হাতিয়া প্রতিনিধি: নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়ার জোড়খালী উচ্চ বিদ্যালয়ে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফের একাধিক শিক্ষার্থী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ক্লাস চলাকালে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা ও অস্বস্তি অনুভব করে অন্তত ২১ শিক্ষার্থী অচেতন হয়ে পড়ে।
অসুস্থদের দ্রুত হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে প্রাথমিক চিকিৎসার পর অধিকাংশের জ্ঞান ফিরে আসে। তবে এক নারী শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নোয়াখালী জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
একই বিদ্যালয়ে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো এমন ঘটনা ঘটায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ক্লাসে হঠাৎ একের পর এক শিক্ষার্থী অসুস্থ
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিন জানান, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে প্রথমে সপ্তম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে। পরে অষ্টম ও দশম শ্রেণির আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, অসুস্থ হয়ে পড়া অনেকের শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে অস্বস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষেই অচেতন হয়ে পড়ে। পরে আরও একজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ২১ জনে।
শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ‘আতরের গন্ধ’ পাওয়ার কথা জানিয়েছে
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক অর্জুন চন্দ্র দাস জানান, সপ্তম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী বারান্দায় হাঁটার সময় আতরের মতো একটি গন্ধ পাওয়ার কথা জানায়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের কয়েকজন অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারায়।
ঘটনার পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় অসুস্থ শিক্ষার্থীদের দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার পর অধিকাংশ শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়। তবে একজনের অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে নোয়াখালী জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
গণ-মনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতার সম্ভাবনা দেখছেন চিকিৎসক
হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. রবিউল ইসলাম নিলয় বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি ‘মাস হিস্টোরিয়া’ বা গণ-মনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
তিনি বলেন, কোনো একজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে আশপাশের অন্যদের মধ্যে ভয় বা আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। এর প্রভাবে তারাও একই ধরনের শারীরিক উপসর্গ অনুভব করতে পারেন।
তবে এটিই ঘটনার একমাত্র কারণ কি না, তা এখনই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। কোনো পরিবেশগত সমস্যা, রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ কিংবা অন্য কোনো শারীরিক কারণ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
একই স্কুলে বারবার ঘটনায় অভিভাবকদের উদ্বেগ
একই বিদ্যালয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
কেউ কেউ ঘটনাটিকে গণ-মনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা হিসেবে দেখলেও বিদ্যালয়ের পরিবেশ, খাবারের বিষক্রিয়া, কীটনাশক কিংবা আশপাশে কোনো রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হচ্ছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি দল বিদ্যালয় পরিদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বর্তমানে অসুস্থ শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
সাত দিন আগেও অসুস্থ হয়েছিল ১৮ শিক্ষার্থী
এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর একই বিদ্যালয়ের ১৮ শিক্ষার্থী ঝাঁঝালো ধরনের গন্ধে অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েছিল। পরে তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং সুস্থ হয়ে তারা বাড়ি ফিরে যায়।
পরদিন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত করে বলা হয়েছিল, বিদ্যালয়সংলগ্ন জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের কারণে ওই ঘটনার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে একই বিদ্যালয়ে আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটায় এর প্রকৃত কারণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ কাটাতে দ্রুত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি উঠেছে।
Reporter Name 
























