Dhaka ০৯:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরনাম:
দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নারী স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত আরকান বা নামাজের ছেফত ছয়টি চরভদ্রাসনে ১০৫ পিস ইয়াবাসহ নারী আটক চরভদ্রাসনে মাদকবিরোধী অভিযানে যুবকের ৬ মাসের কারাদণ্ড মূল্যবৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে জনগণ দিশেহারা: বিএসপি পঞ্চগড়ে ওলামা দলের ভিডিও-ছবি জামায়াতের নামে প্রচার, ছাত্রদলের ৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ টেকনাফে পুলিশের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাংবাদিকের জমি দখলের অভিযোগ নবীনগরের বিদ্যাকুটে নিখোঁজের ২ দিন পর ঝোপঝাড়ে মিলল মাদ্রাসাছাত্রীর অর্ধগলিত লাশ ডিমলায় গ্রাহককে পিটালেন আলম ফিলিং স্টেশনের মালিক চন্দনাইশ পৌরসভার খসড়া মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন কর্মশালা অনুষ্ঠিত
বিজ্ঞাপন :
জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় চীফ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন । সম্পদক-ইমদাদুল হক তৈয়ব-01711576603, সিভি পাঠান এই ইমেইলে- editor.manobjibon@gmail.com

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. ইলম, তালীম ও জনপরিসরের এক দীর্ঘ অধ্যায়

  • Reporter Name
  • সময়: ১০:৫৬:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩২ Time View

 

মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক,


কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া প্রভাব সহজে চলে যায় না। কোনো কোনো আলেমের জীবন কেবল একটি ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি নয়; বরং তা হয়ে ওঠে একটি শিক্ষাধারার ইতিহাস, একটি প্রজন্মের স্মৃতি এবং একটি সময়ের সামাজিক-ধর্মীয় গতিপথের অংশ। শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. ছিলেন তেমনই এক আলোচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবনকে শুধু একজন মাদ্রাসাশিক্ষকের জীবনী দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না; আবার কেবল একটি রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যেও তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। ইলম, তালীম, তাযকিয়া, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা এবং জনপরিসরে ধর্মীয় নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধর্মীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর ইন্তেকাল হয়। সমসাময়িক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল শতাধিক বছর। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক প্রকাশ করেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীও তাঁর ইন্তেকালে শোকবার্তা দেন এবং দেশে ইসলামী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করেন।

একজন প্রবীণ আলেমের বিদায় ছিল সেটি; কিন্তু একই সঙ্গে ছিল একটি দীর্ঘ ইলমি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি।

শৈশব থেকে ইলমের পথে

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশোরে তিনি স্থানীয় মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণের পর হাটহাজারী মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন এবং সেখানে কয়েক বছর অধ্যয়ন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের এই পর্ব পরবর্তী কর্মজীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

দারুল উলুম দেওবন্দ উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানকার শিক্ষাধারা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. তাঁর কর্মজীবনকে দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেন। হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর দীর্ঘ তালীমি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২০ সালে ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় এ দায়িত্বে ছিলেন।

একজন শিক্ষক যখন শুধু পাঠ্যবই পড়ান, তখন তিনি একজন শিক্ষক। কিন্তু যখন তাঁর শিক্ষা বহু মানুষের জীবন, চিন্তা ও কর্মকে প্রভাবিত করে, তখন তাঁর শিক্ষাদান ব্যক্তিগত পরিসর অতিক্রম করে প্রজন্মের সম্পদে পরিণত হয়। আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর দীর্ঘ শিক্ষকতা ও তালীমি জীবনকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই মূল্যায়ন করা যায়।

ইলমের মর্যাদা ও আলেমের দায়িত্ব

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা জানে এবং যারা জানে না—তারা কি সমান?’ (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৯)

আরও পড়ুনঃ  বুড়িচং প্রেসক্লাবের নবনির্বাচিত কমিটিকে শিক্ষাশক্তি ঐক্য পরিষদের ফুলেল শুভেচ্ছা

আর অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা উন্নত করবেন।’ (সূরা আল-মুজাদালাহ, ৫৮:১১)

