
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,
বাড়ল সময়: ৩০ নভেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশ এখন এক নতুন অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার পথে হাঁটছে — যেখানে কাগজের রিটার্ন নয়, ই-রিটার্নই হবে কর ব্যবস্থার মূল ভরকেন্দ্র।জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে যে ৩০ নভেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে সকল ব্যক্তি করদাতাকে ই-রিটার্ন দাখিল করতে হবে।এটি শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয় — এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তরের এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
প্রেক্ষাপট: দেশে বর্তমানে ১ কোটি ১২ লাখ টিআইএনধারী থাকলেও, প্রতিবছর মাত্র ৪০ লাখ করদাতা রিটার্ন জমা দেন। অর্থাৎ, ৭২ লাখের বেশি নাগরিক কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন।এই প্রেক্ষাপটে, এনবিআরের ই-রিটার্ন উদ্যোগটি করদাতাদের সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে কর প্রদানের সুযোগ করে দেবে।
২০২৫ সালের আগস্টে ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক হওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যে ১০ লাখের বেশি করদাতা অনলাইনে রিটার্ন জমা দিয়েছেন, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে এক ইতিবাচক মাইলফলক।
নতুন ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য:
১)সম্পূর্ণ অনলাইন প্রক্রিয়া: ঘরে বসেই করদাতা রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।
২)স্মার্ট যাচাইকরণ ব্যবস্থা: টিআইএন, এনআইডি ও ব্যাংক তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত।
৩)করদাতার সুরক্ষা: ভুল রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সংশোধনের সুযোগ।
৪)প্রশাসনিক স্বচ্ছতা: দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর সম্পৃক্ততা কমে যাবে।
সমস্যা ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ:
তবে বাস্তবতা হলো, এখনো অনেক করদাতা প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভ্যস্ত বা ই-রিটার্ন সিস্টেম সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত নন।
এছাড়া ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা, লগইন জটিলতা, এবং সার্ভারজনিত ত্রুটি অনেক সময় করদাতাকে বিপাকে ফেলে।
তাই এনবিআরের উচিত—
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে “ই-রিটার্ন সহায়তা কেন্দ্র” গঠন,
ট্যাক্স আইনজীবী ও হিসাবরক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি,
এবং করদাতাদের মধ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
কেন ই-রিটার্ন গুরুত্বপূর্ণ:
কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পায়, যা উন্নয়ন প্রকল্পে সরাসরি প্রভাব ফেলে।করদাতা–রাষ্ট্র সম্পর্কের আস্থা বাড়ে।ঘুষ, দালালি, ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস পায়একটি আধুনিক রাষ্ট্রে কর প্রদান শুধু দায়িত্ব নয়, বরং নাগরিক মর্যাদার প্রতীক।ডিজিটাল রিটার্ন সেই মর্যাদাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে:
ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৪ এর ধারা ৭৫ ও ৭৫এ অনুসারে, প্রত্যেক ব্যক্তি করদাতাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক।ই-রিটার্ন প্রক্রিয়া এই আইনি বাধ্যবাধকতাকে সহজ ও বাস্তবায়নযোগ্য করে তুলছে।
এছাড়া, ডিজিটাল সিগনেচার ও ট্যাক্সপেয়ার আইডি সিস্টেম করদাতার নিরাপত্তা ও প্রমাণীকরণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
নাগরিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ:বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বচ্ছ করনীতি ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
যত বেশি নাগরিক কর প্রদান করবে, তত দ্রুত রাষ্ট্রের উন্নয়ন বাজেট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হবে।
ই-রিটার্নের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কৃতিতে শুরু হয়েছে এক নতুন নাগরিক দায়িত্ববোধের যুগ, যেখানে করদাতা আর ভীত নয়—বরং গর্বিত একজন অংশীদার।“ই-রিটার্ন” কেবল প্রযুক্তির প্রয়োগ নয়, এটি একটি মানসিক পরিবর্তনের সূচনা।
যেখানে স্বচ্ছতা, দায়িত্ববোধ ও নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা পৌঁছাতে পারি আত্মনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রে।আজকের করদাতা যদি সময়মতো ই-রিটার্ন দাখিল করেন,তাহলে আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও ন্যায্য অর্থনীতির বাংলাদেশ।

অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
লেখক, আইনজীবী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
দৈনিক মানবজীবন পত্রিকা
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া 






















