
সূরা এখলাসের বিস্ময় তাৎপর্য ও গুরুত্ব
মাওলানা সাইফুল ইসলাম সালেহী
খুব চমৎকার একটি সূরা, যে সূরার মাধ্যমে আল্লাহর সম্পর্কে জানা যায়। সূরা এখলাস। এখলাস অর্থ হলো নির্ভেজাল, অকৃত্রিম ইত্যাদি। মহান আল্লাহর ক্ষমতা, বিশেষ গুণ, তিনি নির্ভেজাল একক সত্তা, তা বিশেষভাবে এই সূরাতে বলা হয়েছে। এ কারণে এ সূরার নামকরণ আল ইখলাস রাখা হয়েছে।
মহানবী (স.) কে তার প্রতিপালকের ব্যাপারে জিঞ্জেস করা হয়: তখন এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। হে মুহাম্মদ (স.)। আপনি বলুন, তিনিই আল্লাহ, একক অদ্বিতীয়। (সূরা এখলাস, আয়াত: ১) কাফিরেরা আল্লাহ সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করতো নজীজীর কাছে। তখন মহান আল্লাহ স্বীয় নবীকে শিখিয়ে দিয়েছেন যে, তুমি তাদেরকে বলে দাও আমার প্রতিপালক হলেন তিনি এক ও অদ্বিতীয়। সূরায় এখলাস মহান আল্লাহ স্বীয় একত্ববাদ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। প্রিয় নবী (স.) মহান আল্লাহ একত্ববাদ সম্পর্কে সর্তক করেছিলেন, তখন দেব দেবী ও মূর্তিপূজায় জগৎ পরিপূর্ণ ছিল। মূর্তি পূজকরা বিভিন্ন প্রকার কাঠ, পাথর, স্বর্ণ, রৌপ্য ইত্যাদি দ্বারা দেব দেবীর আকৃতি নির্মাণ করে সেগুলোর পূজা করতো। এগুলো ছিল তাদের খোদা। উল্লেখ্য যে, প্রত্যেক দেবের স্ত্রীর ছিল আবার প্রত্যেক দেবীর স্বামী ছিল। পূজারীরা এসব দেবতার জন্যে পানাহারের ব্যবস্থা করতো। অন্যদিকে ইহুদিরা হযরত ওযায়ের (আ) কে আল্লাহর পুত্র মনে করতো। এবং খিষ্টানরা হযরত ঈসা (আ) কে আল্লাহর পুত্র ও হযরত মারইয়াম (আ) কে আল্লাহর স্ত্রী মনে করতো। উপরিউক্ত এসব অশ্লীল ধারণা নস্যাৎ করার জন্যে মহান আল্লাহ স্বীয় একত্ববাদের পরিচয় দান করে মুহাম্মাদ (স.) কে একথা ঘোষণা দেয়ার জন্যে বলেন, মহান আল্লাহ এক, তিনি কোন মানুষ বা অন্য সৃষ্টিকুলের সাথে তুলনীয় নয়। তিনি হলেন নিরাকার। তিনি কারো সন্তান নন, তারও কোন সন্তান নেই। তিনি স্বনির্ভর, তিনি মহান ও অশেষ ক্ষমতাবান। তার একত্ববাদের ওপরে সকলে ঈমান আনয়ন করা অত্যাবশ্যক। (তাফসীরে জালালাইন শরীফ)
হযরত উবাই ইবনে কাব (রা) থেকে বর্ণিত, একদা মক্কার কুরাইশরা মহানবী (স.) এর কাছে এসে বললো, তুমি আমাদেরকে যে প্রতিপালকের ইবাদত করতে বলছ, তোমার সে প্রতিপালকের পরিচয় দাও, তার বংশধারা শোনাও। তখন মহান আল্লাহ আলোচ্য সূরাটি অবতীর্ণ করেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (স.) থেকে বর্ণিত, একদল ইহুদি একদা মহানবী (স.) এর কাছে আগমন করে বলল, হে মুহাম্মদ (স.) তোমার যে প্রতিপালক তোমাকে নবীরূপে প্রেরণ করেছে, তার গুণাবলি, পরিচয় আমাদেরকে শোনাও: তাহলে আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনবো। তখন মহান আল্লাহ আলোচ্য সূরাটি অবতীর্ণ করেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, একদা খায়বরের ইহুদিরা মহানবী (স.) এর কাছে এসে বললো, হে আবুল কাসেম! তোমার প্রতিপালক মহান ফেরেশতাদেরকে নূর দ্বারা, আদমকে মাটি দ্বারা, ইবলীসকে