ইসলামের দৃষ্টিতে ইলম কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়; ইলম মানুষের চরিত্র নির্মাণ করে, দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে এবং আল্লাহভীতির দিকে পরিচালিত করে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৬৪১)

এই উত্তরাধিকার সম্পদের নয়; জ্ঞান, দাওয়াত, আমল, চরিত্র ও মানুষের হিদায়াতের উত্তরাধিকার।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর জীবনকে তাঁর অনুসারী ও শিক্ষার্থীরা মূলত এই তালীমি উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন। হাটহাজারী মাদ্রাসায় তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাঁকে কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনে একটি সুপরিচিত মুরব্বি-চরিত্রে পরিণত করে।

হাটহাজারী: দীর্ঘ তালীমি জীবনের কেন্দ্র

হাটহাজারীর আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম শুধু একটি মাদ্রাসা নয়; বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. দীর্ঘকাল এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, মুরব্বি ও মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করত।

তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর কাছে পড়াশোনা করা বহু আলেম পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদ্রাসা, মসজিদ, মক্তব ও দাওয়াতি কার্যক্রমে যুক্ত হন। এভাবে একজন শিক্ষকের প্রভাব তাঁর নিজের জীবনকাল অতিক্রম করে ছাত্রদের মাধ্যমে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

এ কারণেই কোনো আলেমের মূল্যায়নে তাঁর বক্তৃতা বা রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি তাঁর শিক্ষকতা, ছাত্রগঠন এবং প্রতিষ্ঠান নির্মাণের অবদানও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

একটি নতুন অধ্যায়: হেফাজতে ইসলাম

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা। ২০১০ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি এর আমির হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হেফাজতে ইসলাম ধর্মীয় মূল্যবোধ, ইসলামের অবমাননা এবং বিভিন্ন সামাজিক-নৈতিক প্রশ্নকে সামনে রেখে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনটি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আল্লামা শাহ আহমদ শফী তখন সংগঠনটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ছিলেন।

তাঁর সমর্থকদের কাছে এটি ছিল ঈমান-আকিদা ও ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষার আন্দোলন; অন্যদিকে সমসাময়িক সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে ওই আন্দোলনের কিছু কর্মসূচি, বক্তব্য এবং পদ্ধতি নিয়ে কঠোর সমালোচনাও প্রকাশিত হয়। তাই ২০১৩ সালের ঘটনাকে বুঝতে হলে সমর্থকদের ব্যাখ্যা এবং সমালোচকদের বক্তব্য—দুই দিকই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

৫ মে ২০১৩: শাপলা চত্বরের অধ্যায়

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে বড় সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। ঘটনাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত একটি অধ্যায়।

আরও পড়ুনঃ  আইফোন ছিনতাইয়ের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা, ৪ আসামির স্বীকারোক্তি

সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের খবর প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে হতাহতের সংখ্যা ও ঘটনার বিভিন্ন বিবরণ নিয়ে নানা দাবি ও মতভেদ তৈরি হয়। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ও সম্পদহানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে আল্লামা শাহ আহমদ শফী নিজে হেফাজতের বিরুদ্ধে সহিংসতার কিছু অভিযোগ অস্বীকার করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেছিলেন।

অতএব ইতিহাসের এই অধ্যায়কে শুধু আবেগের ভাষায় নয়, বরং প্রামাণ্য নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, সংবাদ প্রতিবেদন ও পরবর্তী গবেষণার আলোকে বিচার করা প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার মানে শুধু নিজের পছন্দের বর্ণনাটি তুলে ধরা নয়; বরং ঘটনাটির বিভিন্ন দিক সংরক্ষণ করা।

কওমি মাদ্রাসা ও দ্বীনি শিক্ষার প্রশ্ন

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ছিল কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার একজন প্রবীণ অভিভাবক হিসেবে তাঁর ভূমিকা। তিনি বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে স্বতন্ত্র ধারায় পরিচালিত হয়ে আসছিল। এই শিক্ষাধারার স্বাতন্ত্র্য, পাঠক্রম, সনদ এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলেছে। আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. এই অঙ্গনের অন্যতম প্রভাবশালী প্রবীণ আলেম হিসেবে এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর ইন্তেকালের পরও কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় একজন শিক্ষক, মুরব্বি ও দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে।

