— মানিক লাল ঘোষ —
মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু কিছু মৃত্যু একটি জনপদকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। চট্টগ্রামের জামেয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে গত বৃহস্পতিবার তেমনই এক আবেগঘন ও ঐতিহাসিক দৃশ্যের অবতারণা হয়। লাখো মানুষের গগনবিদারী “জয় বাংলা” স্লোগান আর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বিদায় জানানো হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে। প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতা, ভয় ও নানা প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের মানুষ যেভাবে তাদের প্রিয় “মোশাররফ ভাই”-এর শেষ যাত্রায় শরিক হয়েছিল, তা ছিল এক জীবন্ত কিংবদন্তির প্রতি জনমানুষের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা এস রহমান ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক, যিনি ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক আবহেই বেড়ে ওঠা মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং চট্টগ্রাম আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে ১৯৬৬ সালে লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লাহোরে অবস্থানকালে “পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদ”-এর সভাপতি হিসেবে ছয় দফার পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশে ফিরে চট্টগ্রামের বরেণ্য নেতা এম. এ. আজিজের হাত ধরে আওয়ামী লীগের মূলধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থা ও অনুপ্রেরণায় মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে ধুম ও শুভাপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন তিনি। পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ ও সৈন্য চলাচল ব্যাহত করতে ডিনামাইট ব্যবহার করে ঐতিহাসিক শুভাপুর সেতু ধ্বংসের সাহসী অভিযানে তাঁর নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত সাফল্যের অন্যতম দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে গণপরিষদ সদস্য হিসেবে সংবিধান প্রণয়নেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সিনিয়র সদস্য হন।
রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে তিনি ছিলেন একজন ভদ্র, মার্জিত ও উন্নয়নমুখী রাজনীতিক। গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ফ্লাইওভার, আবাসন ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও তাঁর সততা, ব্যক্তিত্ব ও উন্নয়ন ভাবনার প্রশংসা করেছেন।
তবে জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল বেদনাদায়ক। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বার্ধক্য ও শারীরিক জটিলতার মধ্যেও তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। পরিবার ও দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে জামিনে মুক্তি পেলেও স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউ থেকে আর ফিরে আসেননি এই বর্ষীয়ান নেতা।
তাঁর জানাজা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা পরিণত হয়েছিল বিশাল এক রাজনৈতিক ও জনসমাবেশে। “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এই উপস্থিতি ও আবেগ প্রমাণ করেছে—মানুষের হৃদয়ে আদর্শ ও ভালোবাসার জায়গা কখনও মুছে যায় না।
মিরসরাইয়ের ধুম গ্রামের মাটিতে তিনি আজ চিরনিদ্রায় শায়িত। কিন্তু চট্টগ্রামের উন্নয়ন, রাজনীতি ও মানুষের হৃদয়ে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বেঁচে থাকবেন দীর্ঘদিন। তাঁর জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
(লেখক: মানিক লাল ঘোষ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
Reporter Name 
























