
[গোদাগাড়ী (রাজশাহী) প্রতিনিধি | মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল]
ভোটের সময় কত লোক আসে, হাতজোড় করে কত কথা বলে। আর এখন টানা ২০ দিন ধরে পানিতে বুড়ো বাচ্চা নিয়ে ভেসে যাচ্ছি, কেউ একটা খোঁজ পর্যন্ত নিতে এল না! না খেয়ে আছি, রাতে ঘুমানোর জায়গা নাই, পুলাপানের কান্না সহ্য করতে পারি না। চোখ মুছতে মুছতে ক্ষোভ আর আকুতি মেশানো গলায় কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর এলাকার এক ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা।
পদ্মা নদীর পানি টানা বৃদ্ধি ও প্রবল স্রোতে গোদাগাড়ীর চর এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও চরম নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। গত দুই সপ্তাহে চর রুবেলপাড়া, আলাতুলি ইউনিয়ন, মাঝচর, চার কোদালকাটি, আশারাদহ ও বগচরসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
এসব এলাকায় অধিকাংশ ঘরবাড়ি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
যেসব ঘরবাড়ি এখনো টিকে আছে, সেগুলোতেও থইথই করছে এক গলা পর্যন্ত পানি। পানিবন্দী পরিবারগুলোর সারারাত কাটছে চরম আতঙ্কে। ভিটের এক হাঁটু পানির ওপর খাটের ওপর সন্তানদের নিয়ে জেগে বসে রাত পার করছেন মায়েরা। চারদিকে শুধু শিশুদের বুকফাটা আর্তনাদ আর ক্ষুধার তীব্র জ্বালা।
চর এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের চরম দুর্ভোগের কথা
ভিটেমাটি হারিয়ে ঘাটমুখী মানুষ প্রতিদিন শত শত মানুষ নৌকাযোগে নিজেদের জীবনের শেষ সম্বলটুকু আসবাবপত্র ও গবাদি পশু নিয়ে গোদাগাড়ীর বিভিন্ন ঘাটে আশ্রয় নেওয়ার জন্য চলে আসছেন।
গবাদি পশুর আহাজারি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে বহু পরিবারের একমাত্র সম্বল গরু ও ছাগল। যা-ও অবশিষ্ট আছে, তাদের রাখার কোনো শুকনো জায়গা বা খাবারের ব্যবস্থা নেই।
খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট গত ২০ দিন ধরে পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন পানিবন্দী হাজারো মানুষ।
সুলতানা বেগম (৪৫)আলাতুলি ইউনিয়ন
আমার দুই শতকের বসতভিটাটা কাল নদীর পেটেই চইলা গেল। চারটা সন্তান নিয়ে খাটের ওপর সারারাত পানি ভাঙিয়া বসে ছিলাম। ছেলে মেয়ে গুলা না খিদা পেটে খাইয়া কাঁপতেছিল, আর চোখের সামনে আমার ঘরটা একবারে ডুইবা গেল।
ভোটের সময় তো নেতাগো পায়ের তলায় জায়গা মেলে না, আর আজ এক মুঠ মুড়ি দেওয়ার মতো কেউ নাই। আমরা ত্রাণ চাই না, শুধু একটু শুকনা মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই।
রহিম উদ্দিন (৫৮), চর রুবেলপাড়া
কৃষি কাজ আর দুইডা গরুই আছিল আমার একমাত্র সম্বল। বন্যায় গোখাদ্য সব ভাইসা গেছে, গরু দুটোকে বাঁচাইতে যাইয়া নিজেরাও না খাইয়া আছি। এক গলা পানিতে তিন দিন ধরে আসবাবপত্র সরাইতে সরাইতে বুক ভেঙে আসছে। জীবনের শেষ বয়সে এসে এভাবে খোলা আকাশের নিচে ছাগল-গরু নিয়ে ঘাট ঘেঁষে পড়ে থাকতে হবে কোনোদিন ভাবি নি।
আয়েশা খাতুন (৩০), মাঝচর
ছোট বাচ্চাডার বয়স মাত্র আট মাস। দুই দিন ধরে বিশুদ্ধ পানির অভাবে যাওয়া পানি খাইয়াইতে পারি নাই, পেটের অসুখে ভুগছে। রাতে নদীর যে গর্জন, মনে হয় এই বুঝি সব ভাসে নিয়া গেল। প্রশাসন বা মেম্বার-চেয়ারম্যান কেউ একটা বার এসে দেখে গেল না আমরা বেঁচে আছি না মরে গেছি।
আব্দুল কুদ্দুস (৬২), চার কোদালকাটি
পদ্মা আমাদের সব কেড়ে নিল। সাত পুরুষ ধরে চরে বাস করছি, কিন্তু এবারের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি আর দেখি নাই। ঘাটে এসে নামছি ঠিকই, কিন্তু কোথায় যাব, কার কাছে দাঁড়াব কিছুই জানি না। নিজের ভিটা হারাইয়া আজ ভিক্ষুকের মতো পরের জায়গায় পলিথিন টাঙাইয়া থাকতে হবে।
চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের এখন আকুল আবেদন জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং মাথার ওপর একটা অস্থায়ী চালার ব্যবস্থা করা হোক।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চেয়ারম্যান, মেম্বার কিংবা উপজেলা প্রশাসনের কেউ এখন পর্যন্ত তাদের কোনো ধরনের খোঁজখবর নেননি বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত চরবাসী। চরম অসহায় ও নিরুপায় অবস্থায় এসব বানভাসি মানুষ এখন একটু মাথার ওপর ছাদ, শুকনো খাবার এবং মানবিক সাহায্যের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
এ বিষয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইসরাত জাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নদীভাঙনের বিষয়টি এখন পর্যন্ত কোনো খবর পাওয়া যায়নি বলেন, আমাদের উপজেলার মধ্যে নদীভাঙনের কোনো খবর নেই, এটি আমাদের এখানে না। চরাঞ্চলের আশারাদহ নদীভাঙন প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, সেখানে নদী ভাঙছে না এবং নদীভাঙনের ফলে ঘরবাড়ি সরিয়ে আনা হচ্ছে এমন কোনো তথ্য তাঁর কাছে পৌঁছায়নি।
তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে দাবি করে ইউএনও বলেন, ইতিমধ্যে আমরা ২০০ পরিবারকে শুকনো খাবার বিতরণ করেছি। যদি পরবর্তীতে নদীভাঙন বৃদ্ধি পায়, সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ত্রাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাজশাহী গোদাগাড়ী প্রতিনিধি মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল 


























