
ইমদাদুল হক তৈয়ব:
আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষায় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. হামিদা খানম।
সম্প্রতি দি জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ও ডিপিআইএফ-ইন্টারটেইন্টমেন্ট ইন্ডিয়া এবং দুবাই সংগঠন, গত ২৪ জানুয়ারী ভারতের নিউ দিল্লির মিউনিসিপাল কাউন্সিল এমডিএসির অডিটোরিয়ামে ঢাবি’র প্রফেসর হামিদা খানমকে The George Washington University of Peace Florida USA কর্তৃক Honorary Doctorate rate award 2024 -এ ভূষিত করা হয়।

সূত্র জানায়, তাঁর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জনসেবা, মানবাধিকারের উপর বিশেষ অবদান, শিক্ষা ও জ্ঞানের গভীরতা মূল্যায়নের পর ইউএসএ’র ফ্লোরিডার দি জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অফ পিস’র ফ্যাকাল্টি সিনেট নির্বাহী পরিষদ এবং হোনারস নমিনেশন এডভাইজারী বোর্ড কর্তৃক সুপারিশক্রমে প্রফেসর ড. হামিদা খানমকে অনারারী ডক্টরেট ইন এডুকেশন-২০২৪ সম্মানসূচক মেডেল, ক্রেস্ট, সার্টিফিকেট, গ্রাউন এবং ক্যাপ তুলে দেন। এ নিয়ে তিনি দ্বিতীয় বার ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করলেন।
অধ্যাপিকা ড. হামিদা খানম বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি ১৯৫০ সালে রংপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আলহাজ্ব এস এম হাবিবউদ্দীন একজন বিজ্ঞ মৌলভী ছিলেন, যিনি তৎকালীন পুরো ভারতবর্ষে বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসায় ইসলামিক প্রশ্ন উত্তরের জন্য আমন্ত্রিত হতেন। মা ডা. হুমায়রা খানম। যিনি রংপুরের প্রথম গাইনোকোলজিস্ট ছিলেন। ড. হামিদা খানম তিনি ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে বিএসসি অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন ও ১৯৭৪ সালে পরজীবী বিদ্যায় মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ১৯৭৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগে প্রভাষক হিসেবে জয়েন্ট করেন এবং শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। ১৯৯৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা (মৎস ও পরজীবীবিদ্যা) থেকে পদকপ্রাপ্ত এবং পিএইচডি লাভ করেন।
১৯৯৫ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গলের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ার জুলজিক্যাল সোসাইটি কর্তৃক আয়োজিত অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস অফ জুলজির চতুর্থ অধিবেশনের এক অনুষ্ঠানে ইন্ডিয়ার জুলোজিকাল সোসাইটি পরজীবীবিদ্যায় অসামান্য অবদান রাখার জন্য স্বর্ণপদক সম্মাননা প্রদান করেন। এছাড়াও বাবা সাহেব ভিমরাও আম্বেদকার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত জীববৈচিত্র্য স্ট্যাটাস ব্যবহার এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের অবস্থার প্রভাবের উপর ইন্টারন্যাশনাল সিম্পোজিয়ামের এক অনুষ্ঠানে উত্তরকান্দির হরিদ্বারে ইন্ডিয়ান একাডেমি অফ এনভায়রনমেন্টাল সাইন্স (আই এই ই এস) তাকে স্বর্ণপদকে পুরস্কৃত করেন।
২০১৪ সালের ৩০-৩১ অক্টোবর হরিদ্বারের কোলাবোরেশন উইথ ইন্ডিয়ান একাডেমি অফ এনভায়রনমেন্টাল সাইন্স তাকে স্বর্ণপদকে পুরস্কৃত করেন। ২০১৫ সালের ৩০-৩১ অক্টোবর জুলজিক্যাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া ফেলিসিটেশন মেডেল প্রদান করেন। ২০১৬ সালে ভারতের লক্ষ্নৌ জুওলজিক্যাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া কর্তৃক “ফেলিসাইটেসন মেডেল” প্রাপ্ত হন ও ভারতের লক্ষ্নৌ ১৯১৭ সালে “ডক্টর সালগেরি গোল্ড মেডেল“ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১৮ সালে শিক্ষা ও সমাজ কল্যাণমূলক কাজের অবদানের জন্য ভারতের কলকাতা কে. এম. টি. আই কর্তৃক “আন্তর্জাতিক এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০১৮” পান। ২০১৯ সালে আজীবন সম্মাননা, “লাইফ টাইম এচিভমেন্ট”, বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতি কর্তৃক সম্মানে ভূষিত হন। ২০২০ সালে মানবতার দূত লাইফ টাইম এচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড – ২০২০ লাভ করেন । ২০২১ সালে শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক কাজের জন্য “স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী স্মারক সম্মাননা” অর্জন করেন। ২০২২ সালে ভারতের কইমবেটর কর্তৃক “আই.এন.এস. ইন্টারন্যাশনাল সাইন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২২”। ২০২৩ সালে বাংলাভিশন ফাউন্ডেশন কর্তৃক “নজরুল পদক”, “রাইটস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২৩” ও সামাজিক কাজ এবং শিক্ষার জন্য “মাদার তেরেসা পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও তিনি তাঁর জীবনে দেশে-বিদেশে অসংখ্য পদক ও অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। সম্প্রতি আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষায় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. হামিদা খানম সর্ব মহলে প্রশংসিত হন। এছাড়াও তিনি তাঁর জীবনে দেশে-বিদেশে অসংখ্য পদক ও অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। তাঁর বর্ণাঢ্য ও আলোকিত জীবন নিয়ে কথা হয় আলোকিত নারী’র সম্পাদকের সঙ্গে। তাঁর সেই সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন : আপনি কেমন আছেন?
