Dhaka ০২:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরনাম:
ছাত্রলীগের অপতৎপরতার প্রতিবাদে মেদুয়ারী ইউনিয়ন ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ দিনাজপুর বীরগঞ্জে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের ২৫০০ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী জয়নাল গ্রেফতার রাজারহাটে স্ত্রীর স্বীকৃতির দাবীতে মানববন্ধন নরসিংদী পুলিশ লাইন্সে মাসিক কল্যাণ সভা অনুষ্ঠিত, কর্ম মূল্যায়নের স্বীকৃতি স্বরূপ নগদ অর্থ, সম্মাননা ও সার্টিফিকেট বিতরন ঝিনাইদহে ৭০০ ফুটের সড়কে ৫০০ ফুটই কাদা: দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ চরম ভোগান্তিতে এলাকাবাসী নিউ আলিপুর থানা ও কেন্দ্র বাহিনী সহ – স্বরূপ বিশ্বাসের ফ্লাটে তল্লাশি নবীগঞ্জের এক প্রতারক ওসমানী নগরে গিয়ে  ডিপটিউবয়েল দেয়ার নামে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে পলায়ন! থানায় অভিযান দায়ের মায়ের মামলায় বাবা জেলে, খালি ঘরে মিলল ছেলের ঝুলন্ত মরদেহ রংপুর সদর উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরির উদ্বোধন আধুনিক কৃষি ও উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে গলাচিপায় ‘পার্টনার কংগ্রেস’ অনুষ্ঠিত
বিজ্ঞাপন :
জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় চীফ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। সম্পদক-ইমদাদুল হক তৈয়ব-01711576603, সিভি পাঠান এই ইমেইলে- editor.manobjibon@gmail.com

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ অপরিহার্য- লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

  • Reporter Name
  • সময়: ১২:৫১:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
  • ৭ Time View

 

সুষ্ঠু সড়ক ব্যবস্থা একটি দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও নাগরিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সড়কের ভূমিকা অপরিসীম। নিরাপদ ও সুষ্ঠু সড়ক ব্যবস্থা উন্নয়ন-অগ্রগতির চালিকাশক্তি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে সড়ক আজ অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।

প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ ঝরছে। কোনো পরিবার হারাচ্ছে তার একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে, কোনো মা হারাচ্ছেন সন্তানকে, কোনো শিশু হারাচ্ছে তার বাবা-মাকে। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই দুর্ঘটনার খবর। কখনও বাস খাদে পড়ে, কখনও মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, কখনও বেপরোয়া ট্রাকের চাপায়, আবার কখনও নিরাপদ পারাপারের অভাবে পথচারীর মৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশের সড়কগুলো যেন ধীরে ধীরে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটি হওয়া উচিত সড়ক নিরাপত্তা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু রাস্তা নির্মাণে বিনিয়োগ করব, নাকি মানুষের জীবন রক্ষায়ও বিনিয়োগ করব?

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করলে একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে আসে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৭,৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৩৫৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব আরও ভয়াবহ। তাদের মতে, ২০২৫ সালে সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ, যার বড় অংশই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কারণ দেশের অনেক দুর্ঘটনার তথ্য থানায় বা গণমাধ্যমে আসে না। গ্রামীণ এলাকার অসংখ্য দুর্ঘটনা আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১২ লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এবং পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ আহত বা পঙ্গুত্ববরণ করেন। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশও এই ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম।

আরও পড়ুনঃ  ঝালকাঠির রাজাপুরে আলহাজ্ব লালমোন হামিদ মহিলা কলেজের সড়ক বেহাল, সংস্কারের দাবি

বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি মোটরসাইকেল। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট সড়ক মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ঘটে। এর কারণ হচ্ছে সহজ কিস্তিতে মোটরসাইকেল কেনার সুযোগ বেড়েছে। অনেক চালক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া সড়কে নামছেন। লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যা এখনও উদ্বেগজনক। অতিরিক্ত গতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার বড় কারণ। মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আলাদা কর্মসূচি প্রয়োজন। কিন্তু এর জন্যও প্রয়োজন বাজেট।