মানুষের হৃদয়ে একজন মুরব্বি

একজন আলেমের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর বইয়ের তাক নয়; মানুষের হৃদয়ে তাঁর জায়গা।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-কে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও অনুসারীদের একটি অংশ ‘বড় হুজুর’ নামে শ্রদ্ধা করত। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁকে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার একজন শীর্ষস্থানীয় অভিভাবক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ২০২০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

জানাজার সেই জনসমুদ্র ছিল তাঁর প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও আবেগের দৃশ্যমান প্রকাশ।

শেষ অধ্যায়ের নীরবতা

মানুষ যত বড়ই হোক, জীবনের শেষ অধ্যায় তাকে নীরবতার কাছেই ফিরিয়ে নেয়।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হাটহাজারী মাদ্রাসাকে ঘিরে ছাত্রদের আন্দোলন ও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনার পর আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. মহাপরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এর পরপরই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তিনি ইন্তেকাল করেন।

আরও পড়ুনঃ  কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে চন্দ্রিমা থানায় এলাকাবাসীর স্মারকলিপি

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি যে প্রতিষ্ঠানকে কয়েক দশক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সেখানকার দায়িত্ব থেকে বিদায় নেন। কিন্তু একজন মানুষের পদ শেষ হয়ে যেতে পারে; তাঁর জীবনকর্মের প্রভাব এত সহজে শেষ হয় না।

রেখে যাওয়া প্রশ্ন, রেখে যাওয়া শিক্ষা

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর জীবন আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়।

একজন আলেমের দায়িত্ব কি শুধু মাদ্রাসার চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে?

ইলম কি সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্নে কোনো ভূমিকা রাখবে না?

দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বের সম্পর্ক কী?

আবার একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ—ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার আন্দোলন কীভাবে ন্যায়, শৃঙ্খলা, মানুষের অধিকার ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়; কুরআন-সুন্নাহ, ইসলামী নৈতিকতা, ইতিহাস এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে খুঁজতে হবে।

কারণ ইসলাম সত্যের সঙ্গে ন্যায়বিচারকেও অপরিহার্য করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে।’ (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৮)

এই আয়াত শুধু বিরোধীর প্রতি ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয় না; নিজের প্রিয় ব্যক্তিত্বের মূল্যায়নেও ন্যায়পরায়ণতার শিক্ষা দেয়।

একটি যুগের স্মৃতি

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর জীবনকে এক বাক্যে আবদ্ধ করা কঠিন। তিনি ছিলেন শিক্ষক; ছিলেন দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানপ্রধান; ছিলেন কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনের প্রবীণ মুরব্বি; ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির; এবং ২০১৩ সালের পর বাংলাদেশের ধর্মীয়-সামাজিক জনপরিসরে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও আলোচিত একটি চরিত্র।

তাঁকে ঘিরে যেমন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে, তেমনি তাঁর কিছু বক্তব্য, রাজনৈতিক-সামাজিক ভূমিকা এবং ২০১৩ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে বোঝার জন্য এই দুই বাস্তবতাকেই স্বীকার করতে হয়। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা যেন ইতিহাসের প্রশ্নকে আড়াল না করে; আবার সমালোচনা যেন তাঁর দীর্ঘ তালীমি জীবন ও শিক্ষাগত অবদানকে অস্বীকার না করে।

সময়ের স্রোত মানুষকে নিয়ে যায়, কিন্তু মানুষের রেখে যাওয়া শিক্ষা থেকে যায়।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. চলে গেছেন। হাটহাজারীর সেই দীর্ঘ তালীমি অধ্যায় তাঁর জীবনের সঙ্গে সমাপ্ত হয়নি; তাঁর ছাত্র, প্রতিষ্ঠান ও উত্তরসূরিদের মাধ্যমে তার নানা ধারা এখনো প্রবাহিত।