ড. হামিদা খানম: হ্যা, ভালো আছি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক প্রোগ্রাম অংশ গ্রহণের মাধ্যমে সময় পার করছি।
প্রশ্ন : আপনার পারিবারিক জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন:
ড. হামিদা খানম: আমার বাবা আলহাজ্ব এস এম হাবিবউদ্দীন একজন বিজ্ঞ মৌলভী ছিলেন, যিনি তৎকালীন পুরো ভারতবর্ষে বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসায় ইসলামিক প্রশ্ন উত্তরের জন্য আমন্ত্রিত হতেন। আমার মা ডা. হুমায়রা খানম। যিনি রংপুরের প্রথম গাইনোকোলজিস্ট ছিলেন। আমার মায়ের অষ্টম শ্রেণিতে থাকতেই বিয়ে হয়। তারপরেও তিনি নিজের প্রচেষ্টায় এতদূর লেখাপড়া করেছেন। আমরা মূলত রংপুরেই বড় হয়েছি। আমি রংপুর কারামাইকেল কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট করে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলাম। আমরা দুই বোন তিন ভাই। আমার বড় বোন একজন ডাক্তার। তারপরে আমি। এরপরে রয়েছে আমার তিন ভাই। আমার হাজব্যান্ড, এস আর আক্তার। আমার এক ছেলে ছিল। সে ২০১৬ সালে মারা যায়। সে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধি ছিল। এখন আমি একাই থাকি।
প্রশ্ন : আপনার ছোটবেলা সম্পর্কে কিছু বলুন:
ড. হামিদা খানম: আমার ছোটবেলা রংপুরে কাটে। এছাড়া দিনাজপুরে রাজশাহীতেও কাটে কিছু সময়। ছোটবেলার অনেক স্মৃতি রয়েছে। যা আজও হৃদয়ে নাড়া দেয়। আমরা পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে আমার ছোট তিন ভাই ছিল। আমার ছোট ভাইদের সাথে আমরা নানা ধরনের খেলাধুলা করতাম। খুব চঞ্চল ছিলাম আমরা। গাছে উঠতাম, দেয়ালে উঠতাম। একদিন আম্মাও অফিস থেকে এসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, আব্বাও কি কাজে যেন ব্যস্ত ছিলেন। আমরা চার ভাই বোন তখন পেয়ারা গাছে উঠতে ধরছি। প্রথমে আমার ছোট দুই ভাই উঠে আমাকে হাত ধরে টেনে গাছে উঠাতে ধরছিল। সেখান থেকে স্লিপ করে নিচে পড়ে যাই। নিচের জায়গাটা পাকা মেঝের আঙিনা ছিল। আমি একেবারে উপুর হয়ে পড়ে গেছি। আমার নাক মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। আমার একটা দাঁত ভেঙে যায়। সেই দাঁত এখনো ভাঙা আছে।

প্রশ্ন : তখনকার শৈশব আর এখনকার শৈশবের মধ্যে পার্থক্য কেমন?