আগুন দ্বারা, আকাশকে ধুম্র দ্বারা এবং ভূমিকে পানি ফেনা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তিনি কিসের সৃষ্টি? এ প্রশ্ন শ্রবণে মহানবী (স.) নিশ্চুপ থাকেন। অত:পর আলোচ্য সূরা অবতীণ হয়। হযরত আতা (র) থেকে বর্ণিত, একদা নাজরান থেকে ইহুদিদের একটি প্রতিনিধিদল মহানবী (স.) এর কাছে আগমন করে বললো, আপনি আপনার প্রতিপালকের বর্ণনা দিন। তিনি কি মূল্যবান ইয়াকুত পাথরের নাকি স্বর্ণ বা রৌপ্যের তৈরি? উত্তরে মহানবী (স.) বলেন, আমার প্রতিপালক কোন কিছুরই সৃষ্টি নন; বরং তিনি সব কিছুরই স্রষ্টা। তখন উক্ত সূরা অবতীর্ণ হয়। কাফিরদের এই সব ভ্রান্ত প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তার নবীকে বলেন, হে হাবিব তুমি তাদেরকে বলে দাও আমার প্রতিপালক হলেন মহান আল্লাহ তিনি একক ও অদ্বিতীয়।
আল্লাহ বলেন: আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন। (সূরা এখলাস, আয়াত: ২) সামাদ সম্পর্কে জানবো। সামাদ অর্থ: অমুখাপেক্ষী। সমস্ত মাখলক, সমগ্র বিশ^জাহান তার মুখাপেক্ষী। ইকরিমাহ (রহ:) ইবনে আব্বাস (রা:) হবে বর্ণনা করেন যে, সামাদ তাকেই বলে যার কাছে সৃষ্টির সকল কিছুর চাওয়া পাওয়া নির্ভর করে এবং যিনি একমাত্র অনুরোধ পাবার যোগ্য। আলী ইবনে আবী তালহা (রহ:) ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণনা করেন যে, সামাদ হল ঐ সত্তা যিনি নিজের নেতৃত্বে, নিজের মর্যাদায়, বৈশিষ্ট্যে, নিজের বুযর্গীতে, শ্রেষ্ঠত্বে জ্ঞান বিজ্ঞানের হিকমাতে, বুদ্ধিমত্তায় সবারই চেয়ে অগ্রগণ্য। এই সব গুণ শুধু আল্লাহ জাল্লা শানহুর মধ্যেই লক্ষা করা যায়। তার সমতুল্য ও সমকক্ষ আর কেহ নেই। তিনি পুত: পবিত্র মহান সত্তা। তিনি সবার উপর বিজয়ী, তিনি বেনিয়াম। যিনি চিরন্তর ও চিরবিদ্যমান। আল আমাশ (রহ:) শাকীক (রহ:) হবে বর্ণনা করেন যে সামাদ হলেন ঐ সত্তা যিনি পৃথিবীর সবকিছু নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখেন, কেহ তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। (তাবারী ২৪/৬৯২)
আল্লাহ বলেন: তার কোন সন্তান নেই এবং তিনি কারও সন্তান নন, (সূরা এখলাস, আয়াত: ৩) ইহুদী খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করতো, আল্লাহর সন্তান আছে ও স্ত্রী আছে। কিন্তু আল্লাহর সন্তান সন্ততি নেই, পিতা মাতা নেই, স্ত্রী নেই। কুরআনুল হাকীমে অন্য আয়াতে রয়েছে: তিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা: তার সন্তান হবে কি করে? অথচ তার জীবন সঙ্গিনীই কেহ নেই। তিনিই প্রত্যেকটি জিনিস করেছেন। (সূরা আন আম, আয়াত: ১০১)
আল্লাহ বলেন: এবং তার সমতুল্য কেহই নেই। (সূরা এখলাস, আয়াত: ৪) আল্লাহ সকল গুণে তিনি কুদরতীভাবে গুণান্বিত। তাছাড়া কোন গুণেই তার সমকক্ষ কেউই নেই। এককথায় তার সমকক্ষ, সমতুল্য ও সমমর্যাদার কেউই নেই। তিনি একক, অসীম, এবং ব্যতিক্রম। আসুন আমরা সুরা এখলাস বেশী বেশী তেলোয়াত করবো এবং আমল করবো।
লেখক: আলেম, গবেষক
মাওলানা সাইফুল ইসলাম সালেহী 






