অনেকে মনে করেন সড়ক নিরাপত্তায় ব্যয় করলে সরকারের খরচ বাড়বে। আসলে বিষয়টি ঠিক উল্টো। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, সম্পদের ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ব্যয় মিলিয়ে এই ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। যখন একজন দক্ষ কর্মী দুর্ঘটনায় নিহত হন, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং সড়ক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ ব্যয় নয়, বরং অর্থনৈতিক সুরক্ষা।

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জাতিসংঘ ঘোষিত সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আগামী কয়েক বছরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে যদি সড়ক নিরাপত্তার জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না করা হয়, তাহলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অন্যতম। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ ২০২১-২০৩০ সময়কালকে “ডিকেড অব অ্যাকশন ফর রোড সেফটি” হিসেবে ঘোষণা করেছে। লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা। বাংলাদেশও এই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ছাড়া কি এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব? উত্তর স্পষ্ট, সম্ভব নয়।

আরও পড়ুনঃ  শ্যামনগরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে পথসভা ও র‍্যালি অনুষ্ঠিত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক খাতের বিষয় নয়। এটি স্বাস্থ্য, পরিবহন, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা এবং স্থানীয় সরকারের সমন্বিত দায়িত্ব। WHO-এর ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুযায়ী মানুষ ভুল করবেই। তাই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষের ভুল প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় রূপ না নেয়। এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি পাঁচটি- নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ ব্যবহারকারী ও দুর্ঘটনা-পরবর্তী উন্নত সেবা। বাংলাদেশের বাজেট পরিকল্পনায় এই পাঁচটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

একসময় সুইডেনেও সড়ক দুর্ঘটনা ছিল বড় সমস্যা। ১৯৯৭ সালে দেশটি ‘ভিশন জিরো’ নীতি গ্রহণ করে। তাদের লক্ষ্য ছিল সড়কে কোনো মৃত্যুই গ্রহণযোগ্য নয়। এই নীতির আওতায় তারা শুধু চালকদের দায়ী করেনি, বরং পুরো সড়ক ব্যবস্থাকে নিরাপদ করার উদ্যোগ নেয়। ফলাফল হলো, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাগুলোর একটি সুইডেনের। নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করে সাফল্য পেয়েছে। তারা সড়ক নিরাপত্তাকে ব্যয় হিসেবে নয়, মানবসম্পদ রক্ষার বিনিয়োগ হিসেবে দেখেছে।

বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) দীর্ঘদিন ধরে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে নিসচাসহ সংগঠনগুলো সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, গণসচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ এবং নীতিগত সংস্কারের দাবিতে ভূমিকা রেখেছে। এই আন্দোলনগুলো দেখিয়েছে যে সড়ক নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবনের প্রশ্ন।

বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে সড়ক নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কাজ করে থাকে। কিন্তু একটি সমন্বিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা তহবিল নেই। ফলে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যায়। একটি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা তহবিল গঠন করা হলে সেখান থেকে অর্থায়ন করা যেতে পারে: দুর্ঘটনা গবেষণা ও ডেটাবেইস উন্নয়ন, স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি, চালক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আধুনিকায়ন, স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, মহাসড়কে জরুরি চিকিৎসা সেবা, পথচারী নিরাপত্তা অবকাঠামো, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান শনাক্ত ও সংস্কার, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক গণমাধ্যম প্রচারণা প্রভৃতি কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।

আরও পড়ুনঃ  নরসিংদীর পুলিশ সুপার লাইন্সে মাস্টার প্যারেড অনুষ্ঠিত

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) এবং হাইওয়ে পুলিশ সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু জনবল, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের কার্যক্রম প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না। ডিজিটাল লাইসেন্সিং, অনলাইন মনিটরিং, স্বয়ংক্রিয় ফিটনেস পরীক্ষাকেন্দ্র, আধুনিক ট্রাফিক নজরদারি এবং তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালুর জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। একইভাবে হাইওয়ে পুলিশের জন্য প্রয়োজন আধুনিক যানবাহন, স্পিড ডিটেকশন প্রযুক্তি, বডি ক্যামেরা এবং প্রশিক্ষিত জনবল। এই বিনিয়োগ ছাড়া দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন কঠিন।