ড. হামিদা খানম: তখনকার শৈশব আর এখনকার দিনের মধ্যে তো অনেক পার্থক্য। আমরা যে জিনিসগুলো পেয়েছি এখনকার দিনের ছেলে-মেয়েরা সেগুলো পাচ্ছে না। এখন ওরা যে জিনিসগুলো পাচ্ছে আমরা তখন সেগুলো পাইনি। তখনকার দিনে আমরা মাঠে ঘাটে ছুটে বেড়িয়েছি। আমরা ক্যাম্পাসের মাঠে অনেক খেলাধুলা করতাম। আর এখনকার শৈশব তো ঘরে বন্দি। মোবাইলে গেমস খেলা নিয়ে ব্যস্ত। আসলে এখন তো পরিবেশ পরিবর্তন হয়েছে। এখন চাইলেও অনেক কিছু সম্ভব না।
আমাদের যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। আমাদের বাংলাদেশের তো আর এরিয়া বাড়েনি। আমরা যেমন আগে ছোটবেলা একা বা দলবেঁধে হেঁটে হেঁটে স্কুলে গেছি, এখন তো সে ধরনের পরিবেশ নেই। এখন যেন স্কুল শিক্ষার্থীদের সাথে তাদের বাবা মাকেও স্কুলে যেতে হয়। তারা ক্লাশ করে, বাবা মা ক্লাশ শেষ হওয়া পর্যন্ত ফুটপাতে বসে থাকে। ক্লাশ শেষ হয় তারপরে তারা বাচ্চাদের নিয়ে বাসায় আসে। এভাবেই চলছে। তখন ঢাকা শহরে যা বাড়ি-ঘর ছিল, এখন তার তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। খেলাধুলার জন্য মাঠ ঘাট নেই বললেই চলে। সে হিসেবে তারা কি করবে। কাজেই ঘরের মধ্যে মোবাইলে গেম খেলে সময় পার করবে। এছাড়া তো তাদের কোনো উপায় নাই। একটা দেশের জনসংখ্যা যখন বাড়বে এবং সেটা যদি আয়তনের তুলনায় বেশি হয়। তার একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পপুলেশস যত বাড়বে। পলুশনও তত বাড়বে। ক্রাইম তত বাড়বে। কম্পিটিশন বাড়বে।
প্রশ্ন : তখনকার পড়াশোনা আর এখনকার পড়াশোনার মধ্যে কি রকম পার্থক্য?
ড. হামিদা খানম: আমরা তো অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। আমি যখন মাস্টার্স করি। তখন ফটোকপি মেশিন ঢাকায় খুব বেশি ছিল না। পাঁচটা কার্বন কপি দিয়ে ৬টা থিসিস আমি নিজেই লিখেছি। আমরা তখন প্রযুক্তির ছোঁয়া পাইনি। আমরা অনেক জেনুইনলি লেখাপড়া করেছি। অনেক জেনুইনলি শিখেছি। এখন যারা পড়াশোনা করছে, তারা কত সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। কত অ্যাপস, কত টেকনোলোজি, কিন্তু ওদের নলেজটা অনেক সুপারভিশন। কারণ ওরা বই খুব কম পড়ে। ওরা এসব নিয়েই থাকে।
প্রশ্ন : ঢাকায় কবে আসছেন?
ড. হামিদা খানম: আমি ১৯৬৯ সালে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই। আমি যখন রংপুর কারামাইকেল কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়াশোনা করি তখন আমার মা ঢাকার সলিমুল্লাহ মেডিকেল এমবিবিএস কনভেন্স কোর্স করতেছিলেন। আমি তখন অলরেডি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেছি। আমার বাবা বললেন, তোমার মা, বড় বোন ঢাকাতে, তুমি রংপুরেই থাক, তোমার ভাইদেরকে দেখাশোনা কর। আমি তখন বললাম আমার মা ক্যারিয়ার করছে, আমার বড়বোন ক্যারিয়ার কাছে। সবাই ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। আমি পিছিয়ে থাকব কেন? তখন আমি বাবার অমতেই ঢাকায় চলে আসি। আমার বড় বোনের তখন বিয়ে হয়ে গেছিল। আমি তার বাসাতেই উঠেছিলাম। তারপর রোকেয়া হলে উঠেছিলাম। আমি নিউরোলোজি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছিলাম। তখন থেকেই আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু।
প্রশ্ন : তখনকার দিনে ভার্সিটির হলের পরিবেশ কেমন ছিল?
