মোঃ শফিয়র রহমান, পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি:
দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের পর স্বপ্ন পূরণ হয়েছে খুলনার পাইকগাছার মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সহকারী জজ হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ২০০ প্রার্থীর মধ্যে মেধাক্রমে তাঁর অবস্থান ১৩৬তম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি সম্পন্ন করা আব্দুল্লাহ আল মামুনের এই সাফল্যে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
আব্দুল্লাহ আল মামুনের বাড়ি পাইকগাছা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের গোপালপুর গ্রামে। তাঁর বাবা মো. এনামুল হক লস্কর পাইকগাছা দাখিল মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী এবং মা হ্যাপিয়ারা বেগম একজন গৃহিণী। সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে এসে তাঁর এই অর্জনকে পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফল হিসেবে দেখছেন।
মাদ্রাসা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আব্দুল্লাহ আল মামুনের শিক্ষাজীবনের শুরু মাদ্রাসায়। রাজশাহীর আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী থেকে দাখিল এবং গাজীপুরের টঙ্গীর তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেন তিনি।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ‘খ’ ইউনিটে তিনি ১১তম এবং ‘ঘ’ ইউনিটে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে এলএলবি সম্পন্ন করেন।
প্রথমবার ব্যর্থ, দ্বিতীয়বার সাফল্য
জুডিশিয়াল সার্ভিসে আসার পথটি আব্দুল্লাহ আল মামুনের জন্য সহজ ছিল না। প্রথমবার বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি তিনি। তবে ব্যর্থ হয়ে থেমে যাননি। বরং নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি শুরু করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে পরিশ্রম করে যান।
নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “গত ৮ বছর যাবত এই দিনটার জন্য স্বপ্ন দেখছি ও অপেক্ষা করছি। প্রথমবার ব্যর্থ হয়ে খারাপ লেগেছিল অবশ্যই, কিন্তু হতাশ হইনি। ধৈর্য ধরে পরিশ্রম করে গেছি। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় আল্লাহ রহমতের দুয়ার খুলে দিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “পরিশ্রম করলে ও লেগে থাকলে আল্লাহ কখনো নিরাশ করেন না।”
বাবা-মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি
নিজের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন।
তিনি বলেন, “সফলতার পেছনে নিজের স্বপ্ন ও পরিশ্রমের পাশাপাশি বাবা-মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। আমার এই স্বপ্ন পূরণ করার মতো সক্ষমতা আমার আছে—তাঁরা এটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন। বাবা-মায়ের এই আস্থা ও বিশ্বাসই আমাকে প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করার মানসিক শক্তি জুগিয়েছে।”
বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে চান
সহকারী জজ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত বিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন।
তিনি বলেন, “বর্তমানে নিম্ন আদালতে ৪০ লক্ষাধিক মামলা পেন্ডিং রয়েছে। একটা মামলা শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে। যার কারণে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা একদম তলানিতে। ভুক্তভোগীরা এখন বিচার পাবে না ভেবে আদালতেই আসতে চায় না।”
আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমি এই অবস্থা কিছুটা হলেও বদলাতে চাই। দেশের বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা ও দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখাই আমার মূল লক্ষ্য।”
তরুণদের উদ্দেশে বার্তা
জুডিশিয়াল সার্ভিসে আসতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “স্বপ্ন পূরণের জন্য পরিশ্রম করা ও লেগে থাকার মানসিকতা থাকতে হবে। কোনো অবস্থাতেই হতাশ হওয়া যাবে না। লেগে থাকলে সফলতা আসবেই।”
১৮তম বিজেএসে সহকারী জজ হিসেবে আব্দুল্লাহ আল মামুনের সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার খবরে তাঁর পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, প্রথমবারের ব্যর্থতা, এরপর নতুন করে চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত সাফল্য—তাঁর এই পথচলা স্থানীয় শিক্ষার্থী ও তরুণদের কাছেও অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রেরক:
মোঃ শফিয়র রহমান
পাইকগাছা, খুলনা প্রতিনিধি
Reporter Name 

























