পদ্মফুল কাদা আর পানিতে জন্মায়। সেটাই প্রকৃতির নিয়ম। গোবর সেখানে সার হতে পারে, কিন্তু জন্মস্থান নয়। বাস্তব অর্থে গবরে পদ্মফুল ফোটা অসম্ভব।
কিন্তু সমাজ প্রকৃতির নিয়মে চলে না। সমাজ চলে বৈষম্য, অবহেলা, নীরবতা আর প্রতিরোধের ইতিহাসে। সেখানেই এই প্রশ্নটি অর্থ পায়। গবরে পদ্মফুল কি সম্ভব।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শৈশবে রেলস্টেশনে চা বিক্রি করতেন। এই গল্প শুধু ব্যক্তিগত উত্থানের নয়। এটি বলে দেয়, সামাজিক সিঁড়ির নিচু ধাপ মানেই শেষ নয়।
বিশ্বে এমন দৃষ্টান্ত আরও আছে।
ব্রাজিলের লুলা দা সিলভা ছিলেন দরিদ্র শ্রমিক পরিবারের সন্তান। ছোটবেলায় কাজ করেছেন কারখানায়। সেখান থেকেই তিনি রাষ্ট্রপতি হয়েছেন এবং দারিদ্র্য বিমোচনকে রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত করেছেন।
নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী। ২৭ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। সেই মানুষই পরে হয়ে উঠেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি এবং বিশ্ববিবেকের প্রতীক।
বলিভিয়ার ইভো মোরালেস বেড়ে উঠেছেন আদিবাসী কৃষক পরিবারে। লামা চরানো ছিল তাঁর শৈশব। রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে তিনি আদিবাসীদের অস্তিত্বকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আব্রাহাম লিংকন জন্মেছিলেন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। শিক্ষা ছিল অনিয়মিত। সেই মানুষই দাসপ্রথা বিলোপের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ইউরোপও এর ব্যতিক্রম নয়।
সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লোভিন বেড়ে উঠেছেন শ্রমজীবী পরিবারে। তিনি নিজে ছিলেন একজন ওয়েল্ডার। কোনো অভিজাত রাজনীতি নয়, শ্রমিক আন্দোলন থেকেই তাঁর উত্থান। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থেকেও তিনি শ্রমিক পরিচয় লুকাননি।
ফিনল্যান্ডের সানা মারিন বড় হয়েছেন একক মায়ের সংসারে। পরিবার ছিল অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত। সেই বাস্তবতা থেকেই উঠে এসে তিনি হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। তাঁর নেতৃত্ব প্রমাণ করেছে, বয়স বা সামাজিক পটভূমি রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা নির্ধারণ করে না।
এই সব উদাহরণ একটি কথাই স্পষ্ট করে।
সমাজ যত বৈষম্যময়, তত গভীর সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।
শর্ত একটাই। নীরবতা ভাঙতে হবে।
গবরে পদ্মফুল প্রকৃতিতে সম্ভব নয়।
কিন্তু ইতিহাসে সম্ভব।
যদি আমরা গবরকে স্বাভাবিক বলে মেনে না নিই।
যদি বলি একজন জেলে বা রাজমিস্ত্রির ছেলেকে বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে প্রশাসনে বা সংসদে দেখতে চাই, তাহলে সেটা কি শুধু একটি শিরোনাম হবে? না, সেটা হবে সময়ের দাবি। কারণ বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান, এবং সেই দেশের দায়ভার তাদেরই নেওয়ার কথা, কিন্তু সেটা এখনো সম্ভব হচ্ছে না, বরং সেটাই আমাকে ভাবায়! তবুও আমি আশাবাদী এবং সেই অপেক্ষায়।
এই অপেক্ষা আসলে একজন ব্যক্তিকে দেখার অপেক্ষা নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় মানসিকতার পরিবর্তনের অপেক্ষা। যে সংসদ আজও বংশ, অর্থ, ক্ষমতা আর তথাকথিত এলিট পরিচয়ের চারপাশে ঘোরে, সেখানে একজন জেলে বা রাজমিস্ত্রির সন্তানের প্রবেশ মানে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যাওয়া।
জেলে যেমন তার নিজস্ব দক্ষতার গুণে সমুদ্রের গভীর থেকে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তার সন্তানরা সেটা দেখে, শেখে, স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়, ঠিক একইভাবে একজন রাজমিস্ত্রির সন্তানও সেই একইভাবে তার বাবার থেকে শেখে কীভাবে ঘর বানায়, কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাবা নিজের জন্য স্থায়ী ঘর নিশ্চিত করতে আজো পারে নি। যে স্কুল বানায়, কিন্তু তার সন্তান মানসম্মত শিক্ষা পায় না। যে শহরের অবকাঠামো দাঁড় করায়, কিন্তু সেই শহরের নীতিনির্ধারণে তার কোনো কণ্ঠস্বর থাকে না।
কিন্তু যদি এযুগে সেই জেলে বা রাজমিস্ত্রির সন্তানরা সংসদে যেতে পারে, নিশ্চিত তারা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারবে। তারা পারবে মন্ত্রীদের দশ হাজার স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাট বাড়ির পাশাপাশি বসতিদেরও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে চাই, এদের উপস্থিতি মানে এই নীরব মানুষের কথা রাষ্ট্রের কেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়া।
