Dhaka ০৫:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরনাম:
কালীগঞ্জে দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় আনসার-ভিডিপিকে এমপি মিলনের দিকনির্দেশনা নরসিংদীর গর্ব হাতবিহীন “দুঃখু মিয়া ” অদম্য মনোবলে জ্বালিয়েছেন শিক্ষার আলো” শিক্ষক, শিক্ষিকা করে মাদক ব্যবসা শ্রীপুরে জমি দখলের চেষ্টা, ঈদগাহ মাঠের সাইনবোর্ড ভাঙচুরের অভিযোগ সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে সরকার: এমপি ফজলুল হক মিলন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বান্দরবান সেনা জোনের আর্থিক অনুদান প্রদান: সম্প্রীতি, মানবিকতা ও জনকল্যাণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মহপরিচালক বরাবর পলাশবাড়ী পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তার দূর্ণীতির অভিযোগকারীকে মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে পাঠানোর অভিযোগ আদমদীঘিতে দুর্গাপূজা মণ্ডপে আর্থিক সহায়তা ও সিসিটিভি ক্যামেরা দিলেন এমপি মহিত ঝিনাইদহে সাইবার সেলের অভিযানে ১০৪ মোবাইল ও ৫৩ হাজার টাকা উদ্ধার যে উস্তাদ শিখিয়েছেন কোরআন, সেই উস্তাদকেই ওমরাহর উপহার দিলেন ছাত্ররা”
বিজ্ঞাপন :
জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় চীফ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন । সম্পদক-ইমদাদুল হক তৈয়ব-01711576603, সিভি পাঠান এই ইমেইলে- editor.manobjibon@gmail.com

পীরগঞ্জে শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানের আলো নিভে যাওয়ার নীরব সংকট

  • Reporter Name
  • সময়: ০৬:২৯:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪৭৭ Time View

 

সাকিব আহসান প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও:


ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার শিক্ষাব্যবস্থা আজ গভীর এক নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে দাঁড়িয়ে। যে শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল মানুষ গড়ার কারখানা, তা ক্রমেই পরিণত হচ্ছে মুনাফাভিত্তিক এক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায়। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের একটি অংশ প্রকাশ্য কিংবা প্রচ্ছন্নভাবে কোচিং বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। নিয়মনীতি, নৈতিকতা কিংবা রাষ্ট্রের দেওয়া দায়িত্ব—সবকিছুই যেন আজ অনেকের কাছে গৌণ।

পীরগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে এবং অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক। অভিযোগের তীর বিশেষভাবে গেছে ১১ নং বৈরচুনা মহেশপুর মাদ্রাসার শিক্ষক আওয়াল, ৭ নং হাজীপুরের ভেবড়া বোর্ডেরহাট ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার জাহিরুল ইসলাম এবং ডিএন ডিগ্রি কলেজের পদার্থ প্রদর্শক হযরত আলী ও তার ভাই আমজাদ আলীর দিকে দিকে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হযরত আলী ও তার ভাই আমজাদ আলী পীরগঞ্জে গড়ে ওঠা কোচিং বাণিজ্যের একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মতো আরও কয়েকজন শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে পাঠদানে গাফিলতি করে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।

একজন অভিভাবক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “স্কুলে-মাদ্রাসায় বেতন দিয়ে সন্তান পড়াই এই আশায় যে ওখানেই সে মূল শিক্ষা পাবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ক্লাসে ঠিকমতো পড়ানো হয় না। বলা হয়, কোচিংয়ে এলেই সব বুঝিয়ে দেওয়া হবে। না গেলে নম্বর কম পাওয়া বা ফেল করানোর ভয় দেখানো হয়।” এই অভিযোগ শুধু একজনের নয়—এটি পীরগঞ্জের অসংখ্য অভিভাবকের নীরব ক্ষোভের প্রতিধ্বনি।

নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, “অনেক সময় ক্লাসে স্যাররা বই খুলতেই বলেন না। পরে বলেন, ‘এটা কোচিংয়ে দেখাব।’ কোচিংয়ে না গেলে আমরা পিছিয়ে পড়ি। বাধ্য হয়েই যেতে হয়।” অর্থাৎ এখানে আর শিক্ষার্থীদের পছন্দের কোনো জায়গা নেই—তারা কার্যত জিম্মি।

একজন সচেতন নাগরিক বলেন, “এটা শুধু কোচিংয়ের প্রশ্ন নয়, এটা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া। যখন শিক্ষকই জ্ঞানের বদলে ব্যবসাকে প্রাধান্য দেন, তখন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী শিখবে?” আরেকজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের সময় শিক্ষকতা ছিল ব্রত। এখন অনেকের কাছে এটা বিনিয়োগ—ক্লাসে কম দিলে কোচিংয়ে বেশি পাওয়া যাবে।”

নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নিজ শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারবেন না এবং পাঠদানে অবহেলা করতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়মের প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রশাসনের দুর্বল নজরদারির সুযোগে একটি শ্রেণি প্রকাশ্যেই এই বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফল ভয়াবহ—শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যাচ্ছে, গরিব-সচ্ছল বৈষম্য বাড়ছে, আর মেধার বদলে টাকার শক্তিই হয়ে উঠছে সাফল্যের মানদণ্ড।

পীরগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থা আজ যেন ঘুণে ধরা বাঁশ—বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ভেতরে ফাঁপা। এখনই যদি কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই অবক্ষয় আরও গভীর হবে। শিক্ষা বাঁচাতে হলে আগে শিক্ষাকে ব্যবসা বানানোর এই প্রবণতাকে রুখতেই হবে। নইলে একদিন শুধু পীরগঞ্জ নয়, পুরো সমাজই জ্ঞানহীনতার অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।

Tag :
জনপ্রিয় নিউজ

কালীগঞ্জে দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় আনসার-ভিডিপিকে এমপি মিলনের দিকনির্দেশনা

পীরগঞ্জে শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানের আলো নিভে যাওয়ার নীরব সংকট

সময়: ০৬:২৯:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

 

সাকিব আহসান প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও:


ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার শিক্ষাব্যবস্থা আজ গভীর এক নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে দাঁড়িয়ে। যে শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল মানুষ গড়ার কারখানা, তা ক্রমেই পরিণত হচ্ছে মুনাফাভিত্তিক এক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায়। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের একটি অংশ প্রকাশ্য কিংবা প্রচ্ছন্নভাবে কোচিং বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। নিয়মনীতি, নৈতিকতা কিংবা রাষ্ট্রের দেওয়া দায়িত্ব—সবকিছুই যেন আজ অনেকের কাছে গৌণ।

পীরগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে এবং অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক। অভিযোগের তীর বিশেষভাবে গেছে ১১ নং বৈরচুনা মহেশপুর মাদ্রাসার শিক্ষক আওয়াল, ৭ নং হাজীপুরের ভেবড়া বোর্ডেরহাট ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার জাহিরুল ইসলাম এবং ডিএন ডিগ্রি কলেজের পদার্থ প্রদর্শক হযরত আলী ও তার ভাই আমজাদ আলীর দিকে দিকে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হযরত আলী ও তার ভাই আমজাদ আলী পীরগঞ্জে গড়ে ওঠা কোচিং বাণিজ্যের একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মতো আরও কয়েকজন শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে পাঠদানে গাফিলতি করে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।

একজন অভিভাবক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “স্কুলে-মাদ্রাসায় বেতন দিয়ে সন্তান পড়াই এই আশায় যে ওখানেই সে মূল শিক্ষা পাবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ক্লাসে ঠিকমতো পড়ানো হয় না। বলা হয়, কোচিংয়ে এলেই সব বুঝিয়ে দেওয়া হবে। না গেলে নম্বর কম পাওয়া বা ফেল করানোর ভয় দেখানো হয়।” এই অভিযোগ শুধু একজনের নয়—এটি পীরগঞ্জের অসংখ্য অভিভাবকের নীরব ক্ষোভের প্রতিধ্বনি।

নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, “অনেক সময় ক্লাসে স্যাররা বই খুলতেই বলেন না। পরে বলেন, ‘এটা কোচিংয়ে দেখাব।’ কোচিংয়ে না গেলে আমরা পিছিয়ে পড়ি। বাধ্য হয়েই যেতে হয়।” অর্থাৎ এখানে আর শিক্ষার্থীদের পছন্দের কোনো জায়গা নেই—তারা কার্যত জিম্মি।

একজন সচেতন নাগরিক বলেন, “এটা শুধু কোচিংয়ের প্রশ্ন নয়, এটা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া। যখন শিক্ষকই জ্ঞানের বদলে ব্যবসাকে প্রাধান্য দেন, তখন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী শিখবে?” আরেকজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের সময় শিক্ষকতা ছিল ব্রত। এখন অনেকের কাছে এটা বিনিয়োগ—ক্লাসে কম দিলে কোচিংয়ে বেশি পাওয়া যাবে।”

নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নিজ শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারবেন না এবং পাঠদানে অবহেলা করতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়মের প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রশাসনের দুর্বল নজরদারির সুযোগে একটি শ্রেণি প্রকাশ্যেই এই বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফল ভয়াবহ—শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যাচ্ছে, গরিব-সচ্ছল বৈষম্য বাড়ছে, আর মেধার বদলে টাকার শক্তিই হয়ে উঠছে সাফল্যের মানদণ্ড।

পীরগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থা আজ যেন ঘুণে ধরা বাঁশ—বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ভেতরে ফাঁপা। এখনই যদি কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই অবক্ষয় আরও গভীর হবে। শিক্ষা বাঁচাতে হলে আগে শিক্ষাকে ব্যবসা বানানোর এই প্রবণতাকে রুখতেই হবে। নইলে একদিন শুধু পীরগঞ্জ নয়, পুরো সমাজই জ্ঞানহীনতার অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।