আজ তাঁর ইন্তেকালের স্মরণে তাই শুধু শোক নয়—প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, ইলমের প্রতি প্রত্যাবর্তন এবং দ্বীনি নেতৃত্বের দায়িত্ব নতুন করে বোঝা।

আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনি খেদমতগুলো কবুল করুন, ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, কবরকে নূরে ভরপুর করুন এবং জান্নাতুল ফেরদাউসে মর্যাদাপূর্ণ স্থান দান করুন।

আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু। আমিন।

মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক
লেখক, প্রাবন্ধিক ও ইসলামি গবেষক
সহ সুপার, আল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা
পশ্চিম দৌলতপুর, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী

Tag :
জনপ্রিয় নিউজ

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নারী স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. ইলম, তালীম ও জনপরিসরের এক দীর্ঘ অধ্যায়

সময়: ১০:৫৬:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক,


কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া প্রভাব সহজে চলে যায় না। কোনো কোনো আলেমের জীবন কেবল একটি ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি নয়; বরং তা হয়ে ওঠে একটি শিক্ষাধারার ইতিহাস, একটি প্রজন্মের স্মৃতি এবং একটি সময়ের সামাজিক-ধর্মীয় গতিপথের অংশ। শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. ছিলেন তেমনই এক আলোচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবনকে শুধু একজন মাদ্রাসাশিক্ষকের জীবনী দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না; আবার কেবল একটি রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যেও তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। ইলম, তালীম, তাযকিয়া, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা এবং জনপরিসরে ধর্মীয় নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধর্মীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর ইন্তেকাল হয়। সমসাময়িক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল শতাধিক বছর। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক প্রকাশ করেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীও তাঁর ইন্তেকালে শোকবার্তা দেন এবং দেশে ইসলামী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করেন।

একজন প্রবীণ আলেমের বিদায় ছিল সেটি; কিন্তু একই সঙ্গে ছিল একটি দীর্ঘ ইলমি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি।

শৈশব থেকে ইলমের পথে

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশোরে তিনি স্থানীয় মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণের পর হাটহাজারী মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন এবং সেখানে কয়েক বছর অধ্যয়ন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের এই পর্ব পরবর্তী কর্মজীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

দারুল উলুম দেওবন্দ উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানকার শিক্ষাধারা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. তাঁর কর্মজীবনকে দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেন। হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর দীর্ঘ তালীমি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২০ সালে ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় এ দায়িত্বে ছিলেন।

একজন শিক্ষক যখন শুধু পাঠ্যবই পড়ান, তখন তিনি একজন শিক্ষক। কিন্তু যখন তাঁর শিক্ষা বহু মানুষের জীবন, চিন্তা ও কর্মকে প্রভাবিত করে, তখন তাঁর শিক্ষাদান ব্যক্তিগত পরিসর অতিক্রম করে প্রজন্মের সম্পদে পরিণত হয়। আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর দীর্ঘ শিক্ষকতা ও তালীমি জীবনকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই মূল্যায়ন করা যায়।

ইলমের মর্যাদা ও আলেমের দায়িত্ব

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা জানে এবং যারা জানে না—তারা কি সমান?’ (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৯)

আরও পড়ুনঃ  কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে চন্দ্রিমা থানায় এলাকাবাসীর স্মারকলিপি

আর অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা উন্নত করবেন।’ (সূরা আল-মুজাদালাহ, ৫৮:১১)

ইসলামের দৃষ্টিতে ইলম কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়; ইলম মানুষের চরিত্র নির্মাণ করে, দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে এবং আল্লাহভীতির দিকে পরিচালিত করে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৬৪১)

এই উত্তরাধিকার সম্পদের নয়; জ্ঞান, দাওয়াত, আমল, চরিত্র ও মানুষের হিদায়াতের উত্তরাধিকার।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর জীবনকে তাঁর অনুসারী ও শিক্ষার্থীরা মূলত এই তালীমি উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন। হাটহাজারী মাদ্রাসায় তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাঁকে কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনে একটি সুপরিচিত মুরব্বি-চরিত্রে পরিণত করে।

