
ইমদাদুল হক তৈয়ব:
শিরিন আকতার একজন আত্মবিশ্বাসী, সাহসী ও সংগ্রামী নারী উদ্যোক্তা—যিনি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধকতা ও সামাজিক চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করে তিনি প্রমাণ করেছেন—নারীর ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকলে সফলতা অনিবার্য। পরিবার থেকে প্রাপ্ত মূল্যবোধ, সততা ও পরিশ্রমের শিক্ষা তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। নিজের মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে পুঁজি করে শিরিন আকতার শুধু আত্মনির্ভরশীলই হননি, বরং অন্য নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর পথচলা প্রমাণ করে—স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দৃঢ় সংকল্প থাকলে নারীর পক্ষে যে কোনো সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। সম্প্রতি মানবজীবনের পক্ষ থেকে তার একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। যা এখানে উপস্থাপন করা হলো-
মানবজীবন: জন্ম সাল ও জন্মস্থান— কবে এবং কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন?
শিরিন আকতার: আমার জন্ম ১৯৮০ সালের ২৮শে এপ্রিল, ঢাকার নিউ ইস্কাটন বাংলামোটর এলাকায়। এখানেই আমার শৈশব, বেড়ে ওঠা এবং জীবনের প্রথম শিক্ষা।
মানবজীবন:শিক্ষাজীবন শুরু ও শেষ— কোন কোন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন?
শিরিন আকতার: আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয় তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে, যেখান থেকে ১৯৯৫ সালে এসএসসি সম্পন্ন করি। এরপর লালমাটিয়া মহিলা কলেজে পড়াশোনা করি এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করি। শিক্ষাজীবনের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা আমাকে আত্মবিশ্বাসী এবং মানবিক করে তুলেছে।

মানবজীবন:বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন— কবে এবং কেমন ছিল সেই শুরু?
শিরিন আকতার: আমার বিবাহিত জীবনের সূচনা ১৮ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে। আলহামদুলিল্লাহ, আমার জীবনসঙ্গী প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে শক্তি ও সাহস দিয়েছেন। আমরা এক কন্যাসন্তানের বাবা-মা—তোয়া সিন রহমান। আজ আমার মেয়ে নিজেও এক সন্তানের মা। পরিবারের ভালোবাসা, সমর্থন এবং বোঝাপড়াই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
মানবজীবন: উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুর গল্পটা কীভাবে শুরু হলো?
শিরিন আকতার: উদ্যোক্তা জীবনের সূচনা আমার জন্য সহজ ছিল না, কিন্তু অনুপ্রেরণামূলক ছিল। ২০১৯ সালে ছোট আকারে অনলাইনে মশলা ও ড্রাই ফ্রুটস বিক্রি করার মাধ্যমে আমার পথচলা শুরু। শৈশব থেকেই সামাজিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, গার্লস গাইডস, রেঞ্জার এবং মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ আমাকে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, আত্মনির্ভরতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছে। একজন গৃহবধূ থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার এই পথচলায় প্রতিটি অভিজ্ঞতা আমাকে আরও শক্ত করে তুলেছে।