অনেক সময় মনে করা হয়, উন্নয়ন প্রকল্পই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিরাপত্তা পরে দেখা যাবে। এই ধারণা ভুল। একটি মহাসড়ক তখনই সফল, যখন মানুষ সেখানে নিরাপদে চলাচল করতে পারে। একটি সেতু তখনই অর্থবহ, যখন সেটি জীবন রক্ষা করে। একটি উন্নয়ন প্রকল্প তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেখানে নিরাপত্তা পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকে। অতএব ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সড়ক নিরাপত্তার জন্য আলাদা, দৃশ্যমান ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা উন্নয়নের পরিপন্থী নয়, বরং উন্নয়নকে অর্থবহ ও মানবিক করার পূর্বশর্ত।

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্র কতটুকু বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত? বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তার তুলনায় সড়ক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ অত্যন্…

Tag :
জনপ্রিয় নিউজ

ছাত্রলীগের অপতৎপরতার প্রতিবাদে মেদুয়ারী ইউনিয়ন ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ অপরিহার্য- লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

সময়: ১২:৫১:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

 

সুষ্ঠু সড়ক ব্যবস্থা একটি দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও নাগরিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সড়কের ভূমিকা অপরিসীম। নিরাপদ ও সুষ্ঠু সড়ক ব্যবস্থা উন্নয়ন-অগ্রগতির চালিকাশক্তি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে সড়ক আজ অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।

প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ ঝরছে। কোনো পরিবার হারাচ্ছে তার একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে, কোনো মা হারাচ্ছেন সন্তানকে, কোনো শিশু হারাচ্ছে তার বাবা-মাকে। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই দুর্ঘটনার খবর। কখনও বাস খাদে পড়ে, কখনও মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, কখনও বেপরোয়া ট্রাকের চাপায়, আবার কখনও নিরাপদ পারাপারের অভাবে পথচারীর মৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশের সড়কগুলো যেন ধীরে ধীরে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটি হওয়া উচিত সড়ক নিরাপত্তা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু রাস্তা নির্মাণে বিনিয়োগ করব, নাকি মানুষের জীবন রক্ষায়ও বিনিয়োগ করব?

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করলে একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে আসে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৭,৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৩৫৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব আরও ভয়াবহ। তাদের মতে, ২০২৫ সালে সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ, যার বড় অংশই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কারণ দেশের অনেক দুর্ঘটনার তথ্য থানায় বা গণমাধ্যমে আসে না। গ্রামীণ এলাকার অসংখ্য দুর্ঘটনা আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১২ লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এবং পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ আহত বা পঙ্গুত্ববরণ করেন। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশও এই ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম।

আরও পড়ুনঃ  নরসিংদীর পুলিশ সুপার লাইন্সে মাস্টার প্যারেড অনুষ্ঠিত

বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি মোটরসাইকেল। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট সড়ক মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ঘটে। এর কারণ হচ্ছে সহজ কিস্তিতে মোটরসাইকেল কেনার সুযোগ বেড়েছে। অনেক চালক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া সড়কে নামছেন। লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যা এখনও উদ্বেগজনক। অতিরিক্ত গতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার বড় কারণ। মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আলাদা কর্মসূচি প্রয়োজন। কিন্তু এর জন্যও প্রয়োজন বাজেট।

অনেকে মনে করেন সড়ক নিরাপত্তায় ব্যয় করলে সরকারের খরচ বাড়বে। আসলে বিষয়টি ঠিক উল্টো। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, সম্পদের ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ব্যয় মিলিয়ে এই ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। যখন একজন দক্ষ কর্মী দুর্ঘটনায় নিহত হন, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং সড়ক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ ব্যয় নয়, বরং অর্থনৈতিক সুরক্ষা।

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জাতিসংঘ ঘোষিত সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আগামী কয়েক বছরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে যদি সড়ক নিরাপত্তার জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না করা হয়, তাহলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অন্যতম। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ ২০২১-২০৩০ সময়কালকে “ডিকেড অব অ্যাকশন ফর রোড সেফটি” হিসেবে ঘোষণা করেছে। লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা। বাংলাদেশও এই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ছাড়া কি এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব? উত্তর স্পষ্ট, সম্ভব নয়।