ড. হামিদা খানম: তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের একটাই হল ছিল, রোকেয়া হল। তখনকার হলের পরিবেশ আর এখনকার হলের পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা হলে থেকে যে ধরনের আনন্দ আড্ডা ও পড়াশোনা করেছি এখন সেটা হয় না। তখনকার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা আমার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। আমি প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত আমি কোনো খরচ পরিবার থেকে নিইনি।
স্কলারশিপের টাকা দিয়েই আমার পড়াশোনার খরচ চলতো। অনার্সে ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট হলাম, আমার সবকিছু ফ্রি হয়ে গেল। তখনকার দিনে আমি স্কলারশিপের ৭০ টাকা পেতাম। ৪০ টাকা আমার খাবারের ফি ছিল, হলের জন্য ২০ টাকা, ১০-১৫ টাকা হাতে নিয়ে আমার পুরো মাস চলতো। ছুটির দিনে মায়ের কাছে যেতাম। এভাবেই কাটত সময়গুলো।
প্রশ্ন : আপনি তো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ নিজের চোখে দেখেছেন। সে সম্পর্কে কিছু বলুন
ড. হামিদা খানম: মুক্তিযুদ্ধ তো আমাদের চোখের সামনেই। আমি অনেক কিছুই বলতে পারি। আমি তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। ১৯৭১ সালে আমি ৭ মার্চের শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনেছি। রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের হলে হলে কিলিং হলো। আমরা সকালে সেগুলো দেখতে গেলাম। দেখলাম ডায়নিং রুমে যেখানে সেখানে অনেক লাশ পরে আছে। সেসব দেখে আমরা আর হলে থাকিনি। সেদিনই আমি হল থেকে বের হয়ে রংপুরে চলে যাই। আমার বোন তখন আমেরিকা গেছিল স্কলারশিপ নিয়ে। রংপুরে বাবা মা আর ছোট ভাইয়েরা মিলে থাকতাম। একদিন আর্মি আমাদের বাসায় আসছিল। আমার ভাইয়েরা তখন উঠতি বয়সি। তাদেরকে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দেওয়া হলো। আর্মিরা এসে বলল আপনার ছেলেদেরকে ডাকেন। আব্বা তখন বললেন ছেলেরা মসজিদে গেছে নামাজ পড়তে। তখন কিছু কথাবার্তা বলে তারা চলে যায়। আমার ভাইয়েরা রংপুর মেডিকেলের একটা কেবিনে তিন দিন তালাবদ্ধ ছিল। জুন মাসের পরে আমরা ঢাকায় চলে আসি। তখন একটাই মাত্র বাস ছিল। আগমনী বাস। সেই বাসে করে আমরা ঢাকায় আসলাম। ঢাকায় আসার পথেও নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। অনেকবার আমাদের গাড়ি চেক করা হয়। আমার আব্বা তখন উর্দূ ভাষা জানতেন। তিনি তাদের সাথে উর্দূতে কথা বলতেছিলেন। আল্লাহর রহমতে সেই যাত্রায় আমরা বেঁচে যাই। ঢাকায় এসে আমরা দুলাভাইয়ের বাসায় উঠি। আমার বোন তখন দেশের বাইরে। আব্বা আম্মা আমাদেরকে রেখে আবার রংপুরে ব্যাক করেন। নভেম্বরের দিকে আমার বোন ঢাকায় আসে। আমরা তখন তেঁজগাওয়ে থাকি। একদিন সেই এলাকাতেও গোলাগুলির শব্দ। আমাদের এলাকায় ওপর থেকে বোমা ফেলা হলো। আমরা সেখানেও আর থাকলাম না। আমরা তখন তিনটা ঠেলাগাড়ি ভাড়া করে বাসার কিছু জিনিসপত্র নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গেলাম। সেখানে আমার বড় বোনের শ্বশুরবাড়ি ছিল। ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেতে আমাদের সাত দিন লেগেছিল। এরপর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা ঢাকায় আসলাম। স্বাধীন হওয়ার পরেও ঢাকায় আসতে আমাদের তিন/চার দিন লেগেছিল। তার কয়েকমাস পরে আমাদের ক্লাশ শুরু হলো। আমরা হলে ফিরলাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হয়, তখন আমরা ধানমন্ডিতেই থাকতাম। আমার বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুর বাসা খুব কাছেই ছিল। একদিন ভোরবেলার দিকে খুব গুলির শব্দ শুনতে পাই। বুঝতে পারলাম যে বঙ্গবন্ধুর বাসায় গোলাগুলির শব্দ। সকালে আমরা শুনতে পেলাম বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে।
প্রশ্ন : শিক্ষার সাথে রাজনীতি এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
ড. হামিদা খানম: তখনকার শুধু সব ধরনের রাজনীতি ছিল পরিশুদ্ধ। তখন সবাই যার যার দলের আদর্শ লালন করত। কিন্তু এখন রাজনীতিতে আদর্শ নেই বললেই চলে। বেশিরভাগ মানুষই স্বার্থের জন্যই রাজনীতি করে। আর শিক্ষার সাথে রাজনীতি কম থাকলেই ভালো। ছাত্র বা শিক্ষকরা যখন সরাসরি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছে তখন পড়াশোনার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাগত যে মান সেটাকে নষ্ট করে দেয়। শিক্ষার গতিকে ব্যাহত করে। এখন হলগুলো হয়েছে সব রাজনৈতিক দলের আখড়া। এই জিনিসটা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
প্রশ্ন : আপনি একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কিছু পরামর্শ দিন
ড. হামিদা খানম: আমি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শুধু একটা কথাই বলবো। পড়াশোনা করতে হবে জানার উদ্দেশ্যে। শুধুমাত্র সার্টিফিকেট পাওয়ার আশায় নয়। তোমাদেরকে মানুষের মতো মানুষ হতে হবে।0
ইমদাদুল হক তৈয়ব: 




