হাটহাজারী: দীর্ঘ তালীমি জীবনের কেন্দ্র

হাটহাজারীর আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম শুধু একটি মাদ্রাসা নয়; বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. দীর্ঘকাল এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, মুরব্বি ও মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করত।

তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর কাছে পড়াশোনা করা বহু আলেম পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদ্রাসা, মসজিদ, মক্তব ও দাওয়াতি কার্যক্রমে যুক্ত হন। এভাবে একজন শিক্ষকের প্রভাব তাঁর নিজের জীবনকাল অতিক্রম করে ছাত্রদের মাধ্যমে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

এ কারণেই কোনো আলেমের মূল্যায়নে তাঁর বক্তৃতা বা রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি তাঁর শিক্ষকতা, ছাত্রগঠন এবং প্রতিষ্ঠান নির্মাণের অবদানও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

একটি নতুন অধ্যায়: হেফাজতে ইসলাম

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা। ২০১০ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি এর আমির হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হেফাজতে ইসলাম ধর্মীয় মূল্যবোধ, ইসলামের অবমাননা এবং বিভিন্ন সামাজিক-নৈতিক প্রশ্নকে সামনে রেখে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনটি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আল্লামা শাহ আহমদ শফী তখন সংগঠনটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ছিলেন।

তাঁর সমর্থকদের কাছে এটি ছিল ঈমান-আকিদা ও ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষার আন্দোলন; অন্যদিকে সমসাময়িক সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে ওই আন্দোলনের কিছু কর্মসূচি, বক্তব্য এবং পদ্ধতি নিয়ে কঠোর সমালোচনাও প্রকাশিত হয়। তাই ২০১৩ সালের ঘটনাকে বুঝতে হলে সমর্থকদের ব্যাখ্যা এবং সমালোচকদের বক্তব্য—দুই দিকই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

৫ মে ২০১৩: শাপলা চত্বরের অধ্যায়

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে বড় সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। ঘটনাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত একটি অধ্যায়।

আরও পড়ুনঃ  জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল, ডিজেল ১৩৫ ও অকটেন ১৬৫ টাকা

সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের খবর প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে হতাহতের সংখ্যা ও ঘটনার বিভিন্ন বিবরণ নিয়ে নানা দাবি ও মতভেদ তৈরি হয়। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ও সম্পদহানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে আল্লামা শাহ আহমদ শফী নিজে হেফাজতের বিরুদ্ধে সহিংসতার কিছু অভিযোগ অস্বীকার করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেছিলেন।

অতএব ইতিহাসের এই অধ্যায়কে শুধু আবেগের ভাষায় নয়, বরং প্রামাণ্য নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, সংবাদ প্রতিবেদন ও পরবর্তী গবেষণার আলোকে বিচার করা প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার মানে শুধু নিজের পছন্দের বর্ণনাটি তুলে ধরা নয়; বরং ঘটনাটির বিভিন্ন দিক সংরক্ষণ করা।

কওমি মাদ্রাসা ও দ্বীনি শিক্ষার প্রশ্ন

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ছিল কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার একজন প্রবীণ অভিভাবক হিসেবে তাঁর ভূমিকা। তিনি বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে স্বতন্ত্র ধারায় পরিচালিত হয়ে আসছিল। এই শিক্ষাধারার স্বাতন্ত্র্য, পাঠক্রম, সনদ এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলেছে। আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. এই অঙ্গনের অন্যতম প্রভাবশালী প্রবীণ আলেম হিসেবে এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর ইন্তেকালের পরও কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় একজন শিক্ষক, মুরব্বি ও দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে।

মানুষের হৃদয়ে একজন মুরব্বি

একজন আলেমের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর বইয়ের তাক নয়; মানুষের হৃদয়ে তাঁর জায়গা।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-কে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও অনুসারীদের একটি অংশ ‘বড় হুজুর’ নামে শ্রদ্ধা করত। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁকে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার একজন শীর্ষস্থানীয় অভিভাবক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ২০২০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

জানাজার সেই জনসমুদ্র ছিল তাঁর প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও আবেগের দৃশ্যমান প্রকাশ।

