রনজিৎ সরকার রাজ, দিনাজপুর প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে রাস্তা নিয়ে বিরোধ ও নতুন বাড়ি নির্মাণের মালামাল কেনাকে কেন্দ্র করে মনোরঞ্জন রায় (৫৫) নামে এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিহতের বড় ছেলে বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ এ ঘটনায় দুজনকে আটক করেছে।
গত ২৫ অক্টোবর, রোববার, বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে পার্বতীপুর উপজেলার বেলাইচণ্ডী ইউনিয়নের রাবেয়ার মোড় এলাকার সোনাপুকুর নয়া মোল্লাপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত মনোরঞ্জন রায় চিরিরবন্দর উপজেলার ইসবপুর ইউনিয়নের চকসুকদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি চকসুকদেবপুর গ্রামের মালিপাড়ার অসীম চন্দ্র রায়ের ছেলে।
রাস্তা ও বাড়ি নির্মাণের মালামাল কেনা নিয়ে বিরোধ
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত মনোরঞ্জন রায়ের সঙ্গে নয়া মণ্ডলপাড়ার মৃত আজিজুর রহমানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ছিল। আজিজুর রহমান অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যাওয়ার পর তাঁর পরিবারের দেখভালের দায়িত্ব নেন মনোরঞ্জন রায়। সেই সূত্রে আজিজুরের পরিবারের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে আজিজুর রহমানের স্ত্রী রোমানা বেগম ও তাঁর সন্তানেরা পুরোনো বাড়ি ভেঙে নয়া মোল্লাপাড়ার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নতুন বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, নতুন বাড়ি নির্মাণের কারণে আশপাশের কয়েকটি পরিবারের যাতায়াতের রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। এ নিয়ে প্রতিবেশী মোস্তাহার, আলোম হোসেন, আসাদুজ্জামান ও শরিফুল ইসলামের পরিবারের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়। বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জায়গা না ছাড়ার জন্য মনোরঞ্জন রায়কে দায়ী করে প্রতিবেশীদের একটি পক্ষ তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিল বলে স্থানীয়রা জানান।
এ ছাড়া নতুন বাড়ি নির্মাণের জন্য কাঠ, বাঁশ, টিনসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী কেনা এবং শ্রমিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিরোধ দেখা দেয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আজিজুর রহমানের স্ত্রীকে নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ ও শ্রমিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ফরতাজ হোসেন এবং মনোরঞ্জন রায় ভিন্ন ভিন্ন দামের প্রস্তাব দেন। পরে রোমানা বেগম ও তাঁর সন্তানেরা মনোরঞ্জন রায়ের প্রস্তাব অনুযায়ী মালামাল কেনেন। এ ঘটনায় ফরতাজ হোসেন ক্ষুব্ধ হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাড়িতে গিয়ে সংঘর্ষ, শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে ফরতাজ হোসেন ওই বাড়িতে গিয়ে রোমানা বেগমের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে রোমানা বেগম মুঠোফোনে মনোরঞ্জন রায়কে বিষয়টি জানিয়ে বাড়িতে আসতে বলেন।
এরপর মনোরঞ্জন রায় আজিজুর রহমানের বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে সেখানে পৌঁছান। অভিযোগ অনুযায়ী, বাড়িতে পৌঁছানোর পর ফরতাজ হোসেন তাঁকে গালিগালাজ করেন এবং রোমানা বেগমের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তোলেন। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে মনোরঞ্জন রায় ফরতাজ হোসেনের গালে চড় মারেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এরপর ফরতাজ হোসেন প্রতিবেশী মোস্তাহার, তাঁর ছেলে আলোম হোসেন, আসাদুজ্জামান ও শরিফুল ইসলামকে ডেকে আনেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁরা এসে বাঁশের খুঁটি, কাঠের বাতা, বাঁশের অংশ ও লাঠি দিয়ে মনোরঞ্জন রায়কে মারধর করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেন।
এ সময় তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে আজিজুর রহমানের বড় ভাই, স্ত্রী ও সন্তানেরাও মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে মনোরঞ্জন রায় দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে কয়েকজন তাঁকে ধাওয়া করেন। পরে একটি গাছের ডাল দিয়ে তাঁকে মারতে মারতে প্রায় ১৫০ মিটার দূরে একটি ধানক্ষেতে ফেলে রেখে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ধানক্ষেতে শিক্ষকের মরদেহ উদ্ধার
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে এক কিশোর ঘাস কাটতে গিয়ে ধানক্ষেতে মনোরঞ্জন রায়কে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে। পরে আজিজুর রহমানের স্ত্রী ও সন্তানেরা তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যান।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে পার্বতীপুর মডেল থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় আসাদুজ্জামান (৩৬) নামে এক যুবককে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়। পরে একই দিন গভীর রাতে চিরিরবন্দর উপজেলার ফতেজংপুর ইউনিয়নের বড়হাশিমপুর সরকারপাড়া থেকে আলোম হোসেন আলোকে (৪০) আটক করে পুলিশ।
মামলা দায়ের, অন্য আসামিদের ধরতে অভিযান
দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আনোয়ার হোসেন জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়েছে।
পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল ওয়াদুদ জানান, নিহতের বড় ছেলে চন্দন কুমার রায় বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এজাহারভুক্ত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে পুলিশি তদন্ত চলছে।
Reporter Name 























