
মোঃ মাসুম বিল্লাল, স্টাফ রিপোর্টার:
মণিরামপুর বাজারের তীব্র যানজট নতুন কোনো সমস্যা নয়; দীর্ঘদিন ধরে এটি মণিরামপুরবাসী সহ পথিকদের নিত্যদিনের ভোগান্তির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তির জন্য মণিরামপুরবাসী দীর্ঘদিন ধরেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করে আসছে। তাদের দাবি- রাস্তা প্রশস্তকরণ অথবা বিকল্প বাইপাস সড়ক নির্মাণ।
সার্চটুডের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ব্যস্ততম এই সময়ে যেখানে সড়কই প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম, সেখানে রাজারহাট-চুকনগর সড়কের মণিরামপুর বাজার অংশের সরু ও অপ্রশস্ত অবস্থা পুরো এলাকাকে কার্যত ‘চিপা গলি’-তে পরিণত করেছে। ফলে ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
দিনের অধিকাংশ সময়ই বাজারজুড়ে লেগে থাকে দীর্ঘ যানজট। দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকায় সময় ও জ্বালানির অপচয় হচ্ছে। অনেক সময় চাকরিজীবীরা সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারছেন না, শিক্ষার্থীদের ক্লাসে দেরি হচ্ছে। একই সঙ্গে ফুটপাত ছোট এবং ক্রমবর্ধমান অতিরিক্ত যানচাপের কারনে রাস্তার পাশ দিয়ে পায়ে হেঁটে মানুষ অনেক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- জরুরি সেবাও এ যানজটের কবলে পড়ছে। আশঙ্কাজনক অবস্থার রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারার ঘটনাও প্রায়শই ঘটছে।
সার্বিকভাবে, মণিরামপুর বাজারের যানজট এখন চরম আকার ধারণ করেছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য এক অসহনীয় দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। পদ্মাসেতু চালুর পর থেকে এই সড়কে যানচাপ অনেক বেড়ে গেছে, দেশের অন্যান্য উপজেলা শহরে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও এখানে শুধু রাস্তা সংস্কার হয়েছে কিন্তু এই জনদুর্ভোগের কোন সমাধান হয়নি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে, যশোরের মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে হরিহর নদীসহ পাঁচটি নদীর ৮১.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ ২০২৫ সালের শেষ দিকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছে। এর আওতায় কপোতাক্ষ নদ থেকে উৎপন্ন মৃতপ্রায় হরিহর নদের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার অংশ খনন করা হচ্ছে, যা অত্র এলাকার কৃষি ও মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই প্রকল্প ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, খননকৃত হরিহর নদীর পাড়কে বাইপাস সড়ক হিসেবে ব্যবহার করা গেলে বাজার এলাকার যানজট অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, পৌর এলাকার মোহনপুর বটতলা থেকে বাদামতলা সেতুর পূর্ব পাড় হয়ে মণিরামপুর গোহাটা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার নদীর পাড়ে সড়ক নির্মাণ করা গেলে তা কার্যকর বাইপাস হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এতে পৌর শহরের প্রায় ৭০০ মিটার সংকীর্ণ সড়কের ওপর চাপ কমবে এবং যানজট থেকে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি মিলবে।
উল্লেখ্য, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সংসদ সদস্য প্রয়াত মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস মণিরামপুরে যানজট নিরসনে বাইপাস সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং একটি সমীক্ষাও পরিচালিত হয়। তবে জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালে রাজারহাট-চুকনগর মহাসড়ক দুই লেনে উন্নীত হলেও পৌর শহরের প্রায় ৭০০ মিটার অংশ মালিকানা ও অর্থসংক্রান্ত জটিলতায় প্রশস্ত করা হয়নি। ফলে ওই অংশেই সবচেয়ে বেশি যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
এরপর তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য মোহনপুর বটতলা-কামালপুর হয়ে মণিরামপুর সরকারি কলেজ পর্যন্ত নতুন বাইপাস নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তবে এলজিইডি ও সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের মধ্যে দায়িত্ব সংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্পটি থমকে যায়। পরে এটি সওজের আওতায় নেওয়া হয় এবং সম্ভাব্যতা যাচাইসহ জমি অধিগ্রহণের জন্য ২০৭ কোটি টাকার প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়।
সওজ যশোর অঞ্চলের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আলাউর রহমান জানান, বাইপাস সড়ক নির্মাণের প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবিত ২০৭ কোটি টাকার প্রকল্পের তুলনায় নদীর পাড় ব্যবহার করে বিকল্প বাইপাস নির্মাণে ব্যয় অনেক কম হতে পারে এমনকি প্রায় এক-চতুর্থাংশ খরচেই তা সম্ভব।
এদিকে, হরিহর নদী খননের ফলে নদীর পাড়ে বিপুল পরিমাণ মাটি জমা হচ্ছে, যা চলাচলের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্ষেত্রবিশেষে ১৫ থেকে ২০ ফুট প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব।
নদী খনন কাজে নিয়োজিত মোশারফ হোসেন বলেন, “নদীর পাড়কে ব্যবহার করে বাইপাস সড়ক নির্মাণের সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।”
মণিরামপুর উপজেলা প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদ বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন কিছুটা জটিল হলেও অসম্ভব নয় এবং এতে ব্যয় তুলনামূলক কম হতে পারে।
সওজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সদিচ্ছা থাকলে এ ধরনের সড়ক নির্মাণ সম্ভব এবং প্রতি কিলোমিটারে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
সবমিলিয়ে, মণিরামপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে এখন সময়োপযোগী ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে – হোক তা বিদ্যমান সড়ক প্রশস্তকরণ কিংবা নতুন বাইপাস সড়ক নির্মাণ।
Reporter Name 