শেষ অধ্যায়ের নীরবতা

মানুষ যত বড়ই হোক, জীবনের শেষ অধ্যায় তাকে নীরবতার কাছেই ফিরিয়ে নেয়।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হাটহাজারী মাদ্রাসাকে ঘিরে ছাত্রদের আন্দোলন ও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনার পর আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. মহাপরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এর পরপরই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তিনি ইন্তেকাল করেন।

আরও পড়ুনঃ  বুড়িচং প্রেসক্লাবের নবনির্বাচিত কমিটিকে শিক্ষাশক্তি ঐক্য পরিষদের ফুলেল শুভেচ্ছা

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি যে প্রতিষ্ঠানকে কয়েক দশক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সেখানকার দায়িত্ব থেকে বিদায় নেন। কিন্তু একজন মানুষের পদ শেষ হয়ে যেতে পারে; তাঁর জীবনকর্মের প্রভাব এত সহজে শেষ হয় না।

রেখে যাওয়া প্রশ্ন, রেখে যাওয়া শিক্ষা

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর জীবন আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়।

একজন আলেমের দায়িত্ব কি শুধু মাদ্রাসার চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে?

ইলম কি সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্নে কোনো ভূমিকা রাখবে না?

দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বের সম্পর্ক কী?

আবার একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ—ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার আন্দোলন কীভাবে ন্যায়, শৃঙ্খলা, মানুষের অধিকার ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়; কুরআন-সুন্নাহ, ইসলামী নৈতিকতা, ইতিহাস এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে খুঁজতে হবে।

কারণ ইসলাম সত্যের সঙ্গে ন্যায়বিচারকেও অপরিহার্য করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে।’ (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৮)

এই আয়াত শুধু বিরোধীর প্রতি ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয় না; নিজের প্রিয় ব্যক্তিত্বের মূল্যায়নেও ন্যায়পরায়ণতার শিক্ষা দেয়।

একটি যুগের স্মৃতি

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর জীবনকে এক বাক্যে আবদ্ধ করা কঠিন। তিনি ছিলেন শিক্ষক; ছিলেন দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানপ্রধান; ছিলেন কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনের প্রবীণ মুরব্বি; ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির; এবং ২০১৩ সালের পর বাংলাদেশের ধর্মীয়-সামাজিক জনপরিসরে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও আলোচিত একটি চরিত্র।

তাঁকে ঘিরে যেমন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে, তেমনি তাঁর কিছু বক্তব্য, রাজনৈতিক-সামাজিক ভূমিকা এবং ২০১৩ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে বোঝার জন্য এই দুই বাস্তবতাকেই স্বীকার করতে হয়। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা যেন ইতিহাসের প্রশ্নকে আড়াল না করে; আবার সমালোচনা যেন তাঁর দীর্ঘ তালীমি জীবন ও শিক্ষাগত অবদানকে অস্বীকার না করে।

সময়ের স্রোত মানুষকে নিয়ে যায়, কিন্তু মানুষের রেখে যাওয়া শিক্ষা থেকে যায়।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. চলে গেছেন। হাটহাজারীর সেই দীর্ঘ তালীমি অধ্যায় তাঁর জীবনের সঙ্গে সমাপ্ত হয়নি; তাঁর ছাত্র, প্রতিষ্ঠান ও উত্তরসূরিদের মাধ্যমে তার নানা ধারা এখনো প্রবাহিত।

আজ তাঁর ইন্তেকালের স্মরণে তাই শুধু শোক নয়—প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, ইলমের প্রতি প্রত্যাবর্তন এবং দ্বীনি নেতৃত্বের দায়িত্ব নতুন করে বোঝা।

আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনি খেদমতগুলো কবুল করুন, ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, কবরকে নূরে ভরপুর করুন এবং জান্নাতুল ফেরদাউসে মর্যাদাপূর্ণ স্থান দান করুন।

আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু। আমিন।

মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক
লেখক, প্রাবন্ধিক ও ইসলামি গবেষক
সহ সুপার, আল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা
পশ্চিম দৌলতপুর, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী