গোয়াইনঘাট (সিলেট) প্রতিনিধি:
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির
চলতি বছর সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নে নবসৃষ্ট হাজীপুর বালু মহালের ইজারা পান হাফিজ আব্দুল্লাহ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ। পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের লাটি, লাবু, কালিজুরি ও দক্ষিণ প্রতাপপুর মৌজা থেকে সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের কথা থাকলেও বালু উত্তোলনে মানা হচ্ছে না ইজারার শর্ত। এছাড়া নির্ধারিত ইজারাভুক্ত এলাকার বাইরে উপজেলার পশ্চিম জাফলং, গোয়াইনঘাট সদর ও মধ্য জাফলং ইউনিয়নের উত্তর প্রতাপপুর, লুনি, আমবাড়ি ও দক্ষিণ প্রতাপপুর এলাকায় দিবারাত্রি কয়েক হাজার দানবযন্ত্র ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে।
ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে শত শত বিঘা ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে বিভিন্ন গ্রামের বসতঘর। হুমকির মুখে রয়েছে তিনটি ফুটবল খেলার মাঠ।
প্রতাপপুর ও পাঁচহাতিখেলের পিয়াইন নদীর অংশ আনন্দ খাল এলাকায় কয়েক মাস ধরে পেলোডার মেশিন দিয়ে চলছে বালু উত্তোলন। স্থানীয় ৪০-৫০ জনের একটি চক্র খাল এলাকার তীরে বালু উত্তোলন করায় অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ওই এলাকায় রয়েছে জাফলং চা বাগানের মালিকানাধীন তিনটি খেলার মাঠ। পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয়দের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি। কখনও দিনে, কখনও রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তাদের মধ্যে লুনি গ্রামের খায়রুল আমিন, কামরুল ইসলাম, ফয়জুল ইসলাম, তোফায়েল আহমদ ও দেলোয়ার হোসেন রয়েছেন।
একাধিক ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে, রাতের আঁধারে টর্চলাইট জ্বালিয়ে কয়েক শতাধিক লোক বালু উত্তোলন করছেন। আর দিনের বেলায় কয়েক হাজার ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করতে দেখা যায়। সেই বালু প্রতিদিন কয়েকশ বাল্কহেড ও কার্গোযোগে নদীপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি, প্রতিদিন কয়েক লাখ ঘনফুট বালু সেখান থেকে উত্তোলন করা হয়, যার বাজারমূল্য ২ থেকে ৩ কোটি টাকারও বেশি।
দীর্ঘদিন ধরে জাফলংয়ে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন করেছিল একটি চক্র। প্রতাপপুরে বালু উত্তোলনকারীদের অনেকে জাফলং ধ্বংসে জড়িত ছিল। তারা সেখানে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। খায়রুল, কামরুলসহ অনেকের বিরুদ্ধে গত এক যুগে ২৫-৩০টি মামলা হয়েছে। তবে অধিকাংশ মামলা থেকে তারা কখনও আপসের মাধ্যমে, আবার কখনও বাদীকে চাপ দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করিয়ে রেহাই পেয়েছে।
সর্বশেষ গত ১৩ জানুয়ারি খায়রুল, নুরুলসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দক্ষিণ প্রতাপপুরের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বুলবুল। এতে তিনি ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় মারধরের অভিযোগ করেন।
এ ছাড়া সরকারি একাধিক কর্মকর্তাসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে এলাকাবাসীর পক্ষে আবেদন করেন দক্ষিণ প্রতাপপুরের এমদাদুর রহমান। আবেদনে তিনি বালু উত্তোলন, চাঁদাবাজি, নদীতীর ভাঙন এবং বসতভিটা বিলীনের অভিযোগ করেন।
একই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ প্রতাপপুরের বিল্লাল হোসেন নামে আরেক ব্যক্তির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র সহকারী কমিশনার রিপামনি দোবি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দেন। এছাড়া এলাকাবাসীর পক্ষে মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক গত বছরের ২৬ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কাছে ফুটবল খেলার মাঠ ও মধ্যবর্তী স্থান থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের আবেদন করেন। কিন্তু কোনো অভিযোগই বালু উত্তোলন বন্ধ করতে পারেনি। কখনও সরকারি জায়গা থেকে, আবার কখনও ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা থেকে বালু উত্তোলন চলছেই।
স্থানীয়দের দাবি, বালু উত্তোলনের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে জাফলং চা বাগানের মালিকানাধীন লুনি ফুটবল মাঠ এবং দক্ষিণ প্রতাপপুরের আরও দুটি ফুটবল মাঠ। লুনি গ্রামের অমৃকা লাল ও কুলন্দ নাথের বাড়ি বর্ষা এলেই বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ প্রতাপপুরের আব্দুল জলিল, আবুল হোসেন, কমল নাথসহ অনেকের বাড়ি ভাঙনের মুখে রয়েছে।
শুধু দক্ষিণ প্রতাপপুর নয়, প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের হাজীপুর এলাকায় পিয়াইন নদীর বিভিন্ন অংশে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে ফসলি জমি ও বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। বাড়িহারাদের মধ্যে হেলেনা বেগম, তরিক উল্লাহসহ কয়েকজন রয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে খায়রুল আমিন বলেন, “বালু উত্তোলনে আমি জড়িত—এমনটি কেউ বলতে পারবে না। হাজীপুর বালুমহাল ইজারায় গেছে, তারা কীভাবে বালু উত্তোলন করছে, তারাই জানে।” এলাকায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হাফিজ আব্দুল্লাহ বলেন, “আমি লাটি, লাবু, কালিজুরি ও দক্ষিণ প্রতাপপুর মৌজা থেকে সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করছি। ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমার জানা নেই।”
গোয়াইনঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, “বালু উত্তোলনে খায়রুলসহ অনেকে জড়িত থাকার তথ্য রয়েছে। সম্প্রতি অভিযান চালানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মামলাও করা হয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
Reporter Name 

