এবারের আসন্ন নির্বাচন হোক একটি শ্রেণি উল্টে দেওয়ার রাজনীতি নয়। এটি হোক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার রাজনীতি। এখানে প্রশ্ন এই নয়, কে কোন পেশার সন্তান। প্রশ্ন হলো, কে মানুষের কথা বোঝে, কে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। একজন জেলে বা রাজমিস্ত্রির ছেলে সংসদে গেলে সংসদ ছোট হবে না, বরং বড় হবে। কারণ তখন সংসদ বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত হবে, যুক্ত হবে আঠারো কোটি মানুষের সঙ্গে।
এই অপেক্ষা কেবল একটি আসনের জন্য নয়। এটি সেই দিনের অপেক্ষা, যেদিন শ্রম, ঘাম আর সততার সন্তানদের আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। যেদিন রাষ্ট্র বলবে, তুমি কার ছেলে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তুমি কেমন মানুষ, সেটাই শেষ কথা।
এখানে যে বক্তব্যটি উঠে আসে, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক নতুন বাংলাদেশের ছবি। প্রায় আঠারো কোটি মানুষের বসবাস এই ভূখণ্ডে। এরা কেউ সংখ্যামাত্র নয়। এরা প্রত্যেকে একটি করে জীবন, একটি করে গল্প, একটি করে সম্ভাবনা। এই মানুষগুলো প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে থেকে নিজেদের মতো করে জীবন গড়ে তুলেছে। তারা পারে না এমন কিছু নেই। তবুও তারা আজও বদ্ধ খাঁচার ভেতরে আটকে আছে কিছু মানুষ নামের দানবের কাছে।
এই দানবেরা নিজেদের এলিট শ্রেণি বলে দাবি করে। ভাষা, পোশাক, ক্ষমতা আর অর্থের আড়ালে তারা মুখোশ পরে থাকে। সেই মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ভয়, শোষণ আর বৈষম্য। এই ভণ্ড দাবি আর মুখোশধারী ক্ষমতার কাঠামো ভাঙাই আজ নতুন বাংলাদেশের প্রথম শর্ত।
নতুন বাংলাদেশে মানুষ মিস্ত্রি হোক বা রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি বা কামার, এতে কিছু যায় আসে না। মানুষ পরিচিত হবে তার প্রতিভা ও শ্রমে। আমরা যে ঘরে থাকি, যে চেয়ারে বসি, যে হাঁড়িতে ভাত রান্না করি, যে রাস্তা দিয়ে চলি, সবকিছুর পেছনেই আছে এই মানুষের হাত।
কামারের হাতুড়ির আঘাতে লোহা যে আকার নেয়, তা একটি সভ্যতার চিহ্ন। কুমারের চাকায় ঘুরতে থাকা মাটি থেকে যে পাত্র জন্ম নেয়, তা জীবনের ধারক। অথচ এই মানুষগুলোই আজও অবহেলিত।
কৃষক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গার্মেন্টস শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, জেলে, তাঁতি, নার্স, ক্ষুদ্র দোকানি, পরিবহন শ্রমিক, শিক্ষক—সবাই এই রাষ্ট্রের ভিত্তি। তাদের শ্রমেই রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ রাষ্ট্র তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়।
নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তব হবে তখনই, যখন শ্রম আর প্রতিভাকে শ্রেণির চোখে দেখা বন্ধ হবে। অধিকার তখন ভিক্ষা নয়, হবে স্বীকৃত সত্য।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে উঠে আসুক নতুন নাম। যারা হবে না কোনো ক্ষমতাধর পরিবারের উত্তরাধিকারী। যারা আসবে এক সাধারণ পরিবার থেকে। যাদের বাবারা সন্তানের মধ্যে ভয় নয়, আত্মসম্মান গড়ে তুলেছেন। মাথা নত না করে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার বা গণঅভ্যুত্থানের সময় এরকম হাজারো সাহসী সন্তানেরা ছিলেন সংগঠক, চিন্তক ও সাহস জাগানো কণ্ঠ। তারা উত্তেজনা নয়, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। প্রতিশোধ নয়, দায়িত্বের কথা বলেছেন। আন্দোলনের পরেও তাদের অনেকে স্থির থেকেছেন। মানুষকে ব্যবহার করেননি, মানুষকে বিশ্বাস করেছেন।
এই কারণেই তাদের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্ব মানে মাইক ধরা নয়। নেতৃত্ব মানে সময়ের আগে এগিয়ে থাকা এবং সঠিক সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন। জেলে বা রাজমিস্ত্রির ছেলে, এই পরিচয় দুর্বলতা নয়, শক্তি। এরা জানে কীভাবে গড়তে হয়। কারণ এরা দেখেছে ইট, বালি আর সিমেন্ট কীভাবে ধীরে ধীরে ঘরে রূপ নেয়। এরা জানে, ভিত্তি মজবুত না হলে কিছুই টেকে না।
এই বাস্তব শিক্ষা তাদের ধৈর্যশীল ও দায়বদ্ধ নেতৃত্ব দিয়েছে। তারা শুধু কথা বলে না। তারা গড়তে জানে। যেমন করে তাদের বাবারা ঘর গড়েন, তেমন করেই তারা স্বপ্ন দেখে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার।
সবশেষে, একজন নাগরিক হিসেবে এবং একটি প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রতি বিশ্বাস রেখে আমি নতুন প্রজন্মের এই তরুণদের বাংলা মঙ্গল কামনা করি। তাদের সাহস অটুট থাকুক, তাদের দায়বদ্ধতা অক্ষুণ্ণ থাকুক। নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখি, সেই স্বপ্ন গড়ার শক্তি তাদের ভেতরে আরও দৃঢ় হোক।
রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক
সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
Reporter Name 