আরও পড়ুনঃ  শ্যামনগরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে পথসভা ও র‍্যালি অনুষ্ঠিত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক খাতের বিষয় নয়। এটি স্বাস্থ্য, পরিবহন, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা এবং স্থানীয় সরকারের সমন্বিত দায়িত্ব। WHO-এর ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুযায়ী মানুষ ভুল করবেই। তাই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষের ভুল প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় রূপ না নেয়। এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি পাঁচটি- নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ ব্যবহারকারী ও দুর্ঘটনা-পরবর্তী উন্নত সেবা। বাংলাদেশের বাজেট পরিকল্পনায় এই পাঁচটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

একসময় সুইডেনেও সড়ক দুর্ঘটনা ছিল বড় সমস্যা। ১৯৯৭ সালে দেশটি ‘ভিশন জিরো’ নীতি গ্রহণ করে। তাদের লক্ষ্য ছিল সড়কে কোনো মৃত্যুই গ্রহণযোগ্য নয়। এই নীতির আওতায় তারা শুধু চালকদের দায়ী করেনি, বরং পুরো সড়ক ব্যবস্থাকে নিরাপদ করার উদ্যোগ নেয়। ফলাফল হলো, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাগুলোর একটি সুইডেনের। নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করে সাফল্য পেয়েছে। তারা সড়ক নিরাপত্তাকে ব্যয় হিসেবে নয়, মানবসম্পদ রক্ষার বিনিয়োগ হিসেবে দেখেছে।

বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) দীর্ঘদিন ধরে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে নিসচাসহ সংগঠনগুলো সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, গণসচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ এবং নীতিগত সংস্কারের দাবিতে ভূমিকা রেখেছে। এই আন্দোলনগুলো দেখিয়েছে যে সড়ক নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবনের প্রশ্ন।

বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে সড়ক নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কাজ করে থাকে। কিন্তু একটি সমন্বিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা তহবিল নেই। ফলে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যায়। একটি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা তহবিল গঠন করা হলে সেখান থেকে অর্থায়ন করা যেতে পারে: দুর্ঘটনা গবেষণা ও ডেটাবেইস উন্নয়ন, স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি, চালক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আধুনিকায়ন, স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, মহাসড়কে জরুরি চিকিৎসা সেবা, পথচারী নিরাপত্তা অবকাঠামো, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান শনাক্ত ও সংস্কার, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক গণমাধ্যম প্রচারণা প্রভৃতি কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।

আরও পড়ুনঃ  বিশ্বম্ভরপুরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ (World Environment Day - 2026) উদযাপন

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) এবং হাইওয়ে পুলিশ সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু জনবল, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের কার্যক্রম প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না। ডিজিটাল লাইসেন্সিং, অনলাইন মনিটরিং, স্বয়ংক্রিয় ফিটনেস পরীক্ষাকেন্দ্র, আধুনিক ট্রাফিক নজরদারি এবং তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালুর জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। একইভাবে হাইওয়ে পুলিশের জন্য প্রয়োজন আধুনিক যানবাহন, স্পিড ডিটেকশন প্রযুক্তি, বডি ক্যামেরা এবং প্রশিক্ষিত জনবল। এই বিনিয়োগ ছাড়া দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন কঠিন।

অনেক সময় মনে করা হয়, উন্নয়ন প্রকল্পই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিরাপত্তা পরে দেখা যাবে। এই ধারণা ভুল। একটি মহাসড়ক তখনই সফল, যখন মানুষ সেখানে নিরাপদে চলাচল করতে পারে। একটি সেতু তখনই অর্থবহ, যখন সেটি জীবন রক্ষা করে। একটি উন্নয়ন প্রকল্প তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেখানে নিরাপত্তা পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকে। অতএব ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সড়ক নিরাপত্তার জন্য আলাদা, দৃশ্যমান ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা উন্নয়নের পরিপন্থী নয়, বরং উন্নয়নকে অর্থবহ ও মানবিক করার পূর্বশর্ত।

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্র কতটুকু বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত? বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তার তুলনায় সড়ক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ অত্যন্…