পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তিনটি জাতীয় কমিটি বাতিলসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন। সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে সংগঠনের সদস্য দীপায়ন খীসার সঞ্চালনায় সভাপতিত্ব করেন যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন। এতে বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স এবং ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুলসহ অন্যরা।
আবু সাঈদ খান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে অনেক কিছু দেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন বঞ্চিত ও উপেক্ষিত থাকলে রাষ্ট্রীয় চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। পাহাড়ের মানুষ অস্ত্র ছেড়েছে বলে তাদের সঙ্গে ইচ্ছামতো আচরণ করা যাবে—এমন ধারণা ভুল। শান্তিপ্রিয় পাহাড়ি মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিতে হবে এবং তাদের আবার অস্ত্র ধরতে বাধ্য করা যাবে না।
তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান এবং পাহাড়ের মানুষের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি বাতিল করে চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান তিনি।
শামসুল হুদা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। তার মতে, পাহাড়ের সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটির সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব কমিটি মূলত আমলা ও গোয়েন্দানির্ভর।
নাজমুল হক প্রধান বলেন, দেশে আন্দোলন হচ্ছে, সরকার পরিবর্তন হচ্ছে; কিন্তু বাস্তব অর্থে অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন হচ্ছে না। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভাগ্যেরও পরিবর্তন ঘটছে না। রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে চুক্তি করেছে এবং সেই চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্বও রাষ্ট্রের।
তিনি বলেন, পাহাড়ের মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে ১৯৯৭ সালের চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি বাতিল করে পাহাড়ের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পথে এগোতে হবে।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান সমস্যা ভূমি। অথচ দীর্ঘদিনেও এ সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি। সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি কার্যক্রম শুরু করলে পাহাড়ের বিদ্যমান সমস্যাগুলো আরও জটিল হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, ভারতে অবস্থানকালে সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর জুম্ম শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে এনে সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশে ফিরে আসার পর সমস্যার সমাধান তো হয়নি, বরং নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ২৯ বছর পার হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পাহাড়ের জনগণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।
সভাপতির বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে শুধু নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা এবং এর সমাধানও রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক ২৬টি বৈঠকের পর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ২৯ বছর পরও এর মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি বলে তাদের দাবি।
সমাবেশ থেকে উত্থাপিত আট দফা দাবি হলো—
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক তিনটি কমিটি অবিলম্বে বাতিল করা।
২. পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন করা।
৩. চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহার করা।
৪. চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন ও কার্যকর করা।
৫. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।
৬. বিধিমালা প্রণয়নসহ দ্রুত পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করা।
৭. অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংলাপ আয়োজন করা।
৮. পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি সমস্যাসহ সব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সরকারের উদ্যোগে বহুপক্ষীয় অর্থবহ সংলাপ শুরু করা।
Reporter Name 























