
হাসিনুজ্জামান মিন্টু,হরিপুর, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্তবর্তী উপজেলা হরিপুরের মানুষের একমাত্র চিকিৎসা নির্ভরতা ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’। কিন্তু বর্তমানে এই হাসপাতালটি চিকিৎসাসেবার চেয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এখন প্রহসনে রূপ নিয়েছে। ডাক্তার-কর্মচারীদের একাংশ অনিয়মিত, ওষুধের অভাব চরমে, গরিব রোগীদের সঙ্গে চলছে প্রতারণা। স্থানীয়দের অভিযোগ— “হাসপাতাল নয়, এখন এটি অত্যাচারখানা।”
দুদকের অভিযানের পরও অনুপস্থিত কর্মকর্তাদুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানের পর থেকে নিয়মিতভাবে অফিসে দেখা যায় না উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শামীমুজ্জামানকে। তার অনুপস্থিতিতে হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক জানান, হাসপাতালে চলমান অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁরা ঠাকুরগাঁও জেলা সিভিল সার্জনের বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে প্রশাসনিক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো নেওয়া হয়নি। বরং অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা আরও বেড়েছে।
দুর্নীতির পাহাড়: ৬৯ লাখ টাকার ওষুধের হিসাব নেই । জানা গেছে, ২০২৩–২০২৪ এবং ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরের টেন্ডারের (MSR) মাধ্যমে বরাদ্দ পাওয়া ৬৯ লাখ টাকার ওষুধ ও অন্যান্য মালামাল সঠিকভাবে গ্রহণ না করেই টাকার ভাগ-বণ্টনের অভিযোগ উঠেছে ডা. শামীমুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
এই সংবাদের ভিত্তিতে ঠাকুরগাঁও দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযান পরিচালনা করেছে।দুদকের ঠাকুরগাঁও সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক আজমির শরিফ মারজি বলেন,“আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তাধীন, বিস্তারিত জানতে আরও কিছু সময় লাগবে।”
এছাড়া, ২০২৩ সালে সরকারি বরাদ্দে প্রজেক্টর না কিনে এক লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগও পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে।ওষুধের সংকট ও মাদকাসক্তদের আড্ডাসরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, হাসপাতালের স্টোরে প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্রু সংকট, এমনকি রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত ওরস্যালাইনও মজুদ নেই।
সম্প্রতি দৈনিক কালবেলা পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হাসপাতাল প্রাঙ্গণের একটি নার্সারিতে মাদকসেবীদের আড্ডা দেওয়ার তথ্য প্রকাশ পায়। তবে সেই অভিযোগেও নেওয়া হয়নি কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
চাকরিতে ঘুষ ও অবৈধ নিয়োগের অভিযোগ অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের আয়া পদে কর্মরত মোছাঃ সুরাইয়া বেগমের পরিবর্তে ঘুষের বিনিময়ে ২০২৩ সাল থেকে শান্তি বেগম নামে এক নারী কাজ করছেন। এমনকি হাজিরা মেশিনে সুরাইয়া বেগমের নামেই স্বাক্ষর করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।
স্থানীয় সাংবাদিকরা এই বিষয়ে ডা. শামীমুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাক্ষাৎ দেননি। পরে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করলেও, ডাকঘর পিয়ন জানান— কর্মকর্তা আবেদন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে চিঠি ফেরত দেন।
প্রশাসনের বক্তব্য ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা. আনিছুর রহমান বলেন,“বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত আছি। বর্তমানে টাইফয়েড ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন চলছে, সম্ভবত ডা. শামীমুজ্জামান মনিটরিংয়ের কাজে ব্যস্ত। তবে তিনি যদি তথ্য অধিকার আইনের আবেদন গ্রহণ না করে থাকেন, তাহলে সেটি আমার বরাবর পাঠাতে পারেন, আমি ফরওয়ার্ড করে দেব।”
তিনি আরও জানান, হাসপাতালের অভিযোগগুলো নিয়ে দুদক ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে।জনগণের ক্ষোভ ও দাবি,হরিপুরের সাধারণ মানুষ বলছেন, সীমান্ত অঞ্চলের এই হাসপাতালটিই তাঁদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু এখানেও যদি দুর্নীতি ও অবহেলা চলে, তাহলে গরিব মানুষের চিকিৎসা কোথায় হবে?
স্থানীয়রা দ্রুত কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও দায়ীদের শাস্তি দাবি করেছেন।
হাসিনুজ্জামান মিন্টু,হরিপুর, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি 






















