্ত চিরস্থায়ী।
১ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক বিনিয়োগ। রাশিয়ার রোসাটোম-এর কারিগরি সহায়তায় স্থাপিত এই কেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়েছে ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি, যা তৃতীয় প্রজন্মের সর্বাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসম্পন্ন। দুটি ইউনিটে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এই কেন্দ্রে রয়েছে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বড় কোনো দুর্ঘটনাতেও তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে বাধা দেয়। এই প্রকল্প থেকে আগামী ৬০ থেকে ৮০ বছর একটানা বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের তথ্যমতে, জ্বালানি লোডিংয়ের পর তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হবে এবং প্রাথমিক পর্যায়েই ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীতে জ্বালানি নিরাপত্তা আজ জাতীয় নিরাপত্তার সমার্থক। যখন বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী, যখন উন্নত বিশ্বও লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছে, তখন রূপপুর বাংলাদেশের জন্য এক রক্ষাকবচ। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে। যারা ঘনবসতিপূর্ণ দেশের দোহাই দিয়ে বিরোধিতা করেছিলেন, তারা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের মতো দেশগুলো পারমাণবিক শক্তির ওপর ভিত্তি করেই তাদের শিল্পায়ন বজায় রেখেছে। ফ্রান্স তাদের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ পায় এই পারমাণবিক উৎস থেকেই।
রাজনীতিবিদরা কেবল পরের নির্বাচনের কথা ভাবেন, কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক ভাবেন পরবর্তী প্রজন্মের কথা। শেখ হাসিনা রূপপুরের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন তিনি একজন সার্থক রাষ্ট্রনায়ক। আজ যখন রূপপুরের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম লোড হচ্ছে, তখন সেই বিরোধিতার ঝড় স্তিমিত হয়ে গেছে বাস্তবতার আলোর কাছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নয়; এটি একটি আত্মবিশ্বাসী জাতির প্রতীক। এটি প্রমাণ করে—সাহসী সিদ্ধান্ত ও দূরদর্শী নেতৃত্ব থাকলে সমস্ত বাধা ডিঙিয়ে অন্ধকার পেরিয়ে আলোর পথে যাত্রা করা সম্ভব। ইতিহাসের পাতায় শেখ হাসিনার এই সিদ্ধান্ত এক অনন্য মহাকাব্য হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে।
(লেখক: মানিক লাল ঘোষ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন—ডিইউজে)
Reporter Name 