মানবজীবন:বর্তমানে কোন কোন ব্যবসার সাথে যুক্ত আছেন এবং কী দায়িত্ব পালন করছেন?
শিরিন আকতার: বর্তমানে আমি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও পরিচালনার দায়িত্বে আছি—
দারুচিনি–এলাচি: খাঁটি মশলা ও ড্রাই ফ্রুটস।
বেনারসি কুঞ্জ: ঐতিহ্যবাহী বেনারসি শাড়ির ঘর।
উড়ান ফ্যামিলি মার্ট, বনশ্রী: তিন বছর সফলভাবে পরিচালনার পর নতুন রূপে পুনরায় চালুর প্রস্তুতিতে, টেস্টি বেকার্স, লালবাগ: দুটি আউটলেটসহ বেকারি চেইন। আমার প্রতিষ্ঠানের প্রথম ক্রেতা ছিলেন জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল—যা আমার উদ্যোক্তা জীবনে বিশেষ অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
মানবজীবন: সামাজিক কোন প্রতিষ্ঠানে জড়িত আছেন কি?
শিরিন আকতার: হ্যাঁ, আমি একটি ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। মানবাধিকার, নারী ও শিশু সুরক্ষা, শিক্ষা সচেতনতা এবং মানবিক সহায়তায় সক্রিয়ভাবে কাজ করি। সমাজসেবা আমার ব্যক্তিত্বের একটি বড় অংশ।
মানবজীবন: এখন পর্যন্ত কোন কোন সম্মাননা পেয়েছেন?
শিরিন আকতার: আমি পেয়েছি—শিশুতোষ সাহিত্য রচনায় ভিন্নমাত্রা প্রকাশনীর সম্মাননা। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাফল্য সম্মাননা, SME, BSCIC, NASCIB সহ সরকারি-বেসরকারি সংস্থার বিভিন্ন নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ সনদ। এসব অর্জন আমার কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠার প্রতিফলন।
মানবজীবন: সফলতার এই পর্যায়ে আসতে কোন কোন বাধা–বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে?
শিরিন আকতার: উদ্যোক্তা জীবনের সূচনায় বাজার বুঝে ওঠা, ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকি নেওয়া—এসব ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। একজন নারী হিসেবে সমাজের কিছু দৃষ্টিভঙ্গি ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— পরিবার থেকে কোনোদিন কোনো সমালোচনা বা চাপ পাইনি। বরং বাবা, মা, তিন ভাই, স্বামী ও মেয়ে—সবাই আমাকে সবসময় সমর্থন, ভালোবাসা ও স্বাধীনতা দিয়েছেন। তাদের পাশে পাওয়া আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।
মানবজীবন:নিজেকে কতটুকু সফল মনে করেন? নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
শিরিন আকতার: আমি নিজেকে সফল মনে করি কারণ—আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি। পরিবার ও সমাজের জন্য কিছু করতে পারছি, এবং নতুন নারীদের অনুপ্রাণিত করতে পারছি।
মানবজীবন: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ?
শিরিন আকতার: ছোট করে শুরু করুন, কিন্তু বড় স্বপ্ন দেখুন। শেখার মানসিকতা রাখুন—প্রশিক্ষণ, গবেষণা, অভিজ্ঞতা অর্জন করুন। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখুন। ব্যর্থতাকে ভয় পাবেন না—এটাই সাফল্যের সিঁড়ি। সৎ থাকুন, পরিশ্রম করুন—ফল আসবেই।

মানবজীবন: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
শিরিন আকতার: আমার ব্যবসাগুলোকে আরও বিস্তৃত করা। স্থানীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যাওয়া। নারী উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করা। লেখালেখি আরও সমৃদ্ধ করা ও নতুন বই প্রকাশ করা। সামাজিক সেবামূলক কাজকে আরও শক্তিশালী করা।
মানবজীবন: আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন।
শিরিন আকতার: আমি তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন—বাবার আদরের রাজকন্যা। বাবা আমাকে জীবনজুড়ে স্বাধীনতা, মানবিকতা ও আত্মবিশ্বাস শিখিয়েছেন। মা ছিলেন নিঃশব্দ শক্তি—যিনি ছায়ার মতো পাশে থেকেছেন। ভাইদের ভালোবাসা, স্নেহ ও আগলে রাখা আমাকে আজকের আমি হতে সাহায্য করেছে। আমার স্বামী আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সহযাত্রী। আমার মেয়ে তোয়া সিন রহমান—সে শুধু আমার সন্তান নয়, আমার অনুপ্রেরণা ও শক্তি। আর আজ সে নিজেও এক সন্তানের মা—যা আমাকে আরও গর্বিত করে।
মানবজীবন: মানবজীবন.কম-কে সাক্ষাৎকার প্রদান করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
শিরিন আকতার: আমি মানবজীবন.কম পরিবারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আমাকে এই সাক্ষাৎকারের সুযোগ দেওয়ার জন্য। মানুষের গল্প, সংগ্রাম ও অনুপ্রেরণাকে যেভাবে তারা তুলে ধরে—তা সত্যিই প্রশংসনীয়।০
উদ্যোক্তা জীবনের সূচনায় বাজার বুঝে ওঠা, ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকি নেওয়া—এসব ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। একজন নারী হিসেবে সমাজের কিছু দৃষ্টিভঙ্গি ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— পরিবার থেকে কোনোদিন কোনো সমালোচনা বা চাপ পাইনি। বরং বাবা, মা, তিন ভাই, স্বামী ও মেয়ে—সবাই আমাকে সবসময় সমর্থন, ভালোবাসা ও স্বাধীনতা দিয়েছেন। তাদের পাশে পাওয়া আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।
—————————————————————————————————-
আমি নিজেকে সফল মনে করি কারণ—আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি। পরিবার ও সমাজের জন্য কিছু করতে পারছি, এবং নতুন নারীদের অনুপ্রাণিত করতে পারছি।
———————————————————————————————————————
ছোট করে শুরু করুন, কিন্তু বড় স্বপ্ন দেখুন। শেখার মানসিকতা রাখুন—প্রশিক্ষণ, গবেষণা, অভিজ্ঞতা অর্জন করুন। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখুন। ব্যর্থতাকে ভয় পাবেন না—এটাই সাফল্যের সিঁড়ি। সৎ থাকুন, পরিশ্রম করুন—ফল আসবেই।
ইমদাদুল হক তৈয়ব: 












